সাজেক উপত্যকা : খাদ্য সংকটের শিকার প্রায় ৪৫ গ্রামের মানুষ

142

এমনিতে বাংলাদেশের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণ একটু বেশি। আর সেই আকর্ষণ আরো বাড়িয়ে তুলেছে সাজেক উপত্যকা । এখন থেকে কয়েক বছর আগেও অপার সৌন্দর্যের দুর্গম এই এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থাসহ নানা কারণে মানুষ যেতে পারতো না। আর রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সেই সাজেক কিনা এখন সব সুযোগ সুবিধা নিয়ে পর্যটকদের হাতের মুঠোয়। রাতের আঁধারেও এখন রাস্তার পাশে জ্বলে সৌর বিদ্যুতের সড়ক বাতি, দুর্গম এলাকা হলেও এখন আর নেই পানির সমস্যা, পর্যটকসহ স্থানীয়দের খেলাধূলাসহ নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য রয়েছে ক্লাব হাউস, থাকবার জন্য আছে নানা ধরণের সুব্যবস্থা। আয়তনের দিক থেকে দেশের বৃহত্তম ইউনিয়ন সাজেকে’র পুরো এলাকা সু-উচ্চ পাহাড় আর বন-বনানীতে বেষ্টিত। কঠিন জীবন সংগ্রামে জয়ী পাংখো-লুসাই আর ত্রিপুরাদের পরিচর্যায় টিকে আছে এখনো অনেক নান্দনিতকা। এই প্রকৃতি সম্ভবা জনপদকে পর্যটন শিল্পে রূপান্তর করে নবরূপে সাজাতে শুরু হলো সেনাবাহিনীর ভিন্নধর্মী উদ্যোগ। এখন সাজেক দেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিনোদন কেন্দ্র। এই সাজেক উপতক্যার বেশ কয়েকটি জনপদে বিগত কয়েক মাস ধরে চলছে ভয়ানক খাদ্য সংকট। খেয়ে নাখেয়ে, অাধ-পেট খেয়ে কিংবা অধিকাংশ সময় শুধুমাত্র বনের জংলী আলু খেয়ে দিন কাটছে সেখানকার মানুষগুলোর।

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা বাঘাইছড়ী উপজেলার সাজেক উপত্যকা জুড়ে খাদ্য সংকট বা দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়েছে, যাতে অন্তত ৪৫ টি গ্রাম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ৪৫ টি গ্রামে বসবাসকারী ৫০০ পরিবারের প্রায় ২৫০০ মানুষ খাদ্য সংকটের শিকার হয়েছেন। বাঘাইছড়ী উপজেলার কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলি হল: উদলখারী, নিউ জপুই, পুরাতন ঝোপুই, নিউ থংমং, নিউ লোনকার, বেটিং পারা, বেটিং টেঙ পাড়া, কামালাপুর, লংটিয়াং, অরুণ পারা, কচি পর্ব, সিয়ালদাই, গন্ডাচারা, থালচারা, এজাজচারী, মোনা আদম, ধাব আদম, কোলক পাড়া, বদলখারী, নিমুই পাড়া, হগরা হিজিং, দুলুচিরী, ডুলবনিয়া প্রভৃতি এলাকা।

উল্লেখ্য যে, সাজেক উপত্যকা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরে অবস্থিত বৃহত্তম ইউনিয়ন। এটি খাগড়াছড়ি শহরের ৬৭ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং রাঙ্গামাটি শহর থেকে ৯৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। বাংলাদেশ ও ত্রিপুরা সীমান্ত এবং মিজোরাম রাজ্য ভারত সজেক থেকে ৮ কিমি পূর্বে। সজেক উপত্যকা আদিবাসী জুম্ম জনগণ দ্বারা আচ্ছন্ন একটি খুব দুর্গম এলাকা। এই এলাকার জুম্ম অধিবাসীরা মূলত ঐতিহ্যগত ‘জুম’ চাষের উপর নির্ভর করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। সাধারণত, তারা প্রতিবছর ৬ থেকে ৯ মাসে সর্বোত্তম সময়ে খাদ্যশস্য উৎপাদনে সক্ষম। পরবর্তী ৩ থেকে ৬ মাস ধরে পুরো এলাকাটি খাদ্য সংকটের পতনের অধীনে রয়েছে। সাধারণত, খাদ্য সংকট মার্চ-এপ্রিল থেকে জুলাই-আগস্ট পর্যন্ত চলতে থাকে। যখন জুম প্লটগুলিতে ধান চাষের জন্য পরিপক্ব হয়, তখন খাদ্যের অভাবটি ধীরে ধীরে আবার অদৃশ্য হয়ে যায়।

গত মৌসুমে জুম চাষের খাদ্যশস্য এত ভালো ছিল না এবং জুম চাষে কম উৎপাদন আজকের সংকটের মূল কারণ। আবার নানা জায়গায় জুম চাষে নানাভাবে বাধার সন্মুখীনও হতে হয়েছিল অনেককেই। ফলস্বরূপ, গত তিন মাসে জুম্ম-কৃষক পরিবারগুলিতে খাদ্য সংকট চলছে। সাজেক ইউনিয়নের দূরবর্তী ও দুর্গম এলাকার বাসিন্দারা তাদের জীবিকা বজায় রাখে বনজ সম্পদ ও বাঁশ সংগ্রহের পাশাপাশি তৃণভূমি এবং পাহাড়ের ঢালগুলিতে ধান উৎপাদন করে। কিন্তু গত বছরের মতো এ বছরও অন্তত ৪৫ টি গ্রামে আর্থিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে।

সাজেক উপত্যকা বা সাজেকের বেশীরভাগ গ্রাম যোগাযোগের জন্য অনুপযোগী। এই কারণে, সেখানে প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের বিক্রিত মূল্যগুলি স্বাভাবিকের তুলনায় ৩ গুণ বেশি। এই কারণেই অধিকাংশ সাধারণ মানুষ খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতে পারছে না এবং এর ফলে সঙ্কটের তীব্রতা আরও বেড়েছে। বেশিরভাগ পাহাড়ি মানুষই তাদের দিন কাটাচ্ছে অর্ধাহারে অনাহারে। খাদ্য দ্রব্যের তালিকাতে জঙ্গি আলুই প্রধান খাদ্য।

সাজেক উপত্যকা তথা সাজেকবাসীর এই দুর্দিনে পাশে দাড়ানোর লক্ষ্যে ‍নানা সংগঠনের পক্ষ হতে তহবিল সংগ্রহ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহায়তায়ও চলছে ত্রাণ সহায়তায় তহবিল সংগ্রহের কার্যক্রম। সকলে সম্মিলিতভাবে চাইলে অবশ্যই এই বিপদ কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে। উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে থানছি উপজেলার খাদ্য সংকট কালীন সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহায়তায় অনেকেই মানবিক সহযোগীতায় পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা বিশ্বাস রাখি এবারেও যে যার অবস্থান, অবস্থা অনুযায়ী সহযোগীতার হাত বাড়াবেন । খাদ্যসংকট কবলিত মানুষের পাশে থাকবেন।

(সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হতে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে)

আহমেদ মাসুদ বিপ্লব, ঢাকা ব্যূরোচীফ, ফোকাসবাংলানিউজ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন