বিজয় অর্জিত হয়েছে ! একজন উন্নয়ন কর্মীর শিরোনামহীন গদ্য

35
bijoy_orgito_hoyeche

ফেসবুকে আছেন বন্ধুর তালিকায়। নাম রাজু নুরুল। একজন উন্নয়ন কর্মী। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। নিজের ফেসবুক ওয়ালে শিরোনামহীন কিন্তু বিষয় ও দিবসভিত্তিক নিত্যদিন লিখেন।প্রতিদিনের মতো আজও লিখেছেন বিজয় অর্জিত হয়েছে!

শব্দের গাঁথুনী শক্তিশালী ও সমসাময়িক।এ যেন আমারও হৃদয়ের কথা। হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল তাই প্রচার। আজ মুক্তিযুদ্ধের মহান বিজয় দিবস। এ কারনেই হয়তো লিখলেন বিজয় অর্জিত হয়েছে? প্রথমেই ভাবলাম নিজের ওয়ালে শেয়ার করি। কিন্তু না, সমসাময়িক এই রচনাটি সংরক্ষন করা প্রয়োজন। লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত লাল-সবুজের এই পতাকা আমার বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের এই দিনে তাই শপথ হোক ক্ষুদা ও দারিদ্রতামুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।

বিজয় অর্জিত হয়েছে! শিরোনামহীন লেখাটি পড়ুন

ওয়াশিংটন থেকে আমাদের এক সহকর্মী এসেছে। দশ বছর পরে। আমি তাকে খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই দশ বছরের ব্যবধানে তুমি বাংলাদেশকে কেমন দেখলা?’

তার চোখেমুখে মুগ্ধতা, বললো, ‘বিস্ময়কর অগ্রগতি! বিশ্বাস করা যায় না, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে একটা দেশ এতোটা উন্নতি করতে পারে। আমিতো রাস্তাঘাট, বাড়িঘর কিছুই চিনতে পারছি না। কয়েক বছরের ব্যবধানে এত বড় বড় দালানকোঠা উঠেছে যে, এই শহরকে চেনাই যায় না।’

আমি এই খেলাটা নিয়মিত খেলি। অন্যের চোখে বাংলাদেশকে আবিস্কারের একটা নেশা বলা যেতে পারে। মজার ব্যাপার হলো, শুধু ঢাকা থেকে ঘুরে যাওয়া বিদেশী, আর ঢাকার বাইরের কোন শহর বা গ্রাম এলাকা থেকে ঘুরে যাওয়া বিদেশীদের প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়।

শুধু ঢাকা থেকে যারা ‍ঘুরে যায়, তারা এই শহরের বড় বড় দালানকোঠা, ভিক্ষুক, ট্রাফিক জ্যাম আর দূষনের কথা বলে! আর যারা ঢাকার বাইরে যাওয়ার সুযোগ পায়, তারা বলে, ‘তোমাদের দেশটা অপূর্ব সুন্দর। ধনধান্যে পুষ্পে ভরা।’ সবার আগে এদেশের মানুষের আতিথেয়তার প্রশংসা করে তারা।

আসলেইতো আমাদের দেশটা অনেক এগিয়েছে। আজ থেকে ৭/৮ বছর আগেও ৩০/৩৫ ভাগ শিশু স্কুলে ভর্তিই হতো না। এখন ৯৬ ভাগ শিশু স্কুলে ভর্তি হয়। প্রায় ৩০ ভাগ মানুষ খোলা জায়গায় পায়খানা করতো, এখন সেটা মাত্র ১ ভাগে নেমে এসেছে। হাসপাতালের সংখ্যা বেড়েছে। শহরগুলো বড় হয়েছে, বাজেটের আকার বেড়েছে, মানুষের হাতে কত কত টাকা।

গত ১০ বছরে কোটিপতির সংখ্যা কয়েক’শ গুণ বেড়েছে। প্রতিটা ম্যাচ খেলার জন্য একজন বিদেশী খেলোয়াড়কে আমরা প্রায় ২৫ লাখ টাকা দেই। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধায় এখন আর মানুষ মঙ্গায় আক্রান্ত হয়ে কচু-ঘেচু খেয়ে মরে না! পোলিও, ডিপথেরিয়ার মতো রোগ প্রায় জাদুঘরে চলে গেছে।

তবু কোথায় যেন কিছুটা বেসুরো লাগে- মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের বিজয় দেখে যেতে পারেন নি! 

আমাদের দারোয়ান মেয়েটার হাজবেন্ড প্রায় অসুস্থ থাকে। সেদিন দেখলাম মাথা ন্যাড়া করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম,‘শীত আসছে, এখন আর মাথা ন্যাড়া করার দরকার কি?’

উত্তরে যা আসলো, তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। বললো,‘এখন ৫০ টাকার নিচে চুল কাটা যায়না। মাসে মাসে এত টাকা পামু কই?’ আমি থমকে গেলাম।

একজন গর্ভবতী মা ৫০০ টাকা ভাতা নেয়ার জন্য পেটে ৯ মাসের বাচ্চা নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে সারাদিন বসে থাকার পর সেখানেই বাচ্চা প্রসব করে ফেলছে!কতোটা অভাব-অনটনে থাকলে কেউ সারাদিন ৫০০ টাকার আশায় বসে থাকে?

শহরে বাস করা কোটি মানুষের অবস্থা ভাল নয়। তারা বস্তিতে দিন যাপন করে। সেখানে জীবন যাপনের সুবিধাদি নেই। দ্রব্যমূল্যের বাজার হুটহাট লাগাম ছাড়া হয়ে যায়। কে যেন পেছন থেকে তাড়া করে। মানুষ এখনো বিচার পায় না। হুটহাট করে কেউ গায়েব হয়ে যায়। রাস্তাঘাটে নিরাপত্তা নাই। কোন কারণ ছাড়া মহাসড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যাম লেগে থাকে। বছর বছর, একই নিয়মে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়…কিছুদিন পর পর জঙ্গিগোষ্ঠি মাথাছাড়া দিয়ে উঠে…

এসব সামলাতে না পারলে তো দেশের বড় একটা জনগোষ্ঠির দু:খ-কষ্ট লাঘব হয় না। সাধারণ মানুষ খুব অসহায় বোধ করে।

একটা দেশ, আমাদের দেশ বাংলাদেশ। একটা পতাকা। লাল-সবুজের পতাকা। পতাকাতো সবার!কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা সবার হয়ে ওঠে না, ততক্ষণ অব্দি কী করে বলি যে বিজয় অর্জিত হয়েছে?

সকলকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানাই।

 

(পুনশ্চ: লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে লেখাটি ফোকাস বাংলা নিউজ এ পুন:প্রকাশ করা হলো)

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন