সেইন্ট মার্টিন আইল্যান্ড ভ্রমন। ইউল্যাব(ULAB) অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব।

শি রিয়েলি এমেইজড মি! মাই থ্যাংকস টু দেট মর্ডান মেছুনী ভেরি মাচ! আই এম প্রাউড টু বি এ টাইনি পার্ট ওব ইট। লাভ ইউ এডভেঞ্চার ক্লাব!

119
ulab_adventure_club_saint_martin

সেইন্ট মার্টিন ভ্রমনে যাব সবাই মিলে সিদ্বান্ত হলো এবার। ইউল্যাব এ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের সবাই যথারীতি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিল। ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি টেকনাফ। খুবই বিরক্তিকর লম্বা একটা বাস জার্নি ছিলো। টেকনাফ পৌছেই আবার ফেরীতে করে সেইন্ট মার্টিন আইল্যান্ড, যার আদি ও আসল নাম নারিকেল জিঞ্জিরা। রাত আটটায় ইউল্যাব অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের ৫৪ জন সহ ঢাকা ছেড়ে গন্তব্যে পৌঁছালাম পরদিন দুপুর বেলা। আঠারো ঘণ্টার ভ্রমণ ক্লান্তি নিমিষে উবে গেলো ফেরী থেকে নামার সাথে সাথে বিশুদ্ধ বাতাসের ঝাপটায় আর চোখ জুড়ানো সমুদ্র-নীলে। এতো নীল হয় সমুদ্র! ঠিক নীল নয়, পীতাভ নীল।

এ নীল এমন নীল, যে নীলের কাছে
নীল নয়না অপশ্বরীও হার মেনে আছে
এ নীল এমন অপলক নীল!

সেইন্ট মার্টিন (নারকেল জিন্জিরা) নিয়ে জনৈক রুপক চৌধুরী’র একটি কবিতার উদ্বৃতি দিতে চাই। সেই কবে যেন পড়েছিলাম ঠিক মনে নেই। ইন্টারনেটে পড়া লিন্কটা সংগ্রহে না থাকায় শেয়ার করতে পারছি না বলে দু:খিত।

সোনার বাংলায় নীলের ভূস্বর্গ/নারিকেল জিন্জিরা/এখানে সাগর নীল,আকাশ নীল/নীলে নীলে গায় প্রকৃতির /মোহনীয় গান।/এখানকার আকাশ ঘুমায় সাগরের বুকে/আর সাগর চুমু আঁকে অম্বরের নিশ্বাসে /বিশ্বাস করে হেরিছে যে একবার/এই স্বর্গের হাসি। / শেষ বেলার উষার অস্তগামী রাতুল আভা /
সেই দৃশ্যপটে ছড়ায় মহুয়ার সুবাস /চঞ্চল হয় মাতাল চন্দনা/ সেই সুধা পানে /গাঙচিল হাওয়ায় উড়ায় পাল /
ঢেউয়ের গানে,/ প্রিয়ার হাসির চেয়েও প্রানোজ্জল /তার লহরের সুর,প্রবালের ঘায়ে /ঝরে বিরহের বিষরক্ত /
ছিন্ন হয় মোহের শেকল সুন্দরের /অভিলাষে,হোক সে ক্ষনের বাসনা। /জানি শেষ হওয়ার নয় জীবনের
অবসাদ/যেতে হবে ফিরে /জড়তা স্নাত সমাজের কোলাহলে /রয়ে যাবে স্মৃতির ফ্রেমে /তোর রুপের অগ্নিগিরি /
নারিকেল জিন্জিরা / শুধু আশা তোর স্বর্গরাজ্যে /আরও একবার আশিব ফিরি

ঘুমানোর আগে ইন্সট্রাকশন ছিলো রিপোর্ট করতে হবে ভোর পৌনে ছয়টায়। ডেডলাইন ইজ ডেডলাইন। ডেডলাইন মিস তো ছেঁড়া দ্বীপ ভ্রমণ মিস। শীতের রাত। ছাত্রীরা  ছিলো কটেজে, ছাত্ররা ছিলো তাঁবুতে গাদাগাদি করে। ঠিক ঠিক ছয়টায় রিপোর্ট করলো সবাই। তারা জানে তাদের অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব কতো কড়া। রিমন ভাই সকলের ঘুম ঘুম ভাব ভেঙ্গে দিলেন সমুদ্র পাড়ে নিয়ে “ইয়ো ইয়ো, ও ইয়ো, ও ইয়া” করে – এক মজার হালকা এক্সারসাইজের মাধ্যমে। খুব ভোরের সকল কিছুই নির্মল। সমুদ্র পাড়টি মনে হলো আরো নির্মল। সূর্যোদয় হচ্ছে, হিম হিম বাতাস বইছে। আধো আবছায়ায় সবাই কিছুটা মৃদুমন্দ পায় হেঁটে নিলো সমুদ্র পাড় ধরে। এর পর নাস্তা সেরেই সমুদ্র পাড় ধরে হাঁটা শুরু। সেইন্ট মার্টিন এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ছাড়িয়ে ছেঁড়া দ্বীপের শেষ প্রান্ত তক যেটা হচ্ছে বাংলাদেশের স্থল ভাগ। যেতে সাত কিলোমিটার ফিরতে সাত কিলোমিটার। মোট ১৪ কিলোমিটার। সময় সকাল থেকে সন্ধ্যা। যাওয়া বাম তীর ধরে, ফেরা ডান তীর ধরে। একই পথ ধরে ফেরা হবে না, কারণ বাঘ একই পথ ধরে ঘরে ফেরে না।

হাঁটছি সবাই সিঙ্গেল লাইন ধরে সুশৃঙ্খল ভাবে। দ্রুত হাঁটা নয়, বলা চলে দুলকি চালে। বাম পাশে ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়া নীল সমুদ্র, ডান পাশে নারিকেল গাছ আর কেয়া বনের নিরবিচ্ছিন্ন সবুজ যুগলবন্দী, আর মাঝখানে সোনালী বালুর বেলাভূমি। শীতের মিঠেকড়া রোদে দূর সমুদ্র থেকে ভেসে আসা হাওয়ার মাতলামি। অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের মাঝে বর্ণাতীত অনুভূতি। আহঃ! লাইফ ইজ বি-ই-এ-ইউটিফুল! হাঁটছি, চোখ জুড়িয়ে নিচ্ছি সৌন্দর্যে, কান জুড়িয়ে নিচ্ছি তীরে ভেঙে ভেঙে পড়া ঢেউয়ের কলতানে। আমার ঠোঁট ও জিব বেয়ে যে কখন থেকে সুবহানাল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ বের হয়ে আসছিলো, মনে নেই ক’বার বলেছি। হেভেন? ওয়েল, আ পিস্ অব হেভেন ইজ হিয়ার ইজ হিয়ার ইজ হিয়ার এট দা এন্ড কর্নার অব বাংলাদেশ।

সেইন্ট মার্টিন এর ওপ্রান্তে গিয়ে ভাটার জন্য অপেক্ষা করলাম বেশ কিছু সময় যাতে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে যেতে পারি ছেঁড়া দ্বীপে। শেষ প্রান্তে পৌঁছে বিশ্রাম নিলাম সবাই নারিকেল বীথি ও কেয়া বনের ছায়ায়। রিমন ভাইয়ের নেতৃত্বে কয়েকজন আমরা পানিতে নেমে গেলাম স্নোর্কেলিং করতে। দারুন অভিজ্ঞতা হলো। ছেঁড়া দ্বীপে উড়িয়ে নেয়ার মতো হিম বাতাসে মাঝে পানিতে ভিজে আমরা সবাই কাঁপছিলাম থর থর করে। তারপরেও কেউ উঠছিলো না স্নোর্কেলিং ছেড়ে! বেচারা স্টুডেন্টরা শিক্ষকের কারণে মনের আঁশ মিটিয়ে স্নোর্কেলিং করতে পারছিলো না! স্নোর্কেলিং ডিভাইসের স্বল্পতা ছিলো। তাই মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে উঠে এলাম। তারপর এক একা চলে এলাম ছেঁড়া দ্বীপের শেষ প্রান্তে। উঁচু নিচু হাজারো ধারালো কোরাল পাথর ডিঙিয়ে। বাংলাদেশের শেষ প্রান্তটি প্রাকৃতিক ভাবে তৈরী কোরাল পাথরের প্রাচীর দেখতে পেলাম। ছোট্ট পাহাড়ের মতো প্রাচীরটির উপরে উঠে রোমাঞ্চিত হলাম। এমন বাতাস যেনো উড়িয়ে নিয়ে যাবে। এমন নীল সমুদ্র যেনো ডুব দিয়ে আর উঠতে ইচ্ছা হবে না। এমন সাদা ফেনার ঢেউ যেনো সাদা মুকুটের নীল চলন্ত পাহাড়। আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের চেষ্টা করলাম। এবড়ো-থেবড়ো ধারালো কোরাল পাথরের উপর জোহরের নামাজ পড়ে নিলাম।

ফেরার পথে সন্ধ্যা নেমে গিয়েছিলো। তাই পশ্চিম পাড় থেকে কোনাকুনি পূর্ব পাড় এসে পূর্ণিমার চাঁদকে ৪৫ ডিগ্রি এঙ্গেলে সাথী করে সাগরের তীর ধরে হাঁটতে লাগলাম। আ পারফেক্ট এনভায়রনমেন্ট টু বি আ কমপ্লিট লুনাটিক। আই হেভ বিন ড্রেনশিং মাইসেলফ ইন ডেজলিং মুনলাইট ইন জিরো লাইট পলিউশন এন্ড হেভিং আ লং ওয়াক ও দি উইন্ডি বীচ আন্ডার দা ওয়াইড ইলেকট্রিক ব্লু স্কাই। আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ! আই হেভ বিন সুপ্রিমলি সো লাকি!

সেইন্ট মার্টিন,মিশন রান্নাবান্না অব ইউল্যাব অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব

নারিকেল জিঞ্জিরা হচ্ছে সেইন্ট মার্টিন আইল্যান্ডের আদি ও আসল নাম। ছেঁড়া দ্বীপ হচ্ছে এর একটি ছোট্ট এক্সটেনশন যা খুব গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে এটি হচ্ছে বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের স্থল ভাগ। ইউল্যাব ইউনিভারসিটির অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের ৫৪ জন ছাত্রছাত্রী সহ সেখানে ট্যুর করে এলাম। ট্যুরের চার দিন বিভিন্ন ইভেন্টে ঠাসা ছিলো। ফেরার আগের দিনের একটা ইভেন্টে স্টুডেন্টদের তিনটি গ্রুপে ভাগ করে প্রতি গ্রুপকে ৫০০ টাকা করে দেয়া হলো ১৫ জনের জন্য দুপুরের খাবার আয়োজনের জন্য। ৫০০ টাকাতো নিলো, কিন্তু বাজার করে আনলো ৭০০ টাকার। কি ভাবে? গাও গেরামের মাছ দোকানী, মুদি দোকানী সব ভড়কে গেলো শহুরে ইয়াং ছেলে ও মেয়েদের ক্রেতা হিসেবে পেয়ে। ছেলেদের আঠার মতো লেগে থাকা অস্থির দরাদরি সেই সাথে মেয়েদের মিঠা মিঠা হাসি। দোকানীতো আল্লাদে গদগদ! তাই আড়াই কেজি চাল দিয়ে দিলো ফ্রি, ডাল দিলো ফ্রি, আধা ডজন ডিমও দিলো ফ্রি খুশি খুশিতে। এই হলো ৫০০ টাকার বাজারে ৭০০ টাকার সদাই নিয়ে ঘরে ফেরার সিক্রেট!
সদাই আনতে আনতেই কেউ লাকড়ি খুঁজতে বের হলো, কেউ চুলায় আগুন দিতে বসলো, আর বাকী সবাই কুটা বাছায় নেমে পড়লো – কেউ বা বসে, কেউ দাঁড়িয়ে। ছেলেরা কি চমৎকার মাছের আঁশ ছাড়াচ্ছিলো, পেয়াঁজ কাটছিলো, হাঁড়ি পাতিল ধুচ্ছিলো। মেয়েরা অনেক অনেক মেকাপ মুখে নিয়ে কি চমৎকার লাকড়ি কাটতে লেগে গেলো, টিউবওয়েল থেকে পানি তুললো, হাঁড়িকুড়ি ধুলো। এর মাঝে এক দারুন সাজুগুজু ছাত্রী জিন্স টিশার্ট পড়ে মাছ কুটতে মাটির উপর এমন ভাবে বসে গেলো যে দেখে মনে হলো জেলে পাড়ার তন্বী কন্যা সে, মাছ কুটাই যার পেশা। শি রিয়েলি এমেইজড মি! মাই থ্যাংকস টু দেট মর্ডান মেছুনী ভেরি মাচ!

ulab_adventure_clubকি দক্ষ এরা সবাই ভেবে দেখুন। ডেডলাইনের আগেই তাদের রান্নাবান্না শেষ। এমন কি পরিবেশনের জন্য কলাপাতায় ঢেকে সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছিলো সময় মতো। আমি যে পেটুক তা মনে হয়ে ইউল্যাব এডভেঞ্চার ক্লাবের এক্সিকিউটিভ মেম্বাররা জানতো। তাই মাস্টার্স ট্রাভেলার্সের অভিজ্ঞ রিমন ভাই ও আমাদের রিসোর্টের ম্যানেজার জাকির ভাইয়ের পাশাপাশি বিচারকের দায়িত্ব ভালোবেসে আমাকেও দিলো। আমি কিন্তু মানে মানে বিচারকের পূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছি। তিনটি গ্রূপের সব কয়টি আইটেম আমি দায়িত্বের সাথে চেখে দেখেছি। একটিও বাদ দেই নি সত্যিসত্যি। একটা গ্রূপ স্মার্টলি এতো বেশী আইটেম করেছিলো যে অনায়াসে ব্যুফে লাঞ্চ চমৎকার ভাবে হয়ে যায়। দে ওয়ার রিয়েলি স্মার্ট এন্ড এফিশিয়েন্ট। আরেকটা গ্রূপ যেনো গ্রামার মেনে স্টার্টার, সাইড ডিশ সহ মেইন কোর্স ও ডেজার্ট পরিবেশন করলো যেনো এক কমপ্লিট আ-লা-কার্টে। আর খাবারের স্বাদ? মনে হচ্ছিলো কোনো একটা ফাইন রেস্টুরেন্টের ভুনা খিচুড়ি লুকিয়ে নিয়ে এসে নিজেদের রান্না বলে চালিয়ে দিচ্ছে। আরেকটি গ্রূপ এমেজিং ডেকোরেশন করে পরিবেশন করেছে। মনে হচ্ছিলো সাদা ভাতের এক দ্বীপের মাঝ খানে লালচে পদ্ম, দু পাশে দুই সবুজ পাম ট্রি। পদ্ম বানিয়েছে ওরা আস্ত এক পেয়াঁজ সুক্ষ ভাবে ছিলকে করে আর পাম ট্রি বানিয়েছে ওরা লম্বা দুটো কাঁচা মরিচ ফালি করে হাতের কারুকাজে ট্রি শেইপ দিয়ে। আমি at the end টিচার তো! তাই মনে মনে ভাবছিলাম, এই ভীষণ ট্যালেন্টেড স্টুডেন্টগুলো যদি একটু পড়াশুনা করতো তবে তাদের দিগ্বিজয় সুনিশ্চিত ছিলো। আমিতো ভীষণ উদ্বেলিত হয়ে তিনটা গ্রূপকেই মানে মানে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ান করে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শেষে অন্য সম্মানিত বিচারকদের মতামত নিয়ে ও ক্লাবের এক্সিকিউটিভ কমিটির মেম্বারদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে ফিডব্যাক নিয়ে একটা গ্রূপকেই চ্যাম্পিয়ান ঘোষণা করেছি, যদিও তিনটা গ্রুপের মধ্যে সার্বিক পার্থক্য ছিলো ঊনিশ আর বিশের।

ক্লাবের এক্সিকিউটিভ মেম্বাররা সবাই ছিলো এবসোলুটলি ওসাম। আই এম প্রাউড টু বি এ টাইনি পার্ট ওব ইট।

লাভ ইউ ইউল্যাব এডভেঞ্চার ক্লাব!

ড. মোহাম্মদ শাখাওয়াত এইচ ভুঁইয়া


সহকারী অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ

ফোবানি/হামিদ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন