হলুদ সাংবাদিকতা, জন্ম ইতিহাস এবং প্রভাব থেকেই যাহা ৫৭ তাহাই ২৯-৩২ ধারা!

260
yellow journalism

ভালোবাসার রং নাকি হলুদ!কিন্তু সাংবাদিকতায় ভালোবাসার এই রংকে বলা হয় হলুদ সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতা একটি পেশার নাম কিন্তু এই সাংবাদিকতা পেশার রং কি সাদা? আমার জানা নেই। কিছু সাংবাদিককে হলুদ সাংবাদিক এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিকতাকে হলুদ সাংবাদিকতা বলা হয়!যতদুর জানি পেশার কোন রং হয়না। কেউ কেউ বলেন ‘না’, পেশারও রং হয় এবং হলুদ সাংবাদিকতা কারো কারো পেশা! কিন্তু কোন সাংবাদিকের জন্য হলুদ সাংবাকিতা মোটেও কোন গর্বের বিষয় নয়,বরং এটি সাংবাকিতার জন্য লজ্জার। হলুদ সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা শব্দ যুগল মিশেই নতুন এই শব্দযুগলের সৃষ্টি। মজার বিষয় হলো অন্য আরো এক বা একাধিক রং থাকতে কেন এই হলুদ রংকেই সাংবাদিকতা পেশার সাথে বেছে নেয়া হলো? আসুন উত্তরটি খোজার চেষ্টা করি।

হলুদ সাংবাদিকতা কি?

উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ভিত্তিহীন রোমাঞ্চকর সংবাদ পরিবেশন বা উপস্থাপনকে হলুদ সাংবাদিকতা বলে। এ ধরনের সাংবাতিকতায় ভালমত গবেষণা বা খোঁজ-খবর না করেই দৃষ্টিগ্রাহী ও নজরকাড়া শিরোনাম দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। হলুদ সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হল সাংবাদিকতার রীতিনীতি না মেনে যেভাবেই হোক পত্রিকার কাটতি বাড়ানো বা টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শকসংখ্যা বাড়ানো। অর্থাৎ হলুদ সাংবাদিকতা মানেই ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশন, দৃষ্টি আকৰ্ষণকারী শিরোনাম ব্যবহার করা, সাধারণ ঘটনাকে একটি সাংঘাতিক ঘটনা বলে প্ৰতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা, কেলেংকারির খবর গুরুত্ব সহকারে প্ৰচার করা, অহেতুক চমক সৃষ্টি ইত্যাদি।

হলুদ সাংবাদিকতার বৈশিষ্টসমূহ

হলুদ সাংবাদিকতার বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করতে গিয়ে ফ্রান্ক লুথার মট পাঁচটি নিদ্দিষ্ট বিষয়ের উল্লেখ করেন:

১। সাধারণ ঘটনাকে কয়েকটি কলাম জুড়ে বড় আকারের ভয়ানক একটি শিরোনাম করা।

২। ছবি আর কাল্পনিক নক্সার অপরিমিত ব্যবহার।

৩। ভুয়া সাক্ষাৎকার, ভুল ধারণার জন্ম দিতে পারে এমন শিরোনাম, ভুয়া বিজ্ঞানমূলক রচনা আর তথাকথিত বিশেষজ্ঞ কর্তৃক ভুল শিক্ষামূলক রচনার ব্যবহার।

৪। সম্পূর্ন রঙিন রবিবাসরীয় সাময়িকী প্রকাশ, যার সাথে সাধারণত কমিক্স সংযুক্ত করা হয়।

৫।স্রোতের বিপরীতে সাঁতরানো পরাজিত নায়কদের প্রতি নাটকীয় সহানুভূতি।

হলুদ সাংবাদিকতার জন্ম ইতিহাস

yellow-journalism
হলুদ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ জোসেফ পুলিৎজার ও উইলিয়াম রুডলফ হাস্ট

হলুদ সাংবাদিকতার জন্ম হয়েছিল সাংবাদিকতা জগতের অন্যতম দুই ব্যক্তিত্ব যুক্তরাষ্ট্রের জোসেফ পুলিৎজার আর উইলিয়াম রুডলফ হার্স্টের মধ্যে পেশাগত প্রতিযোগিতার ফল হিসেবে। এই দুই সম্পাদক তাদের নিজ নিজ পত্রিকার ব্যবসায়িক স্বার্থে একে অপরের অপেক্ষাকৃত যোগ্য সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত কর্মচারীদের অধিক বেতনে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। এক পর্যায়ে ব্যক্তিগত কেলেংকারির চাঞ্চল্যকর খবর ছেপে তারা পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর চেষ্টা করেন। পুলিৎজারের নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড ও হার্স্টের নিউ ইয়র্ক জার্নালের মধ্যে পরস্পর প্রতিযোগিতা এমন এক অরুচিকর পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতার পরিবর্তে পত্রিকার বাহ্যিক চাকচিক্য আর পাঠকদের উত্তেজনা দানই তাদের নিকট মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। (তথ্যসূত্র:উইকিপিডিয়া)

হলুদ সাংবাদিকতার প্রভাব

মুলত:বস্তুনিষ্ট সাংবাদিকতার বিপরীতই হলো হলুদ সাংবাদিকতা।প্রত্যেকটি ক্রিয়ারই পাশ্ব প্রতিক্রিয়া থাকে। তেমনি হলুদ সাংবাদিকতার প্রভাবে মানহানিকর সাংবাদিকতা, সাংবাদিকতায় অপপ্রচার, ভুল তথ্য পরিবেশন,বর্নবাদ ও সাম্প্রদায়িক সাংবাদিকতা, চেক বুক সাংবাদিকতা, এমবেডেড জার্নালিজম(Embedded journalism )এবং হলুদ সাংবাদিকতা ইত্যাদি শব্দযুগলের উৎপত্তি ঘটায়।কোন সাংবাদিকের জন্যই হলুদ সাংবাদিকতার অপবাদ কলন্কের।

মানহানি একটি গর্হিত কাজ । শুধু সাংবাদিক কেন কারো অধিকার নেই কারো মান হানি করা । কোন সম্মানিত মানুষকে যদি অনুমান বশত অপরাধী বলি সেটা অন্যায় । কোন সাংবাদিকের উচিৎ নয় কারো মান হানি করা । হলুদ সাংবাদিকতা শব্দটা সব চাইতে উচ্চারন করে সরকারি দল ।

চেক বুক সাংবাদিকতা শব্দটার সাথে আমরা খুব একটা পরিচিত নই । সোজা কথায় টাকার বিনিময়ে রিপোর্ট করা । এখন অনেক সাংবাদিক টাকা কামাবার হাতিয়ার হিসেবে এই সাংবাদিকতায় নিজেকে বিক্রি করে চলেছেন।

ভুল তথ্য মাঝে মাঝে সংবাদ পত্রে আসে পরে তার জন্য সংশোধনী দেওয়া হয় । এজন্য তথ্য দেয়ার সময় সাবধানী হতে হয় । কিন্তু ইচ্ছাকৃত ভুল তথ্য অবশ্যই নিন্দনীয়। প্রতিনিয়ত একই ভুল অবশ্যই ইচ্ছাকৃত।

বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িক সাংবাদিকতা অর্থাৎ আপনার রিপোর্টে বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রকাশ করা অন্যায়। যদিও এটা অনেকেই সতর্কভাবেই করে থাকেন। খুজে দেখুন অনেককেই পাবেন।

এমবেডেড জার্নালিজম (Embedded journalism )মুলত যুদ্ধ কালিন রিপোর্ট । ইরাক আমেরিকার যুদ্ধ সম্পর্কে বলি আমেরিকান সৈন্য বাহিনীরা বেশ কিছু রিপোর্টার কে তারা সঙ্গে করে নিয়েছে । আমেরিকান সৈন্য বাহিনীরা যত টুকু খবর প্রকাশ করতে বলেছে ঠিক তততুকুই তারা প্রকাশ করেছে এতে সকলেই সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতা

সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতা এক অপরিহার্য বিষয়। এক কথায় সাংবাদিকতার প্রান বলতে পারেন । আসলে বস্তুনিষ্ঠতা কি ? আমরা সাধারন ভাবে বলা যায় সংবাদ পরিবেশনে পক্ষপাতিত্ব না করা । মোটাদাগে প্রকৃত  বিষয়টা বাড়িয়ে বা কমিয়ে না বলা বা লেখা । আসলে সাংবাদিকতা এমন এক পেশা যেখানে নিজের মন্তব্য লেখার কোন সুযোগ নেই । আপনি যা জানবেন উপযুক্ত প্রমান হাতে নিয়ে তা মানুষ কে জানাবেন ।নিজের মতামত দিতে হলে আপনাকে কলাম ও সম্পাদকীয় লিখতে হবে।একজন সৎ,আদর্শবান সাংবাদিকতার লক্ষন হল তিনি পক্ষপাতহীন লিখবেন।এ তো হল নীতি-নৈতিকতার কথা!বাস্তবতা আসলে কি? সবাই কি নীতি অনুযায়ী চলছে? হয়তো চলছে, হয়তো চলছে না।

মুলত: আমরা কিছু কিছু মানুষ আছি যারা ভালোবাসার মানুষকে নিয়ন্ত্রন করতে চাই! এ কারনেই ভালোবাসার রং হলুদ কিংবা সাদা যাহাই হোক ৫৭ ধারা তাহাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ২৯-৩২ ধারা!

এম, হামিদুর রহমান

ফোকাস বাংলা নিউজ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন