হলদে চুরি – পান্থজন জাহাঙ্গীর

25
halde_churi

পান্থজন জাহাঙ্গীর বরাবরই গল্প লিখেন। বিয়ে বাড়িতে বর আসার প্রতীক্ষায় যখন সবাই রব করছে কখন আসবে বর! কখন আসবে বর ঠিক তখনই বর এলো এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে উড়েও গেল হলদে পাখি। কোতুহলী মুখগুলো বরকেই খুজছে চারিদিক। অনেক খোজাখুঁজির পর জানা গেল জিন্কু নামের একজন নেই! পাঠকের কৌতুহলকে লেখক নিয়ে গেছেন গল্পের শেষপ্রান্তে… সম্পাদক।

সে অনেক দিন আগের ঘটনা। জমিদার বাড়ি বলে কথা। জমিদার কন্যার বিয়ে। আশ পাশের দশ গ্রামের লোক দাওয়াত করছে। জমজমাট বিয়ের আসর। সারা দিন বিয়েতে লোক গম গম করছে। অনেক লোক দাওয়াতে হাজির হয়েছে। গোটা এলাকায় যেন ঈদের আমেজ। লোকজন খেয়ে দেয়ে বেজায় খুশি। এরই মধ্যে ফাঁকে ফাঁকে বরযাত্রী আসছে আর খেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সবার মনে একটাই আগ্রহ। তাই কখন বর আসবে? কখন বর আসবে? বলে রব ওঠল। সে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা।

এছাড়াও পড়ুন এই বুঝি প্রেম!

প্রতীক্ষার প্রহর ভেঙ্গে অবশেষে বর আসল। সে কালে আবার গাড়ি-ঘোড়ার প্রচলন ছিল না। তাই বর আসল মানুষের কাঁধে চড়ে। তার মানে থানজানে ছড়ে। থানজান মানে ইয়া বড় একখানা চেয়ার। সেটার সামনে পেছনে দুদিকে কাঁধে নেয়ার জন্য দুটা করে চারটা হাতল। তারপর বরকে সেখানে তুলে চার বেহারা কাঁধে নিয়ে ডিগির ডিগির করে  বরকে নিয়ে আসল। সবাই ঘিরে ধরল বর কে। লম্বা ,ফর্সা,স্ন্দুর শারিরিক গঠন। হলুদ শেরুয়ানী ও কালো পাগড়ি পরা। একেবারে রাজপুত্তুর। সবাই বর কে ঘিরে হৈ-চৈ শুরু করে দিল। সবাই সমাদরে বরকে থানজান থেকে নামাল। কোলে করে  নিয়ে চেয়ারে  বসাল। তারপর খাবার- দাবার আচ্ছমতো খাওয়াল। কিন্তু বরের রাজ্যের সকল সন্দেহ। তার মনটা দুরুদুরু করতে করছে। কারণ সেকালে বিয়েতে মশকরা পর্ব নামেও একটা পর্ব ছিল। কনে পক্ষের লোকজন অনেকে মশকরার জন্য প্রস্তুত। আর বুঝি রক্ষা নেই। এত দামী শেরুয়ানী, পোশাক-আশাক কিভাবে সে রক্ষা করবে দাগ থেকে! বর এবার লজ্জার আগল ভেঙ্গে এদিক-সেদিক তাকাতে লাগল। বর, কনে গ্রহণ করবে। এমন সময় ধুন্ধুমার কান্ড ঘটে গেল। দুপক্ষের লোকজনের মধ্যে তুমুল মশকরা শুরু হয়ে গেল। রং,জরি,পানি,মাটি যে যেটা পেয়েছে  ইত্যাদি নিয়ে পাড়ার দুষ্টু ছেলে-মেয়েরা ছুটাছুটি শুরু করে দিল। ছেলে-মেয়েদের আনন্দ দেখে মুরুব্বিরাও সবাই হাসাহাসি করতে লাগল। কিন্তু হঠাৎ সকল আনন্দ,সব উল্লাস বিষাদে পরিণত হলো।

পান্থজন জাহাঙ্গীর এর গল্প পলাশ ফোঁটার দিনে

দৈত্যকার জঙ্কু নামে এক ছেলে বিয়ের রান্নার জন্য গরম করা এক পাত্র পানি বরের গায়ের ওপর ঢেলে দিল। বরের আর্তচিৎকারে গ্রামের মানুষ জড়ো হয়ে গেল। বরের বিপদে জমিদার কন্যা র্মূছা গেল। দিশেহারা মানুষ একদিকে মূর্ছিত কন্যাকে নিয়ে অন্যদিকে বরকে নিয়ে ছুটাছুটি শুরু করে দিল। কিন্তু সেকালে আগুনে পুড়ে যাওয়ার চিকিৎসা ছিলনা। এদিকে বরের শরীর জ্বলতে জ্বলতে ছোট্ট একটা পিন্ডকার ধারণ করল। মাথার কালো পাগড়িটা একটা কালো ঝুঁটিতে পরিণত হল। আর হলুদ শেরুয়ানীটা দুটা হলুদ ডানাতে পরিণত হল। শেরুয়ানীর হলুদ রং সারা গায়ে ভরে গেল। তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে  বরটা একটা হলদে পাখি হয়ে উড়াল দিল।

ফোকাস বাংলান নিউজ এর চিলেকোঠায় প্রকাশিত গল্প কর্পোরেট ভালোবাসা – সাজ্জাদ রহমান

পাড়ার জঙ্কু ছেলেটাকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। এরপর থেকে সবাই পাখিটার নাম দিল কালো ঝুটি ও হলুদ বুলবুল কিংবা হলদে চুরি।  যদিও পাখিটা কারো হলুদ চুরি করেনি। কিন্তু কন্যা সুস্থ হয়ে আর কাউকে বিয়ে করল না। পাখিটির সন্ধানে দল-বল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু হাজারো পাখির ভিড়ে এই পাখিটিকে চিনবে কওে ভোবেই হোক পাখিটাকে সে খুঁজে বের করবেই। তাই সে একটি বুদ্ধি বের করল। প্রথমে পাড়ার খোকা নামে এক ছেলেকে খুঁজে বের করল। কারণ,খোকা ছিল খুব দুরন্ত। সে একটি আলকাতরার কোটা নিয়ে বরের ঠিক ডানদিকে শিকার ধরে নাকি বসেছিল। আর গোলমালের মধ্যে মেরেছিল একেবারে বরের ডানহাতের বগলের নিচে। সেই সূত্র ধরে দশ দিগন্ত ঘুরে অবশেষে কনে পাখিটিকে খুঁজে পেল বৃন্দাবনে। শুধু একটা বিশেষ দাগ দেখে। আর সেটা হল পাখিটির ডান পাশে ডানার নিচের কালো দাগ। একেবারে খাঁটি আলকাতরার দাগ।

পান্থজন জাহাঙ্গীর


শিক্ষক, ইউসেপ বাংলাদেশ

ইমেইল dhukki@gmail.com