প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার – এক বিপ্লবী নারী

735

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার সম্পর্কে নতুন করে আর বলার কিছু নেই। তিনি একজন বাঙালি নারী যিনি ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা ও প্রথম বিপ্লবী নারী শহীদ। অন্তর্মুখী, লাজুক এবং মুখচোরা স্বভাবের এই বীরকন্যার জন্ম ১৯১১ সালে ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে। চট্টগ্রামের ডাঃ খাস্তগীর বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী প্রীতিলতাকে আদর করে তার মা  “রাণী” ডাকতেন। আর “ফুলতার” ছিলো তার ছদ্মনাম। 

প্রীতিলতা তখন সবে শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা রেখেছেন। চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা তখন মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন শেষে সক্রিয় হচ্ছিলেন। এর মধ্যে ১৯২৩-এর ১৩ ডিসেম্বর টাইগার পাস এর মোড়ে বিপ্লবী মাস্টার দা সূর্য সেনের বিপ্লবী সংগঠনের সদস্যরা প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারী কর্মচারীদের বেতন বাবদ নিয়ে যাওয়া ১৭,০০০ টাকা ছিনতাই করে। এ ছিনতাইয়ের প্রায় দুই সপ্তাহ পর গোপন বৈঠক চলাকালীন অবস্থায় বিপ্লবীদের আস্তানায় হানা দিলে পুলিশের সাথে যুদ্ধের পর গ্রেফতার হন সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী। তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় রেলওয়ে ডাকাতি মামলা। বড়দাদা মধুসূদনের কাছ থেকে সেই খবর শুনে প্রীতিলতা দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

প্রীতিলতার নিকট-আত্মীয় পূর্ণেন্দু দস্তিদার তখন বিপ্লবী দলের কর্মী। তিনি সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত কিছু গোপন বই প্রীতিলতার কাছে রাখেন। তখন তিনি দশম শ্রেনীর ছাত্রী। লুকিয়ে লুকিয়ে তিনি পড়েন “দেশের কথা”, “বাঘা যতীন”, “ক্ষুদিরাম” আর “কানাইলাল”। এই সমস্ত গ্রন্থ প্রীতিলতাকে বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে। প্রীতিলতা দাদা পূর্ণেন্দু দস্তিদারের কাছে বিপ্লবী সংগঠনে যোগদান করার গভীর ইচ্ছার কথা বলেন। কিন্তু তখনো পর্যন্ত বিপ্লবীদলে মহিলা সদস্য গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি নিকট আত্মীয় ছাড়া অন্য কোন মেয়েদের সাথে মেলামেশা করাও বিপ্লবীদের জন্য নিষেধ ছিলো।

ঢাকায় সে সময়ে “শ্রীসংঘ” নামে একটি বিপ্লবী সংগঠন ছিল। যেটার একটা মহিলা শাখা ছিল যার নাম “দীপালী সঙ্ঘ”। সংগঠনটি নারী শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি গোপনে মেয়েদের বিপ্লবী কাজে অন্তর্ভুক্ত করার কাজও করতো। ইডেন কলেজে পড়ার সময় প্রীতিলতা সেই সংগঠনের সাথে যুক্ত হন। তখন তিনি নিজেকে মাস্টারদা সূর্যসেনের একজন উপযুক্ত কমরেড হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।১৯৩২ সালে কলকাতার বেথুন কলেজ হতে বিএ পাশ করার পর মাস্টারদা সূর্যসেনের সাথে দেখা করার প্রত্যয় নিয়ে তিনি বাড়িতে ফিরেন কিন্তু বাড়িতে এসে দেখেন তার পিতার চাকরি নেই। সংসারের অর্থকষ্ট মেটানোর জন্য তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন এবং অপর্ণাচরণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে (তৎকালীন নন্দনকানন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়) প্রধান শিক্ষিকা পদে নিযুক্ত হন। ডাঃ খাস্তগীর বিদ্যালয়ের এক বছরের সিনিয়র কল্পনা দত্ত ছিলেন প্রীতিলতার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। সূর্যসেনের সাথে সাক্ষাতের আগ্রহের কথা তিনি কল্পনা দত্তকে জানান। যেহেতু কল্পনা দত্ত প্রীতিলতার এক বছরের সিনিয়র সেহেতু প্রীতিলতা বিএ পাশ করার এক বছর আগে অর্থাৎ ১৯৩১ সালে কল্পনা দত্ত কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে বদলী হয়ে চট্টগ্রাম কলেজে বিএসসি’তে ভর্তি হন। সে কারণে প্রীতিলতার আগেই কল্পনা দত্তের সাথে মাষ্টারদার দেখা হয়। ১৯৩১ সালে কল্পনা দত্ত সহ আরও বেশ কয়েকজন বিপ্লবীর সাথে যখন মাস্টারদা সূর্যসেনের গোপন সাক্ষাৎ হয় তখন মাস্টারদা সেই সাক্ষাতে কল্পনা দত্তের কাছে প্রীতিলতার খোঁজ খবর জানতে চেয়েছিলেন।

অবশেষে ১৯৩২ সালের ১৩ জুন চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের প্রধান কেন্দ্র ধলঘাটের ঘাঁটিতে মাস্টারদা সূর্যসেনের সাথে দেখা করতে যান প্রীতিলতা। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় প্রীতিলতা তার মাকে সীতাকুন্ডে যাওয়ার কথা বলেন। যে বাড়িতে প্রীতিলতার সাথে মাস্টারদার সাক্ষাৎ হয় সে বাড়িতে নির্মল সেনও ছিলেন। সেই বাড়িতে সূর্যসেনের অবস্থানের কথা পটিয়া পুলিশ ক্যাম্প গোপন সূত্রে জানতে পারে। এর আগে একই বছর মে মাসে ব্রিটিশ সরকার সূর্যসেন ও নির্মল সেনকে জীবিত কিংবা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষনা করে। পটিয়া পুলিশ ক্যাম্পের অফিসার-ইন-চার্জ ক্যাপ্টেন ক্যামেরন খবরটি জানার পর পুরষ্কার এবং পদোন্নতির আশায় ঐ বাড়িতে অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং রাত প্রায় ৯টায় ধলঘাটের ঐ বাড়িতে উপস্থিত হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ব্যাপারটি নির্মল সেনকে জানিয়ে সূর্যসেন ও প্রীতিলতা বাড়ির পিছন দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও পুলিশের গুলিতে নির্মল সেন নিহত হন।

ইতিমধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায় পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ। এদিকে পরিস্থিতি খুব খারাপ দেখে মাস্টারদা সূর্যসেন প্রীতিলতাকে আত্মগোপন করার নির্দেশ দেন। ৫ জুলাই ছাত্রী পড়ানোর কথা বলে প্রীতিলতা বাড়ি ত্যাগ করেন এবং বিপ্লবী মনিলাল দত্ত ও বীরেশ্বর রায়ের সাথে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে প্রীতিলতা আত্মগোপন করেন (সে দিনের পর প্রীতিলতার সাথে তাঁর বাবা-মা’র আর দেখা হয়নি)। প্রীতিলতার বাবা অনেক খোঁজাখুজির পর ব্যর্থ হয়ে মেয়ের খোঁজে থানা-পুলিশের সরনাপর্ন হলে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তখন বুঝতে পারে যে প্রীতিলতা আত্মগোপন করেছেন। প্রীতিলতা তখন চট্টগ্রামের বেশ কিছু জায়গায় আত্মগোপন করেছিলেন। ১৯৩২ সালের ১৩ জুলাই কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রীতিলতার আত্মগোপনের খবর প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশ সরকার তখন তার সন্ধানে ব্যস্ত সময় কাটায়। প্রীতিলতাকে ধরার জন্য বেঙ্গল পুলিশের সি আই ডি ছবিসহ নোটিশ প্রকাশ করে।

১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে চট্টগ্রামে পাহাড়তলীস্থ ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমনের সিদ্ধান্ত হলে সূর্যসেন এই অভিযানের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেন প্রীতিলতাকে। তৎকালীন ইউরোপিয়ান ক্লাব ছিল ব্রিটিশদের প্রমোদকেন্দ্র। পাহাড়ঘেরা এই ক্লাবের চতুর্দিকে ছিল প্রহরী বেষ্টিত। একমাত্র শ্বেতাঙ্গরা এবং ক্লাবের কর্মচারী, বয়-বেয়ারা, দারোয়ান ছাড়া এদেশীয় কেউ ঐ ক্লাবের ধারে কাছে যেতে পারতো না। সন্ধ্যা হতেই ইংরেজরা এই ক্লাবে এসে মদ খেয়ে নাচ, গান এবং আনন্দ উল্লাস করতো। এই ক্লাবের ফটকে লেখা ছিল “Dogs and Indians not allowed”। ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমনের আগে চট্টগ্রাম শহরের দক্ষিণ কাট্টলীতে যোগেশ মজুমদার নামের ঐ ক্লাবেরই একজন বেয়ারার বাড়িতে বিপ্লবীরা আশ্রয় পান। যোগেশ মজুমদার ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমনের ব্যাপারে বিপ্লবীদের সহায়তা করেন। ২৩ সেপ্টেম্বর এ আক্রমণে প্রীতিলতার পরনে ছিল মালকোঁচা দেওয়া ধুতি আর পাঞ্জাবী, চুল ঢাকার জন্য মাথায় সাদা পাগড়ি এবং পায়ে রাবার সোলের জুতা। ইউরোপিয়ান ক্লাবের পাশেই ছিল পাঞ্জাবীদের কোয়ার্টার। এর পাশ দিয়ে যেতে হবে বিধায় প্রীতিলতাকে পাঞ্জাবী ছেলেদের মত পোষাক পড়ানো হয়েছিল। সে দিনের আক্রমনে প্রীতিলতার সাথে যারা ছিলেন তারা হলেন- কালীকিংকর দে, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, শান্তি চক্রবর্তী (এদের পরনে ছিল- ধুতি আর শার্ট), মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল দে এবং পান্না সেন (এদের পরনে ছিল- লুঙ্গি আর শার্ট)। বিপ্লবীদের আশ্রয়দাতা যোগেশ মজুমদার প্রথমে ক্লাবের ভিতর থেকে রাত আনুমানিক ১০টা ৪৫ এর দিকে আক্রমণের নিশানা দেখিয়ে দেন এবং এর পরেই ক্লাব আক্রমণ শুরু হয়। সেদিন ছিল শনিবার, প্রায় ৪০জন মানুষ তখন ক্লাবঘরে অবস্থান করছিল। তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিপ্লবীরা ক্লাব আক্রমণ শুরু করেন। পূর্বদিকের গেট দিয়ে ওয়েবলি রিভলবার এবং বোমা নিয়ে আক্রমণের দায়িত্বে ছিলেন প্রীতিলতা, শান্তি চক্রবর্তী এবং কালীকিংকর দে। ওয়েবলি রিভলবার নিয়ে সুশীল দে এবং মহেন্দ্র চৌধুরী ক্লাবের দক্ষিণের দরজা দিয়ে এবং পিস্তল নিয়ে বীরেশ্বর রায়, রাইফেল আর হাতবোমা নিয়ে পান্না সেন আর প্রফুল্ল দাস ক্লাবের উত্তরের জানালা দিয়ে আক্রমণ শুরু করেছিলেন। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ শুরুর নির্দেশ দেবার পরেই ঘন ঘন গুলি আর বোমার আঘাতে পুরো ইউরোপিয়ান ক্লাব কেঁপে উঠেছিলো। ক্লাবঘরের সব বাতি নিভে যাওয়ার কারনে ক্লাবে উপস্থিত থাকা সবাই অন্ধকারে ছুটোছুটি করতে লাগল। ক্লাবে কয়েকজন ইংরেজ অফিসারের কাছে রিভলবার থাকায় তারা পাল্টা আক্রমণ করলো। একজন আর্মি অফিসারের রিভলবারের গুলিতে প্রীতিলতার দেহের বাম পাশে গুলির আঘাত লাগে। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার নির্দেশে আক্রমণ শেষ হলে বিপ্লবী দলটির সাথে তিনি কিছুদূর এগিয়ে আসেন। সেই দিনের আক্রমণে মূলত অনেক ব্রিটিশ নিহত হলেও পুলিশের রিপোর্টে মাত্র ১জন নিহত ও ১১জন আহতের খবর প্রকাশ করা হয়।

পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ শেষে পূর্বসিদ্বান্ত অনুযায়ী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার পটাসিয়াম সায়ানাইড খান। কালীকিংকর দে’র কাছে তিনি তাঁর রিভলবারটা দিয়ে আরো পটাশিয়াম সায়ানাইড চাইলে কালীকিংকর তা প্রীতিলতার মুখের মধ্যে ঢেলে দেন। তার মৃতদেহের পোশাকে নিজ হাতে লেখা বিবৃতিতে লেখা ছিল- “আমরা দেশের মুক্তির জন্য এই সশস্ত্র যুদ্ধ করিতেছি। অদ্যকার পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি অংশ। ব্রিটিশরা জোর পূর্বক আমাদের স্বাধীনতা ছিনাইয়া লইয়াছে। সশস্ত্র ভারতীয় নারী সমস্ত বিপদ ও বাঁধাকে চূর্ণ করিয়া এই বিদ্রোহ ও সশস্ত্র মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করিবেন এবং তাহার জন্য নিজেকে তৈয়ার করিবেন- এই আশা লইয়া আমি আজ আত্মদানে অগ্রসর হইলাম।”

ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে অংশ নেয়া অন্য বিপ্লবীদের দ্রুত স্থান ত্যাগ করার নির্দেশ দেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়া প্রীতিলতাকে বিপ্লবীরা শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে সবাই স্থান ত্যাগ করেন। পরদিন পুলিশ ক্লাব থেকে ১০০ গজ দূরে মৃতদেহ দেখে পরবর্তীতে প্রীতিলতাকে সনাক্ত করেন। ময়না তদন্তের পর জানা যায় গুলির আঘাত তেমন গুরুতর ছিল না এবং পটাশিয়াম সায়ানাইড ছিল তাঁর মৃত্যুর কারণ

  প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের অবস্থা নিয়ে বিপ্লবী কল্পনা দত্ত লিখেছিলেনঃ “প্রীতির বাবা শোকে দুঃখে পাগলের মত হয়ে গেলেন। কিন্তু প্রীতির মা গর্ব করে বলতেন, ‘আমার মেয়ে দেশের কাজে প্রান দিয়েছে’। তাদের দুঃখের পরিসীমা ছিল না, তবু তিনি সে দুঃখকে দুঃখ মনে করেননি। ধাত্রীর কাজ নিয়ে তিনি (প্রীতিলতার মা) সংসার চালিয়ে নিয়েছেন। প্রীতির বাবা প্রীতির দুঃখ ভুলতে পারেননি। আমাকে দেখলেই তাঁর প্রীতির কথা মনে পড়ে যায়, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন”।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন