সাউথ আফ্রিকার প্রথম মসজিদ নির্মাণের ইতিহাস

67
south_africa_first_mosque

প্রায় ৩০০ বছর আগে নির্মিত সাউথ আফ্রিকার প্রথম মসজিদ এখনো সেই অবকাঠামোতেই আছে, যে অবকাঠামোতে নিবেদিতপ্রাণ নির্মাতারা তা নির্মাণ করেছিলেন। মেহরাব এখনো আগের অবস্থায়ই আছে। এ মসজিদের দেয়াল-দরজা থেকেও সেসব মর্দে মুজাহিদের ইমান ও ইখলাসের ঘ্রাণ আসে। ক্যাপটাউন এখন অনেক উন্নত শহর। কিন্তু মসজিদটি আগের সেই সাদামাটা অবস্থায়ই আছে। সাউথ আফ্রিকার প্রথম মসজিদ নির্মাণের পর যিনি ওই মসজিদে প্রথম ইমামতি করেছিলেন, আজও তাঁর বংশ থেকেই ইমাম নিযুক্ত করা হয়। এই মসজিদের সামনে একটি খেজুরগাছ আছে। এটি সে সময়ের ইমাম সাহেব হজে গিয়ে মদিনা থেকে এনেছিলেন। গাছটি এখনো তাঁর স্মৃতি বহন করে।

সাউথ আফ্রিকার প্রথম মসজিদ

ঠিকই ধরেছেন সাউথ আফ্রিকার প্রথম মসজিদ ‘আউয়াল মসজিদ’ এর কথাই বলছি। এটি দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যাপটাউন শহরের বো-ক্যাপে ১৭৯৪ সালে নির্মিত হয়। এটি সাউথ আফ্রিকার প্রথম মসজিদ হিসেবে স্বীকৃত। টুয়ানগুরু নামে পরিচিত কাজী আবদুস সালাম মসজিদটির প্রথম ইমাম নিযুক্ত হন। টুয়ানগুরু একজন ধর্মীয় নেতা, যিনি রাজনৈতিক কারণে কারারুদ্ধ ছিলেন। কারাগারে থাকাকালে তিনি স্মৃতি থেকে পুরো কোরআন লিখেছিলেন। আউয়াল মসজিদে সেই কোরআন আজও আছে।

ক্যাপটাউনে প্রথম মসজিদ নির্মাণের নেপথ্যে এক লোমহর্ষক ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়। কৃষ্ণাঙ্গরাই মূলত দক্ষিণ আফ্রিকার মূল অধিবাসী। সপ্তদশ খ্রিস্টাব্দে ডাচ্রা একদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে, অন্যদিকে সে সময়ই মালয় ও এর পার্শ্ববর্তী দ্বীপগুলোকে ঔপনিবেশবাদের পাঞ্জায় কষে ধরে। মালি ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় মুসলমানরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেখানে মুসলমানরা বারবার স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করতে থাকে, আর ডাচরা তাদের আন্দোলন জুলুম-নির্যাতনের মাধ্যমে দমন করে। সেখানকার অসংখ্য মুজাহিদ মুসলমানকে বন্দি করে তারা দাস বানিয়ে নেয়। একপর্যায়ে সরকার তাদের দেশান্তর করে ক্যাপটাউনে পাঠিয়ে দেয়, যেন স্বদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থান করে তারা চরম অসহায় হয়ে পড়ে। ক্যাপটাউনে মুসলমানদের দিয়ে খুব কষ্টসাধ্য কাজ করিয়ে নেওয়া হতো। ডাচ্ শাসকগোষ্ঠী মুসলমানদের ইমানের নূর থেকে বঞ্চিত করতে সব ধরনের প্রচেষ্টাই তারা চালায়। নামাজ পড়া তো দূরের কথা, কালিমা পড়ারও অনুমতি ছিল না। কেউ নামাজ বা অন্য কোনো ইবাদত করলে তাকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হতো।

কিন্তু এমন নির্যাতনের মাধ্যমেও তাঁদের অন্তর থেকে ইমানের আলো নির্বাপিত করা সম্ভব হয়নি। সারা দিন কষ্টকর পরিশ্রম করার পর রাতে নিজেদের আবস্থানস্থলে তাঁরা ফিরে যেতেন। ক্লান্তিতে নিথর দেহ নিয়ে মুজাহিদরা রাতের অন্ধকারে চুপিসারে অবস্থানস্থল থেকে বের হয়ে পাহাড়ে আরোহণ করে সারা দিনের নামাজ একসঙ্গে পড়ে নিতেন। সারা দিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত-শ্রান্ত মুসলমানদের এভাবে নামাজ আদায় করা এমন সাধনা, যার কল্পনাও আজকের মুসলমানরা করতে পারেন না। আল্লাহপ্রেমীদের এমন কোরবানি ও ত্যাগের বিনিময়েই শত ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও এখনো মুসলমানদের হৃদয়ে ইমানের আলো জ্বলে আছে। সেই বিভীষিকাময় পরিবেশে আল্লাহ-পাগল মুজাহিদদের জিকির ও তাকবিরের সুরভি আজও যেন অনুভূত হয়। প্রায় ৮০ বছর আল্লাহর এই নেক বান্দারা দাসত্বের শিকলে এইভাবে বন্দি থাকেন। দীর্ঘ এ সময়ে তাঁদের মসজিদ বানানো তো দূরের কথা, একাকী নামাজ পড়ারও অনুমতি ছিল না।

অবশেষে ডাচেদর ওপর আসমানি আজাব আসে। ব্রিটিশরা ক্যাপটাউনের ওপর আক্রমণ করে ডাচ্ জাতি থেকে এ অঞ্চল ছিনিয়ে নিতে চায়। তারা বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ‘ক্যাপ অব গুড হোপ’ বা উত্তমাশার কূলে পৌঁছে যায়। এ যেন চোরের ঘরে ডাকাতের আগমন। এ পরিস্থিতিতে ডাচ্ শাসকদের এমন কিছু নিবেদিতপ্রাণ সৈনিকের প্রয়োজন হয়, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্রিটিশদের গতিপথ রোধ করবে। প্রাণদানের জন্য ডাচেদর কাছে ‘ভিনদেশি মুসলমানদের’ চেয়ে অধিক উপযুক্ত আর কেউ ছিল না। সুতরাং ডাচ্ সরকার নির্যাতিত ও শোষিত এসব মুসলমানের কাছে ইংরেজদের মোকাবিলা করার প্রস্তাব দেয়। তারা এ কাজে মুসলমানদের অগ্রবাহিনীর দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব দেয়। বিনিময়ে তারা মুসলমানদের দাবি-দাওয়া পূরণের আশ্বাস দেয়। এই প্রথমবারের মতো ডাচ্ সরকারের কাছ থেকে মুসলমানরা কোনো সুবিধা লাভের সুযোগ পান। কিন্তু এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে মুসলমানরা গাড়ি, বাড়ি বা অর্থকড়ির আবদার করেননি। নিজেদের জন্য অন্য কোনো সুবিধাও তাঁরা চাননি। তাঁরা ব্রিটিশদের মোকাবিলার বিনিময়ে ডাচেদর কাছে একটা মসজিদ নির্মাণের অনুমতি চাইলেন। বললেন, ‘আমাদের জন্য ইংরেজ কিংবা ডাচ্ শাসকদের মধ্যে যদিও কোনো তফাত নেই। তবুও আমরা আপনাদের খাতিরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত আছি। তবে লড়াই শেষ হলে আমাদের ক্যাপটাউনে একটি মসজিদ নির্মাণ করার এবং সেখানে নিয়মিত জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করার অনুমতি দিতে হবে। ডাচ্ সরকার এই শর্ত মেনে নেয়। যুদ্ধে বহুসংখ্যক মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। এভাবে বহুসংখ্যক মুসলমানের জানের বিনিময়ে এখানে একটি মসজিদ বানানোর অনুমতি পায় মুসলমানরা। এটি ছিল সাউথ আফ্রিকার প্রথম মসজিদ, যা ওই সব নিপীড়িত, নিগৃহিত ও নির্যাতিত মুসলমানরা নির্মাণ করেন।

বর্তমানে আফ্রিকার বহু দেশে ইসলামী আইন-কানুন চালু আছে। গোটা দক্ষিণ আফ্রিকায় মুসলমানদের সংখ্যা চার শতাংশ। ষড়যন্ত্রকারী ব্রিটিশরা আদমশুমারিতে মুসলমানদের কৃষ্ণাঙ্গদের দলভুক্ত করে। পরে মুসলমানরা কৃষ্ণাঙ্গদের দলে শামিল হয়ে নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। ম্যান্ডেলা মুসলিম পারসোনাল ল বোর্ডকে সরকারি স্বীকৃতি দেন।

এখানেই শেষ করছি। বিশ্বের সেরা ১০ মসজিদ নিয়ে একটা কোনটি জেনে নিন। চোখ রাখুন। ভালো থাকুন।

ইন্টারনেট অবলম্বনে

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন