একজন আবদুল গফুর হালি, শিকড়ের সন্ধানে সৃষ্টি ও দর্শন। রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেয়া এখন সময়ের দাবী

184
abdul_gafur_hali

একজন আবদুল গফুর হালি, ডিসেম্বর ২১, ২০১৬ বুধবার ভোর সাড়ে ৫টার সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমান (ইন্নালিল্লাহে….. রাজেউন)।

শিকড়ের সন্ধানে, সৃষ্টি ও দর্শন

‘‘সোনাবন্ধু তুই আমারে করলি দিওয়ানা’’কিছু কি মনে পড়লো আপনার? কিংবা “রসিক তেল কাজলা কোন পাঞ্জাবিঅলা”, “মনের বাগানে ফুটিল ফুলগো, তুঁই যাইবা সোনাদিয়া বন্ধু মাছ মারিবার লাই”,‘‘অ শ্যাম রেঙ্গুম ন যাইও”, “বানুরে অ বানু আঁই যাইমুব রেঙ্গুম শরত তোঁয়ার লাই আইন্যম কী”, কিংবা “দেখে যারে মাইজভাণ্ডারে”,“কতো খেলা জানরে মাওলা”,“মাইজভাণ্ডারে কি ধন আছে”অথবা“চল যাই জিয়ারতে মোহছেন আউলিয়ার দরবারে”, “আল্লাহর ফকির মরে যদি”, ইত্যাদি শত শত কালজয়ী গানের রচিয়তা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ‘সোনাবন্ধু’ মরহুম আবদুল গফুর হালি আমাদের মাঝে আর নেই।

আবদুল গফুর হালি : জন্ম ও পরিচয়

আবুদল গফুর হালি: জন্ম ও উপাধি

মরহুম শিল্পী আবদুল গফুর হালী ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে পটিয়া উপজেলার রশিদাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আবদুস সোবহান, মা গুলতাজ খাতুন। লেখাপড়া করেছেন রাশিদাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জোয়ারা বিশ্বম্বর চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়। প্রথাগত শিক্ষা শেষ না করে স্ব-শিক্ষিত আবদুল গফুর হালি পঞ্চাশের দশক থেকে সংগীতজীবন শুরু করেন। ছোটবেলায় আধ্যাত্মিক ও মরমী গান এই শিল্পীর মনে দারুন প্রভাব ফেলে। হালি শুধু মাটির গান করেননি, ভাবের রসে মত্ত করেছেন ভক্তদের। গণসংগীত শিল্পীদের মতই কন্ঠসৈনিক হিসেবে তাকে পাওয়া যেতো স্বাধীকার আন্দোলনে। আঞ্চলিক, মাইজভান্ডারী ও ভাবের গানসহ সব মিলিয়ে প্রায় দু’হাজার গান লিখেছেন তিনি। ৮৭ বছর বয়সেও গান লিখে ও গেয়ে সংসার চালিয়েছেন। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘আর কত কাল খেলবি খেলা/মরণ কি তোর হবে না/আইল কত গেল কত/ কোথায় তাদের ঠিকানা’– গানটি শুনে পীর শফিউল বশর মাইজভান্ডারী আবদুল গফুরকে হালি উপাধি দেন। আবদুল গফুর হালি’র গানে ঠাট নির্বাচনে বিলাবল, ইমন ও ভৈরবীর প্রাধান্য যেমন আছে তেমনি চট্টগ্রামের উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল ভেদে কোথাও গমকের, মীড়ের সমন্বয়ও ঘটিয়েছেন। অলংকার প্রয়োগ এবং অনুপ্রাস সৃষ্টি করে লোকজীবনের শেকড়ে প্রবেশ করে নির্যাস বের করে এনেছে অনায়াসে। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বেতারে তাঁর লেখা গান প্রচার শুরু হলেও গীতিকার,সুরকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে।

আবদুল গফুর হালি ও আঞ্চলিক নাটক

১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের এক কর্মকর্তার অনুরোধে আঞ্চলিক নাটক লেখা শুরু করেন তিনি। তাঁর প্রচারিত আঞ্চলিক নাটক হল গুলবাহার, নীলমনি, সতী মায়মুনা, কুশল্যা পাহাড়, আশেক বন্ধু আজব সুন্দরী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। আব্দুল গফুর হালী একাধারে কন্ঠশিল্পী, গীতিকার, সুরকার এবং মরমী সাধক। তবে শিল্পীর বাবা এসব পছন্দ করতেন না বলে ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ছেলেকে সংসারী করতে রাবেয়া খাতুনের সাথে বিয়ে দেন। কিন্তু হলো উল্টো। এ সময় থেকেই তাঁর সংগীতগুরু মুন্সি বজলুর রহমানের কাছে গানের তালিম নিতে শুরু করলেন। ব্যক্তিগত জীবনে আঞ্চলিক গানের এই প্রাণপুরুষআবদুল গফুর হালি দুই পুত্র, দুই মেয়ের জনক। দৈনন্দিন জীবনের স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সহজ ও সাবলীল ভাষায় এবং সুরের হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনায় চট্টগ্রামের লোকসংস্কৃতির বটবৃক্ষ হয়ে আছেন।

আবদুল গফুর হালি : গবেষনা ও মুল্যায়ন

জার্মানির হালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতবর্ষ বিষয়ক দর্শন শাস্ত্রের সহকারী অধ্যাপক হানস হারডার (বর্তমানে হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক) ১৯৮৯ সালের দিকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের মাইজভান্ডারসহ বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন। পরে শিল্পী কল্যাণী ঘোষের মাধ্যমে যোগাযোগ হয় আবদুল গফুর হালীর সঙ্গে। তাঁর জীবন ও গান নিয়ে ২০০৪ সনে ডার ফেরুকটে গফুর, স্প্রিখট (পাগলা গফুর, বলে) নামে একটি গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এতে হালির ৭৬টি গান অন্তর্ভুক্ত হয়। এগুলোকে আবদুল গফুর হালী রচিত পূর্ববাংলার মরমি গান বলে উল্লেখ করেছেন হানস হারডার। তিনি আবদুল গফুর হালী সম্পর্কে লেখেন, “আবদুল গফুর হালীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রি বা উপাধি না থাকলেও নিজের চেষ্টায় তিনি অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী হতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি নিজেকে শুধু বাংলা সাহিত্যের দিকে সরাসরি ধাবিত করেননি। প্রায় প্রতিদিনই তিনি মাইজভান্ডারি গান রচনা করেন।”

তাঁকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘মেঠো পথের গান’। ‘মেঠো পথের গান’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটিতে কিংবদন্তি লোকশিল্পী আবদুল গফুর হালীর জীবনের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে, ছবিটি ৩৯ মিনিটের। চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন শৈবাল চৌধুরী।

চট্টগ্রামের বর্নাঢ্য সংগীতধারা আঞ্চলিকও মাইজভান্ডারী গানের বিভাগে তাঁর গান নিয়েও গবেষণা হয়েছে ।এছাড়া চট্রগ্রাম থেকেও দুটি গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থ দু’টি হলো- নাসির উদ্দিন হায়দার সম্পাদিত‘সুরের বন্ধু’ এবং মোহাম্মদ আলী হোসেন সম্পাদিত ‘শিকড়’। এই গ্রন্থে ২০০টি গানের স্বরলিপি রয়েছে।

“চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান ও মাইজভান্ডারী গানকে আঞ্চলিকতার গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে ও সংস্কৃতির বলয়ে সমাদৃত করার পেছনে বলিষ্ট ভূমিকা রেখেছেন প্রয়াত আবদুল গফুর হালি। নিজের মেধা, শ্রম, তীক্ষ্ম বুদ্ধি, বিচক্ষণতা ও যোগ্যতা দিয়ে অল্প শিক্ষিত হওয়ার পরও নিজেকে উচ্চ আসনে সমাহিত করেছেন আবদুল গফুর হালি। চট্টগ্রামের সংস্কৃতির জগতকে পরিপূর্ণ সমাদৃত করতে ও জননন্দিত করতে আবদুল গফুর হালি ছিলেন নিরলস, নিভৃতচারী ও সঙ্গীত পরিব্রাজক। তাঁর অকাল মৃত্যুতে জাতি একজন সংস্কৃতির ধ্রুবতারাকে হারাল। আবদুল গফুর হালির মূল্যায়ন ও অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান ও মাইজভান্ডারী গানকে বাঙালির সংস্কৃতির বলয়ে আনা জরুরী। চট্টগ্রামের সংস্কৃতির মূল্যায়নে প্রয়াত আবদুল গফুর হালিকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দিতে হবে সরকারকে।”

—–গত ২০ জানুয়ারী বিকাল ৫ টায় নগরীর মোমিন রোডস্থ কদমমোবারক ইসলামাবাদী হলে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট চট্টগ্রাম বিভাগ ও ডিজিটাল বাংলাদেশ পাবলিসিটি কাউন্সিলের উদ্যোগে বিশিষ্ট নারীনেত্রী হাসিনা জাফরের সভাপতিত্বে সদ্য প্রয়াত আবদুল গফুর হালি স্মরণে আয়োজিত স্মরণ অনুষ্ঠান ও সঙ্গীত সন্ধ্যায় প্রধান অতিথি’র বক্তব্যে প্রফেসর ড. গাজী সালেহ উদ্দিন উপরোক্ত মন্তব্য করেন। এ সময় বিশেষ অতিথি ছিলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিনবোধি ভিক্ষু, বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার সোসাইটির মহাসচিব লেখক এম নাজিম উদ্দিন চৌধুরী এ্যানেল।সভায় বক্তারা বলেন, “চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে বাঙালি সংস্কৃতির বলয়ে আনার ক্ষেত্রে আবদুল গফুর হালির অবদান ও কর্মদক্ষতা চিরস্মরণীয়। যতদিন সংস্কৃতির বলয়ে ও মানুষের হৃদয়ে আঞ্চলিক গান ও মাইজভান্ডারী গান জাগরূপ থাকবে ততদিন আবদুল গফুর হালি অমর হয়ে থাকবেন। বক্তারা আরো বলেন, যারা সৃষ্টিতে থাকেন, তারা অমর হয়ে থাকেন। আজীবন আবদুল গফুর হালি সৃষ্টিতে রত ছিলেন। তার অমর সৃষ্টিতে আঞ্চলিক গান ও মাইজভান্ডারী গান বিশ্ব সমাদৃত। তার অমর সৃষ্টি অমর করে রাখবেন তাঁকে।”

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক স.ম. জিয়াউর রহমানের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন, সংগঠনের সহ-সভাপতি মোঃ জসিম উদ্দিন চৌধুরী, সহ-সাধারণ সম্পাদক সুভাষ চৌধুরী টাংকু, দপ্তর সম্পাদক প্রকৌশলী টি কে সিকদার, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক প্রকৌশলী সঞ্জয় কুমার দাশ, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ মিসবাহ উদ্দিন, সমাজকল্যাণ সম্পাদক মোঃ জামাল উদ্দিন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক ইমরান ফারুকী, সহ-সাংষ্কৃতিক সম্পাদক শিল্পী হারুন অর রশিদ, সদস্য সুমন চৌধুরী, শেখ মোঃ আবদুল্লাহ শেকাব, মোঃ সেলিম উদ্দিন ডিবলু, সুমন চৌধুরী, মোঃ হারুনুর রশিদ, অভিজিৎ দে রিপন প্রমুখ। প্রয়াত আবদুল গফুর হালির স্মরণে তার রচিত ও সুরারোপিত মাইজভান্ডারী গান ও আঞ্চলিক গান পরিবেশন করেন, শিল্পী হারুন অর রশিদ, রাত্রি ধর, জয়িতা দত্ত, সুমাইয়া হোসেন, অর্পিতা শীল, জয় দত্ত দীপ্ত, সানজানা আফরিন, রক্তিম ধর, নিঝুম বড়–য়া, আইভী দাশ প্রমুখ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর ড. মনিরুজ্জামান তাঁর এক গবেষণায় বলেছেন, ‘১৯২৮ সালের ৬ আগস্ট পটিয়ার রশিদাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণকারী গফুর হালির আধ্যাত্মিক, ভক্তিমূলক ও আঞ্চলিক গান শুধু চট্টগ্রামকেই নয়, সারা দেশকে ভাসিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে মাইজভাণ্ডারী গানকে তিনি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন।’

আবদুল গফুর হালি : স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান

আবদুল গফুর হালি সরাসরি রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেননি। তবে ক্যাম্পে গিয়ে গান গেয়ে উদ্দীপ্ত করতেন মুক্তিযোদ্ধাদের। তাঁরা হালীর একটি গান খুব পছন্দ করতেন। সেটি হলো, ‘তোর লয় আঁর লয় ন অইব অভাই/আঁই বাঙালি, তুই পাঠান/তোর দেশে আর আঁর দেশে/দুই হাজার মাইল ব্যবধান।’

১৯৭০-এর নির্বাচনে গান গেয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে তখন। গফুর হালী চট্টগ্রাম শহরে গিয়েছিলেন কেরোসিন কিনতে। ফেরার সময় রৌশনহাটে ধরল রাজাকারেরা। বলল, ‘তুমি তো নির্বাচনে নেতার বিরুদ্ধে গান করেছ। গানের মজা এবার বোঝাব।’ তাঁর গানের একজন ভক্ত সেদিন তাঁকে বাঁচিয়েছিলেন।
পরে কালুরঘাটে আরেকবার পেয়েছিল পাকিস্তানি সেনারা। ঘাড়ে বন্দুকের বাঁট দিয়ে এমন মার দিয়েছিল যে মনে হয়েছিল, ঘাড়টা বুঝি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। স্রেফ বুদ্ধির জোরে সেদিন পালাতে পেরেছিলেন গফুর হালী।

চট্টগ্রামের একাধিক প্রবীন ব্যক্তি থেকে জানা যায়, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় গফুর হালির অনেক গান মুক্তিযোদ্বাদের অনুপ্রেরনা যগিয়েছিল। উনসত্তরে গণ-আন্দোলনের সময় বঙ্বন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ঐতিহাসিক লালদীঘির ময়দানে এলে তাঁর সামনে গফুর হালি গান ধরেন। তাঁর গান শুনে বঙ্গবন্ধু তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। এভাবে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনের সাথেও জড়িয়ে আছেন।

আবদুল গফুর হালি : শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব ও শেফালী ঘোষ

যশস্বী এই সঙ্গীতকার আবিষ্কার করেছেন অনেক কণ্ঠশিল্পীদের। তাঁর গান গেয়ে অনেক শিল্পী প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। শ্যাম-শেফালীর অনেক স্মরণীয় গানের স্রষ্টা গফুর হালী।
শুরুটা হয় নাটকীয় ভাবে – নিউ মার্কেটে ছোটখাটো একটা দোকান ছিল শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের। শ্যাম গানের মানুষ। সে সূত্রে তাঁর দোকানে শিল্পীদের আড্ডা বসে সকাল-সন্ধ্যায়। সে আড্ডায় একদিন ঢুঁ মারেন গানের জগতে নবীন আবদুল গফুরও। শ্যাম দিলখোলা মানুষ, গফুরও তা-ই—দুজনের ভাব হতে সময় লাগে না। গ্রাম থেকে গান নিয়ে শহরে ছুটে আসেন গফুর। শ্যামের কণ্ঠে তা তুলে দেন। চট্টগ্রাম বেতারে প্রচারিত হয় গানগুলো।
বেতারেই একদিন ধরে বসলেন শেফালী ঘোষ। বললেন, ‘উদা শ্যামরে দিলে অইতো ন, আঁরেও গান দেওন ফরিব (শুধু শ্যামকে দিলে তো হবে না, আমাকেও দিতে হবে)।’
শেফালী বারবার তাগাদা দেন, আর গফুর ভুলে যান। তখনকার আঞ্চলিক পরিচালক (আরডি) আশরাফুজ্জামানকে নালিশ দেন শেফালী, ‘গফুরদা আমাকে গান দিচ্ছেন না।’ আরডি ডেকে পাঠান গফুরকে। পাশে বসিয়ে চা খাওয়ান। এ কথা-সে কথা বলার পর শেফালীকে গান দিতে অনুরোধ করেন।
গফুর আরডিকে বললেন, ‘একটা দ্বৈত গান আছে। সেটা শ্যাম-শেফালীকে দিয়ে গাওয়ানো যায়।’ গফুরের প্রস্তাব লুফে নেন আরডি। বলেন, আপনি কালই গানটা রেকর্ড করে দিন।
দুই দিন পর শ্যামসুন্দরের চকবাজারের বাসায় হাজির হন গফুর। শ্যামের সাইকেলে চড়ে পৌঁছে যান শেফালীর বাসায়। শ্যাম ও শেফালীর কণ্ঠে তুলে দেন সেই গান—
‘ন যাইও ন যাইও
আঁরে ফেলাই বাপের বাড়িত ন যাইও (ছেলে)
ন গইরজ্য ন গইরজ্য
বাপর বাড়িত যাইতাম মানা ন গইরজ্য (মেয়ে)।’
বেতারে প্রচারের পর আলোড়ন তুলল গানটি। শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব ও শেফালী ঘোষের নাম ছড়িয়ে পড়ল হাটে-মাঠে।
এর আগে মলয় ঘোষ দস্তিদারের ‘নাইয়র গেলে আইস্য তারাতারি’সহ দু-একটা দ্বৈত আঞ্চলিক গান গেয়েছিলেন শ্যাম-শেফালী। কিন্তু ‘নাইয়র’ গানটির দারুণ জনপ্রিয়তা আঞ্চলিক গানে নতুন ধারা সৃষ্টি করল। প্রতিষ্ঠিত হলো নতুন জুটি—শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব ও শেফালী ঘোষ। এই একটি গান গফুরের জীবনের মোড়ও ঘুরিয়ে দেয়। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন তিনি। সংগীতজীবন শুরু করেছিলেন শিল্পী হিসেবে। খ্যাতিমান হলেন গীতিকার ও সুরকার হিসেবে। এটা ১৯৬৪ সালের ঘটনা।

আবদুল গফুর হালি : শেষ ইচ্ছে

শেষ গান হিসেবে নিজের লেখা গানটি গেয়ে ওঠেন ‘কোন সাধনে তাঁরে পাওয়া যায়।’
গাইলেন- ‘তাঁর জন্য মোর মন উদাসী ঘরে রব আমি কার আশে / আমায় নিয়ে চলরে সখি আমার বন্ধু যে দেশে।’

তাঁকে পাওয়ার জন্যই আমার সব সাধনা,তাঁকে আমার পাইতেই হবে।”- আবদুল গফুর হালি।

জীবদ্দশায় আমরা তাঁকে সম্মান দিতে না পারলেও মরোনত্তোর হলেও এই প্রথিতযশা আধ্যাত্মিক ও মরমী সাধক কালজয়ী সুর স্রষ্টা কন্ঠসৈনিক ভাববাদী মরহুম আবদুল গফুর হালীকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেয়া প্রয়োজন।

ফোবানি/হামিদ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন