হাতিয়া পৌরসভা,নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত ৬৫ হাজার বাসিন্দা, পরিত্যক্ত ঘরেই চলছে কার্যক্রম

196
hatia_pourashova_noakhali

হাতিয়া পৌরসভা,উন্নত নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত নোয়াখালী জেলার দ্বীপ উপজেলা  হাতিয়া পৌরসভা এলাকার ৬৫ হাজার বাসিন্দা। জন্ম-মৃত্যু, ট্রেডলাইসেন্সসহ নানাবিধ সনদ ছাড়া শহর উন্নয়ন প্রায় শূন্যের কোঁঠায়। কাঁচা সড়কের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, আধা পাকা ও পাকা সড়কগুলো যাতায়াতের অনুপযোগি। নেই উন্নত স্যানিটেশন, সুপেয় পানি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনার বাগাড়। ৩৫ বর্গোকিলোমিটারের এ পৌরসভা চলছে জোড়াতালি দিয়ে। জন্ম থেকেই নেই নিজস্ব ভবন। অন্যের পরিত্যাক্ত টিনের ঘরেই চলছে পৌরসভার কার্যক্রম। পৌরসভার আয়তন উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। অনেকের মতে সরকারের অবহেলাও অন্যতম একটি কারন।

একনজরে হাতিয়া পৌরসভা

পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, ৩৫ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তন নিয়ে ২০০৫ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় গঠন করা হয় হাতিয়া পৌরসভা। পৌরসভা গঠন করার প্রধান শর্ত মোতাবেক ৮৫ শতাংশ বাসিন্দা অকৃষি নির্ভর হওয়ার কথা থাকলেও পৌর এলাকার ৮৫ শতাংশ মানুষের প্রধান আয়ের উৎস্য কৃষি। তৃতীয় শ্রেণির এ পৌরসভা চর ঈশ্বররায়, তমরদ্দি, বুড়িরচর, লক্ষীদিয়া ও গুল্লাখালিসহ ৫টি মৌজায় ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এখানে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের বসবাস। হোল্ডিং রয়েছে ১০ হাজার ২০০টি। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২২০টি সড়কের অস্তিত রয়েছে। যা প্রায়  ৪৪০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩৩০ কিলোমিটার কাঁচা, ৮০ কিলোমিটার আধাকাঁচা (সলিং) ও ৩০ কিলোমিটার পাকা। এর মধ্যে ১০-১৫ কিলোমিটার ছাড়া কাঁচা, আধাকাঁচা ও পাকা সবগুলো সড়কই চলাচলের অনুপযোগি। জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে কাগজে পত্রে ৬ কিলোমিটার পাকা ড্রেণ ও ২০ কিলোমিটার কাঁচা ড্রেণ রয়েছে। এছাড়া  ৫০ কিলোমিটার খালও দেখানো হয়েছে। যদিও শহরে সামান্যটুকু পাকা ড্রেণ দেখা গেলেও তা একইবারই অপ্রতুল। কাঁচা ড্রেণ তেমন একটা চোখে পড়েনি। খালের অবস্থা দুরবস্থায় পরিণত হয়েছে। ফলে বর্ষায় দেখা দেয় জলাবদ্ধতা।

সূত্র মতে, সম্পত্তি হস্তান্তর, হোল্ডিং ট্যাক্স, ইজারা, বিভিন্ন সনদ ফি ইত্যাদি মিলেয়ে প্রতি বছর রাজস্ব পাওয়া যায় ৪০-৪২ লাখ টাকা, সরকারিভাবে প্রতি বছর এডিপি থেকে থোক বরাদ্দ মেলে ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে মেয়র, কাউন্সিলরসহ কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন ভাতাই চলে যায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। আর যা থাকে তা দিয়েই চলে উন্নয়নের কাজ। অতিরিক্ত আয়তন হওয়ায় এবং সরকারি বরাদ্দ নিতান্তই অপ্রতুল হওয়ায় অনেকটা জোড়াতালি দিয়েই চলছে উন্নয়ন কার্যক্রম। যা অনুবিক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজে পাওয়া মুসকিল হবে। এদিকে পৌর কর্তৃপক্ষ ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে ২৭ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৬৭৬ টাকার বাজেট (প্রস্তাবিত) ঘোষণা করেছে। তবে এ বাজেট বাস্তবায়ন কখনও সম্ভব কিনা বিষয়টি কর্তৃপক্ষ নিজেরাও জানে না।

hatia_noakhali_pourashovaসম্প্রতি সরেজমিনে ঘুরে এসে এমনই তথ্য পাঠিয়েছেন প্রতিবেদক, পৌরসভার নিজস্ব কোনো ভবন নেই। এর জন্মই হয়েছে উপজেলা ভুমি অফিসের পরিত্যক্ত একটি টিনসেড ঘরে। সেই থেকে আজ প্রায় এক যুগ ওই ঘরেই কার্যক্রম চলছে। পৌরসভা কার্যালয়ের সামনের সড়ক থেকে শুরু করে শহরের ৯৫ শতাংশ সড়কই চলাচলের অনুপযোগি। যেটুকু পাকা ড্রেণ রয়েছে সেগুলোও ময়লা-আবর্জনায় ভরে রয়েছে। উছখালি নামে পৌর শহরের ওলি-গলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। নেই পরিচ্ছন্ন কর্মি; ময়লা-আবর্জনা ফেলার নেই কোনো নির্দিষ্ট স্থান। নেই ময়লা-আবর্জনা নেয়ার গাড়ি। শহর এলাকায় বিদ্যুৎ আসে বিকাল ৩টায়; যা থাকে রাত ১টা পর্যন্ত। পৌরসভা থেকে কোথাও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। ব্যক্তি উদ্যোগে ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল থেকে কয়েকটি ডিপটিউবওয়েল রয়েছে মাত্র। বেশিরভাগ বাসিন্দারই উন্নত-টেকসই সেনিটেশন ব্যবস্থা নেই। পৌর শহরসহ পৌর এলাকায় ৪টি বাজার থাকলেও নেই সরকারি গণশৌচাগার। অপ্রতুল ড্রেণেজ ব্যবস্থার কারণে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। পুরো পৌরসভা জুড়েই শুধু নেই আর নেই।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শুধুমাত্র নামেই হাতিয়া পৌরসভা। এখানে কোনো সেবাই নেই। অথচ তারা নিয়মিত পৌর করসহ সকল ট্যাক্স পরিশোধ করছে।

হাতিয়া নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের জানান, যেখানে পৌর পরিষদই থাকছে পরিত্যক্ত অন্যের ঘরে। সেখানে বাসিন্দাদের অবস্থা কি হতে পারে। এখানে শুধু নেই আর নেই। ব্যবসায়ীরা শুধু ট্যাক্সই দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু নূন্যতম সেবাটুকুও পাচ্ছে না।

৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা নান্টু জানান, শুস্ক মৌসুমে মোটরসাইকেল নিয়ে চলাচল করাও মুসকিল। বর্ষায় তো বাড়ির সামনের সড়কে মাছ ধরার উপক্রম হয়। বড় বড় গর্তে পরিণত হয়েছে রাস্তা-ঘাট। সড়কের কিছু অংশ ভেঙে খালে পড়ে গেছে। ফলে যানচলাচলে সমস্যা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পৌরসভার একাধিক কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট ব্যক্তি জানান, তৎকালীন সরকারের সময় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় নোয়াখালী জেলার দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া পৌরসভা গঠন করা হয়েছে। যার কোনো প্রয়োজন ছিল কিনা ইতিমধ্যে অনেকেই এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। অনেক তথ্য গোপন রেখে তখন রাতারাতি এখানে পৌরসভা গঠন করা হয়। দেখা গেছে প্রধান প্রধান শর্তগুলো মিথ্যা তথ্য দিয়ে পুরন করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পৌর বাসিন্দাদের অকৃষি দেখানো হয়েছে। অথচ পৌর এলাকার ৮৫ শতাংশ মানুষই কৃষিজীবি, অস্বচ্ছল, হতদরিদ্র। ফলে দেখা গেছে শতকরা ১০ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করা সম্ভব হয় না। বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি টাকা হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া রয়েছে। শুধুমাত্র সরকারি ২২টি প্রতিষ্ঠান মোটামুটি হোল্ডিং ট্যাক্স ঠিকমত প্রদান করছে। মিথ্যা তথ্য দেয়ার কারণে বর্তমানে গরীব শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পাচ্ছে না, কৃষকরা স্বল্প খরচে কৃষি যন্ত্রপাতি পাচ্ছে না। ঋণ ও বিনামূল্যে বীজ, সার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সূত্র আরো জানায়, গঠনের শুরু থেকেই এ পৌরসভা উন্নয়ন বরাদ্দে অবহেলার শিকার হয়েছে। প্রায় ৬ বছর পর্যন্ত পৌরসভার কার্যক্রম চলেছে ইউএনও ও স্থানীয় প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে। ফলে দীর্ঘ অর্ধযুগ সরকারি তেমন সুযোগ সুবিধা আসেনি। ২০১১ সালের ১৮ জানুয়ারি প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমান মেয়রই এ পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত মেয়র। তিনি দ্বীতিয়বারের মতো দায়িত্ব পালন করছেন।  ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও নানা কারণে উন্নয়ন হচ্ছে না। তবে ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রকল্প বিভিন্ন দপ্তরে প্রদান করা হয়েছে। পৌরসভার উন্নয়নে স্থানীয় সাংসদ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আরো উদারতা থাকা দরকার বলে মনে করছেন পৌরসভার কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে হাতিয়া পৌরসভা মেয়র এ.কে.এম ইউছুফ আলী নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারার কথা অকপটে স্বীকার করলেন। তিনি বলেন, পৌর এলাকার উন্নয়নের প্রধান ও প্রথম অন্তরায় এর আয়তন। তার উপর সরকারি বরাদ্দ কম হওয়ায় ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব হয় না। অন্যদিকে বাসিন্দারাও নিয়মিত ট্যাক্স প্রদান করছে না। তারপরও ইতোমধ্যে ওয়াটার এন্ড ড্রেনেজ-সেনিটেশনের একটি বড় প্রকল্পের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বহুমুখী উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলে অবকাঠামো উন্নয়নসহ পৌর বাসিন্দাদের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব। তানা হলে হাতিয়া পৌরসভা গঠন করার যৌক্তিকতাও কতটুকু সঠিক ছিল এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যাবে!

ফোবানি/দ্বীপ আজাদ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন