সুমন’স ট্যুরিজম সাজেকবাসীর খাদ্য সংকট নিরসনে পাশে দাড়ালো

420
Sumon's-Tourism

‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ এই কথাটি মোটেই মিথ্যা নয়। পরিমাণগত দিক থেকে হয়তো পরিমাপ করা না গেলেও মানুষের অসহায়ত্বে মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা কিন্তু মোটেই কম নয়। প্রতিবার প্রতিটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শেষে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসার। সুমন’স ট্যুরিজম তেমনই দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো সাজেকবাসীর জন্য।

ফোকাস বাংলা নিউজ এর মাধ্যমে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বাঘাইছড়ী উপজেলার সাজেক উপত্যকার চলমান খাদ্য সংকটে  “সাজেক উপত্যকা : খাদ্য সংকটের শিকার প্রায় ৪৫ গ্রামের মানুষ” শিরোনামের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। মারাত্মক খাদ্য সংকটের শিকার প্রায় ৪৫টি গ্রামের মানুষগুলো অর্ধাহারে অনাহারে তাদের দিন কাটাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। তাদের সহায়তায় ইতিমধ্যে বেশকিছু কার্যক্রমও বিভিন্ন ব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে পরিচালিত হয়েছে। চাকমা সার্কেল চীফ রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় ও রানী মা ইয়ান ইয়ান নিজে গিয়ে বাড়ী বাড়ী থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করেছিলেন। সাথে ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের পরীক্ষিত বন্ধু উন্মেষ” এনজিও সংগঠনও। তাদের পাশাপাশি আরো অনেকেই এগিয়ে এসেছেন দূর্গতদের সাহায্যার্থে। বাদ যায়নি সমতলবাসী বাঙালীরাও। পাহাড়ের সাধারণ আদিবাসীদের পরম বন্ধু রেজাউল করিম সুমন ও তার ভ্রমণ আয়োজক প্রতিষ্ঠান সুমন’স ট্যুরিজম নিয়ে খাদ্য সংকটের শিকার সাজেকবাসীর পাশে দাঁড়ালেন পরম মমতায়।

প্রতিবছর পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় গহীন পার্বত্য এলাকায় ট্র্যাকিং করে থাকেন অনেক বাঙালী ট্র্যাকারগণ। রেজাউল করিম সুমন তাদের মধ্যে অন্যতম। রেজাউল করিম সুমন শুধুমাত্র একজন শখের ট্র্যাকারই নন, পার্বত্য এলাকার আদিবাসীদের পরম বন্ধুও। ইতিমধ্যেই তিনি তার প্রমাণ রাখতে সক্ষম হয়েছেন। ট্র্যাকাররা যখন গহীন পাহাড়ের বুকে অজানা গন্তব্যে যাত্রা করেন তখন তারা সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল থাকেন পাহাড়ের পাহাড়ী মানুষদের উপর। তারাই পথ দেখিয়ে ট্র্যাকারদের নিয়ে যান তাদের গন্তব্যে। আবার পাহাড়ীদের বাড়ী-ঘরেই তাদের আহার-বাসস্থানের বন্দোবস্ত হয়ে থাকে। অনেক ট্র্যাকার রয়েছেন যারা ট্র্যাকিং শেষ করে ফিরবার পর বেমালুম ভুলে যান পাহাড়ের সাধারণ মানুষগুলোর সাহায্য সহযোগিতার কথাটুকু। ভুলে যান অনেক সাধারণ পাহাড়ী মানুষ রয়েছেন যারা তাদের কাছ থেকে অনেক সময় থাকা-খাওয়ার খরচটুকুও নিতে চান না। আবার কেউ যদি পাহাড়ে গিয়ে অর্থের অভাবে পড়েন তখনও পাহাড়ীরা তাদের বিনা পয়সায় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। অথচ সমতলে ফিরে সেই মানুষগুলোর মহত্বের কথা ভুলে যেতে একমুহুর্ত দেরী হয়না অনেকেরই।

রেজাউল করিম সুমন তাদের তালিকার বাইরে। তিনি অকৃতজ্ঞ নন বলেই সমতলে ফিরে এলেও তার হৃদয়ে গেঁথে থাকে সেই পাহাড়ের কথা, পাহাড়ের আদিবাসীদের আতিথেয়তার কথা। আর তাই যখন সাজেকবাসী খাদ্যের অভাবে মানবেতর জীবন-যাপন করছিল তখন চুপ করে বসে থাকতে পারেননি তিনি। নিজের প্রতিষ্ঠান “ সুমন’স ট্যুরিজম ” এর ব্যানারে আয়োজন করলেন সহায়তা সংগ্রহের। এগিয়ে এলেন অনেকেই। পাশাপাশি অভিভাবক হিসেবে পাশে পেয়ে গেলেন সেই মানুষটিকে যাকে আমরা (বিশেষ করে যারা আদিবাসীদের নিয়ে লেখালেখি করি, তাদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকবার চেষ্টা করি) আমাদের পথিকৃৎ বলেই ভাবি। তিনি বিশিষ্ট আইনজীবি জনাব ইমতিয়াজ মাহমুদ স্যার। ইমতিয়াজ মাহমুদ স্যারের উৎসাহ আর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় রেজাউল করিম সুমন তার কাজে আরো বেশী প্রেরণা পেয়ে এগিয়ে যেতে থাকলেন।

ত্রাণসামগ্রী বিতরণের সময় এক আবেগঘন মুহুর্তে রেজাউল করিম সুমন ও সাজেক ইউনিয়নের একটি গ্রামের একজন কার্বারী (গ্রামের প্রতিনিধি)

অবশেষে গত ১৫ মে তারিখ এলো সেই শুভক্ষণ। ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে সুমন’স ট্যুরিজম এর গাড়ী পৌঁছে গেল সাজেক। তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে এলেন সাজেক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জনাব নয়ন চাকমা এবং উনার পরিষদের সদস্যবৃন্দসহ আরো অনেকেই। ছিলেন ফেসবুক জগতে আমাদের প্রিয় বন্ধু এনজয় চাকমা ও তার বাবা। ২৩টি পাড়ার প্রায় দুই শতাধিক পরিবারের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন জনাব সুমন ও তার সুমন’স ট্যুরিজমের টীমটি। সাহায্যপ্রার্থী ছিলেন ত্রাণ সামগ্রীর পরিমাণের চাইতেও অনেক অনেক বেশী। তারপরও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কাউকেই শেষ অবধি খালিহাতে ফিরে যেতে হয়নি।

ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতিও পাড়ি দিতে হয়েছিল রেজাউল করিম সুমন আর তার দলকে। তিনি তার নিজের মুখেই বললেন, “প্রতিদিন নিন্দুকদের কাছে শুনতে হয়েছিলো, আমি নাকি নিজের খেয়ে পরের মহিষ তাড়ানোর কাজ করছি। নিজে তো করছিই, সাংগো-পাংগো সাথে নিয়ে করছি। আমি কিছু বলি নি, অনেকে বলেছিলো ত্রান তুলে সেটেলারদের দিয়ে আসা হবে। আমি তখনো কিছু বলি নি। মুখে আনা যায় না এমন খারাপ কথা যেসব শুনতে হয়েছিলো, সেসব আর না বলি। শুধু শুনে গেছি, নিজেদের কাজ করে গেছি, আর বেশি খারাপ লাগলে আকাশটার দিকে চেয়ে থেকেছি। কারন সময়ই সবকিছুর জবাব দিবে, আমি না। কারন জবাব দিতে গেলেই আপনার সময়ের ক্ষতি, কাজের ক্ষতি, মানসিক ভাবে নিজে দুর্বল না হলেও আপনার টিম দুর্বল হতে পারে। আমি শুধু একটা কথাই তাদের বলেছিলাম, আমাকে দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ১০০০ সৎ, পরিশ্রমী তরুন আর ১০ জন ইমতিয়াজ স্যারের মত অভিভাবক দেন। যারা নিজের খেয়ে পরের মহিষ তাড়াবে, বাংলাদেশ বদলে যাবে কিনা জানি না, তবে দেশকে একটা বড়সড় ঝাকি দিতে পারবো। এরকম চ্যালেঞ্জের জন্য আমরা প্রস্তুত। মুখে উন্নয়নের কথা যারা বলেন, তারা উন্নয়নের নাম ভাংগিয়ে শোষন করছেন। আমি বলেছিলাম, বিজয়ের মঞ্চে সবাই এক কাতারে দাঁড়াবো, দাঁড়িয়েছি। মিছিল হবে, স্লোগান হবে, বিবেকহীনদের দরজা জানালার সামনে। নিন্দুকেরা দরজায় খিল দিবে, কানে তালা দিবে, দিয়েছে কিন্তু। মানবতার জয় সুনিশ্চিত। এগিয়ে আসুন বিবেকবানরা, যেখানে অসহায় -ক্ষুধার্ত মানুষ সেখানেই। আমি এবং আমার টিম আমরা সাজেকে ভালবাসার বৃস্টিতে গোসল করেছি। অসহায় দরিদ্রদের ভালবাসার বৃস্টিতে, বড়লোকদের নয়। বড়লোকদের আকাশে এমন বৃস্টি হয় না, হয় শুধু পরের মহিষ যারা তাড়ায়, তাদের আকাশেই।”

আহমেদ মাসুদ বিপ্লব, ঢাকা ব্যুরো চীফ, ফোকাসবাংলানিউজ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন