সিম ক্লোনিং প্রতারণা বিষয়ে সতর্ক থাকুন :কর্ণফূলী থানার ইউএনও বিজেন ব্যানার্জী

132
sim_cloning

একটি অপরাধী চক্র সিম ক্লোনিং করে সাধারন মানুষের সাথে প্রতারনা করছে। লুটে নিচ্ছে কষ্টার্জিত টাকা-পয়সা। ক্ষেত্র বিশেষে ঘটছে এমন কিছু ঘটনা যা লোক চক্ষুর অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে। অপরাধী চক্রটির টার্গেট মুলত:সরকারি কর্মকর্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

মেবাইল ফোনের গুরুত্বপূর্ন অংশ সিম(SIM সাবস্ক্রাইবার আইডেন্টিফিকেশন মডিউল)কার্ড। প্রতিনিয়ত সিম কার্ড ক্লোনের মাধ্যমে নতুন নতুন প্রতারনা ও কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে একটি অপরাধী চক্র। বিভিন্ন সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে এই অপরাধী চক্রটি ধরাও পড়ছে। কিন্তু কিছুতেই এই চক্রটিকে থামানো যাচ্ছে না! প্রতারনার নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করে সাধারন মানুষকে বোকা বানিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা।

সিম ক্লোনিং ক?

তথ্য প্রযুক্তির ভাষায় ক্লোনিং হলো – মোবাইল সিম নম্বর অপরিবর্তিত রেখে মোবাইল অপারেটর নাম পরিবর্তন করে কাউকে কল দেয়া। এক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটর পরিবর্তন করা হলেও কলগ্রহিতার মোবলি সেটে সেভ করা ব্যক্তির নাম দেখাবেভ তবে নম্বরটি যদি সেভ করা না থাকে তাহলে কলগ্রহিতার কাছে নম্বরটি অপরিচিত নম্বর হিসেবে দেখাবে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, কারো মোবাইলে যদি একজনের নম্বর সেভ করা থাকে, পরবর্তী সময়ে প্রতারক যদি অন্য অপারেটরের একই ডিজিটের নম্বর দিয়ে তাকে কল করে তাহলে সেভ করা নাম্বারটি স্ক্রিনে দেখাবে। যেমন মিসেস জামানের( ছদ্মনাম) মোবাইলে যদি ০১৭২৪xxxxxx নম্বরটি কবিতা (ছদ্মনাম) নামে সেভ করা থাকে তাহলে কোনো প্রতারক মোবাইল অপারেটর বদল করে ০১৬২৪xxxxxx নম্বরটি অর্ডার দিয়ে উঠিয়ে মিসেস জামানের কাছে কল করলে দেখা যাবে কবিতা কল করেছে।

সিম ক্লোনিং সম্পর্কিত অনুসন্ধান

অনুসন্ধানে জানা যায়, অপরিচিত কোনো নম্বর থেকে মিসড কল পাওয়ার পর সেই নম্বরে কলব্যাক করলে সিম ক্লোনিংয়ের শিকার হতে হয়। সিম ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে হুমকি-ধমকিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে। এক্ষেত্রেও বিশেষ একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। সিম ক্লোনিং হলে মোবাইল ফোনের সিম ও মেমোরি কার্ডে থাকা তথ্য-উপাত্তও চুরির আশঙ্কা থাকে। অথবা ক্লোন করা নম্বর ব্যবহার করে যে কোনো অপরাধমূলক ঘটনা ঘটাতে পারে সন্ত্রাসীরা। সিম ক্লোনিং হলে সিমে রাখা ডাটা ক্লোন নম্বরে চলে যাবে এবং প্রাইভেসি (নিরাপত্তা) ক্ষুন্ন হবে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশেষ করে +xxxxxx বা +xxxxxxxx সংখ্যার কোনো নম্বর থেকে আসা কোনো কল রিসিভ করলে সিম নম্বর ক্লোন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শুধু তাই নয়, সঙ্গে মোবাইল ফোনের ও মেমোরি কার্ডের সকল তথ্য কপি, চুরি ও হ্যাক করে নেওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রেও বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। কল রিসিভ না করলে কোনো বিপদ নেই। বিপজ্জনক কলের নম্বরগুলো অনেকটা এমন +88016306, +880178, +88018503 ইত্যাদি।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, জালিয়াতির ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুয়া নথি দিয়ে সিমকার্ড তোলা হয়। ফলে সিমকার্ডের তথ্য দিয়ে অভিযুক্তকে চিহ্নিত করা যায় না, বরং আরও বেশি গোলকধাঁধায় পড়েন তদন্ত কর্মকর্তারা। এ জন্য এখন বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ও জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া যাতে সিম কেউ কিনতে না পারেন সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু একটি সিম যদি কেউ অনেকদিন ধরে ব্যবহার না করেন এ তথ্য জানতে পারলে মোবাইল পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার কোনো পরিচিত কর্মকর্তার সহায়তায় বন্ধ সিমটি তুলে ব্যবহার করে প্রতারকরা। এতে করে সিমের আসল মালিক জানতেই পারেন না যে তার সিম তুলে অন্য কেউ ব্যবহার করছে। আবার অনেক সময় প্রতারক সচল কোনো সিম নম্বর আসল মালিকের অজান্তেই তুলে ব্যবহার করতে থাকে। এক্ষেত্রে একই নম্বর দুই সিমে সচল থাকে। ‘ক্লোনিং’ করতে হলে সিমের পুরো তথ্যই চুরি করতে হয়। একসঙ্গে একই সিমের একাধিক কপি চালু থাকলে অন্য কেউ যদি ওই নম্বরে কল করে তাহলে সর্বশেষ যে কপি থেকে কল করা বা রিসিভ হয়েছে সেটাতে ঢুকবে।আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে দেশের মোবাইল অপারেটরগুলো ব্যক্তির তথ্যের নিরাপত্তায় তেমন জোরালো কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেনা। একজনের নামে রেজিষ্ট্রেশন করা সিম অন্য একজন তুলে নিয়ে গেছে এমন অভিযোগ প্রায়শ:ই শোনা যায়। সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সোস্যাল নেটওয়ার্কে এমন অভিযোগ সম্পর্কে প্রতারনার খবর হরহামেশাই ছাপা হয়। প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন সময় পোষ্টও করা হয়।

মুলত:এটি প্রযুক্তির অপব্যবহার। এই অপব্যবহারের মাধ্যমে যে কোন সরকারি কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধির বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধির নির্ধারিত মোবাইল ফোন নম্বরটির সিম ক্লোনিং করা হয়। এবং সিম ক্লোনিং করে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের সাধারন মানুষকে ঐ ক্লোনিং করা সিম দিয়ে ফোন করা হয়।

এ বিষয়ে আজ ৬ই ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৫ টায় নবসৃষ্ট কর্ণফূলী উপজেলার নির্বাহী অফিসার বিজেন ব্যানার্জী অফিসের ফেসবুকে পেইজে স্টাটাস দিয়ে জনগণকে সতর্ক করেছেন।

তথ্যসুত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিকতম সময়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ডিসি,ইউএনও,ওসি এবং স্থানীয় সরকারের অধীনে থাকা চেয়ারম্যানদের নাম্বার ক্লোনিং করে ফোন করে বিশাল অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। আর বিশেষ সফটওয়্যার ও অ্যাপসের মাধ্যমে মোবাইল ফোন নম্বর নকল করার এ পদ্ধতিকে বলা হয় ক্লোনিং। এমনকি মন্ত্রী, এমপিসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন নম্বর নকল করে প্রতারণার বেশ কিছু ঘটনা ধরাও পড়েছে। তবে এরই মধ্যে অপরাধীরা পাল্টে ফেলেছে প্রতারণার কৌশল। এবার তারা নিয়ে এসেছে স্পুফিং নামের আরেক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে প্রতারকচক্রের কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন আইডি (পরিচয়) হাইড গোপন রাখা সম্ভব। এই স্পুফিংয়ের মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনাও নজরে এসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করা গেছে একটি বড় চক্রকে। দেশের আরো অনেকের মতো টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিও এ ধরনের প্রতারণার শিকার বলে জানা গেছে।

গত বছরের ১৭ অক্টোবর বিটিআরসি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়, তাদের কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে ফোন বা এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রতারকচক্র। আরো জানা যায়,ভোলা,কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, ঠাকুরগাঁও, চাঁদপুর, মেহেরপুর, বাগেরহাটসহ ৪০টির বেশি উপজেলার ইউএনও পরিচয় দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে এ পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অপরাধী চক্রটি। সফটওয়্যারটি তাদের মোবাইল ফোনে ইনস্টল করা থাকে। অন্যদিকে ‘ক্লোনিং’ বা স্পুফিং মানে সিমের পুরো তথ্যই চুরি করে মানুষকে বিপদে পেলে। যে কারো ব্যক্তিগত সিম ক্লোনিং এর শিকার হলে বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও অবহিত করা প্রয়োজন।

বিষয়টি সম্পর্কে গ্রাম গন্জের সাধারন মানুষ তেমন জানেন না। মুলত: সাধারন মানুষকে সতর্ক করা সরকারী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের পর্যায়ে পড়ে।এমন ভাবনা থেকেই কর্ণফূলী উপজেলার জনসাধারণের নিরাপত্তার স্বার্থে বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে নজরে আনতে ইউএনও বিজেন ব্যানার্জী স্ট্যাটাস দিয়েছেন বলে জানা যায়।

 

জে, জাহেদ


বিশেষ প্রতিবেদক

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন