চরসল্যা ধর্মপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় : বদলে দেয়ার অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত

72
government-primary-school

দ্বীপ আজাদ, নোয়াখালী : আজ কাল কিন্টারগার্টেন ও তথাকথিত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ভীড়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেন চাপাই পড়ে গেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় মানে নেই আর নেই- অভিভাবকদের যেন মনই উঠে গেছে সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। কিন্তু কিছু কিছু আদর্শিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সব নেতিবাচক চিন্তাকে ম্লানও করে দেয়। তেমনই একটি চরসল্যা ধর্মপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নোয়াখালী সদরের ধর্মপুর ইউনিয়নের অজপাড়া ধর্মপুর গ্রামে এ স্কুলটি বিদ্যমান।

কিন্তু কেন এমন সুনাম? শুনুন আবদুল ওহাব নামে একজন অভিভাবকের কাছ থেকে, ‘আমরা কখনও কল্পনাই করিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান এত উন্নত হতে পারে। তাও আবার অজোপাড়া গ্রামে। শুনেছি শহরের স্কুলগুলোতে হাজার হাজার টাকা খরচ করে বাচ্চাদের পড়ানো হচ্ছে। জানি না ওইসব স্কুলে এতটা আনন্দ পাচ্ছে কিনা খুদে ছাত্র-ছাত্রীরা। বাচ্চাদের এত আদর, মমতা ও ভালোবাসা দিচ্ছে কিনা শিক্ষকরা। যদি কোনো অভিভাবক তার সন্তানের খোঁজ খবর নিতে বিদ্যালয়ে প্রথম আসেন, শিক্ষকরা ওই অভিভাবককে ফুল দিয়ে বরণ করেন। যা অন্য কোথাও কষনও আমি অন্তত: দেখিনি। এক কথায় আমি বলবো বিদ্যালয়টি একটি স্বপ্নপুরি, বদলে দেয়ার দৃষ্টান্ত’।

স্কুলটির এমন সাফল্যের সংবাদে ফোকাস বাংলার নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি হাজির হই। দেখলাম, দোতলার একটি ও একতলার দুটি মিলিয়ে তিনটি ভবনে চরসল্যা ধর্মপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বাহির থেকেই যেন সাজ-গোজ করে রয়েছে। বিদ্যালয়ের কোল ঘেঁষে ফুলের বাগান, কোনো কোনো অংশে টমেটোর গাছ লাগনো। তিনটি ভবনের আলাদা আলাদা নাম দেয়া হয়েছে। এশটির নাম দোয়েল, আরেকটি শাপলা ও অন্যটি কাঁঠাল ভবন। ক্লাস রুমগুলোরও নামকরণ করা হয়েছে বিশিষ্টসব ব্যক্তিদের নামে।

government primary schoolপ্রথমে দোয়েল ভবনে প্রবেশ করলাম। ঢুকতেই দৃষ্টি আটকে যাবে দেয়ালে। দোতলা দোয়েল ভবনের নিচতলায় পঞ্চম শ্রেণির জন্য দুটি কক্ষ এবং একটি শিশু শ্রেণির জন্য। বিদ্যালয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় যে দিক বেশি চোখে পড়ার মতো তা হচ্ছে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীকক্ষ। যেটির নাম শেখ রাসেল কক্ষ। শ্রেণীকক্ষের সামনে ঝুলছে লাল-সাদা পর্দা, মাঝখানে বিশাল ফুলের ঝাঁড়। বাহির থেকে কক্ষের দিকে তাকালে যে কারো মধ্যে একবার দেখে আসার ইচ্ছে জাগবেই। শ্রেণী কক্ষের ভেতরে মেঝেতে রয়েছে লাল রঙের কার্পেট আর চার দেয়ালে সাজানো পতাকা-বর্ণমালা, ফল-পাখি-প্রকৃতি-সংখ্যা-ফুলের ছবি। সেই সাথে দেয়ালের সাথে দুই স্তরে তাক বানিয়ে সাজানো রয়েছে নানা রকমের পুতুল, বর্ণমালা, অংক শেখার উপকরণ, হরেক রকম শিশু খেলনা। পঞ্চম শ্রেণির জন্য বরাদ্দ দুটি কক্ষের মধ্যে একটির নাম সার্জেন্ট জহরুল হক কক্ষ ও অন্যটি জহির রায়হান কক্ষ। সেগুলোর দেয়ালেও আঁকা রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পী, লেখক, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছবি। এয়াড়া আঁকা আছে প্রাকৃতিক নানা দৃশ্য। টানানো রয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। শ্রেণি কক্ষগুলো ঠাঁসা শিক্ষার্থীতে। একই অবস্থা চতুর্থ শ্রেণির ভাষা শহীদ আবদুস সালাম ও তৃতীয়-দ্বিতীয় শ্রেণির মুনির চৌধুরী কক্ষে। দোয়েল ভবনের দোতলায় উঠতেই সিঁড়ি রুমের এক পাশে সততা স্টোর। দেয়ালটির নামকরণ করা হয়েছে  মহানুভবতার  দেয়াল। সিঁড়ির পাশ ঘেঁষে দেয়ালে আঁকা ভাষা শহীদ, মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠ ও বুদ্ধিজীবীদের ছবি ও তাঁদের সংক্ষিপ্ত জীবনী। একই সঙ্গে বিভিন্ন চিত্র শিল্পীর আঁকা শ্রেষ্ঠ চিত্রাংকণও স্থান পেয়েছে দেয়ালে। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে প্রধান শিক্ষকসহ সহকারি শিক্ষকদের সাজানো সুন্দর পরিপাটি কক্ষ। বারান্দার এক পাশে রয়েছে প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জামাদির সাজানো পর্দার কক্ষ, অপর পাশে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সাজানো বিজ্ঞানাগার। দেখছিলাম আর বিস্মিত হচ্ছিলাম। এই অজপাড়া গায়ে বসে এত সুন্দর ও নান্দনিক চিন্তার কথা কিভাবে এঁদের মাথায় এলো!

government primary schoolফোকাস বাংলার টীম আসবে হয়তো জানাই ছিলো। স্থানীয় উৎসুক জনতার কয়েকজন সাথেই ছিলো। কথা হয় তাদের সাথে। স্থানীয়দের মতে, এ অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ ধর্মভিরু ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল। এখানকার প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে কখনও জাতীয় সংগীত বাজানো হতো না, কখনও পালন হতো না জাতীয় কোনো দিবস, বিদ্যালয়টি ছিল অনেকটা প্রাথমিক বিদ্যালয়কে যেভাবে মানুষ চিন্তা করে ঠিক সে রকম, অগোচালো, যে যার মতো করে চলছে, শূন্য থাকতো বেশিরভাগ ক্লাসরুম, বইয়ের বাহিরে তেমন কোনো কিছু জানার ছিল না শিক্ষার্থীদের। কিন্তু গত তিন বছরে পরিবর্তন এলো এলাকার মানুষের চিন্তায়-চেতনায়। শিশুরাও বেড়ে উঠছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, মানুষের মতো মানুষ হওয়ার চিন্তায় মননে স্বপ্নের বাসা বুনছে নতুন প্রজন্ম। বাড়ছে শিশু শিক্ষার হার। পুরো বিদ্যালয়টি সাজানো ঘোছানো। ক্লাসরুম ভর্তি শিক্ষার্থীতে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ইতোমধ্যে অগ্রগামী বিদ্যালয় হিসেবে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের অর্ধশত প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন এবং তারা সকল বিবেচনায় এই বিদ্যালয়টিকে একটি অনুসরনীয় বিদ্যালয় বলে আখ্যায়িত করেছেন। এছাড়া বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক, সহকারি পরিচালক, বিভাগীয় উপ-পরিচালক, মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষাকর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগন। বিদ্যালয়টি ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম বিভাগের সেরা প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে শ্রেষ্টত্বও অর্জন করেছে। এখন জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্টত্বের অপেক্ষায়।

ক্লাসের পাঠদানের ক্ষেত্রেও রয়েছে দারুন বৈচিত্র। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের সারিবদ্ধভাবে বেঞ্চে বসানোর পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের কয়েকটি ছোট দলে ভাগ করে প্রতিটি দলকে আলাদা আলাদা টেবিলে বসানো হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে পারে, সেই সাথে দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়া যায়। পাঠদানকে আকর্ষণীয় ও স্থায়ী করার জন্য ব্যবহার করা হয় নানা ধরণের শিক্ষা উপকরণ পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিলেও নানান ধরণের শিক্ষা উপকরণ তৈরি করে। বিদ্যালয়ের দৃষ্টি নন্দিত আরেকটি বিষয় হচ্ছে প্রধান শিক্ষকসহ সাত নারী শিক্ষক ও তিন পুরুষ শিক্ষক প্রত্যেকের এবং শিক্ষার্থীদের রয়েছে নির্দিষ্ট ড্রেস।

বিদ্যালয়ে তৈরি করা হয়েছে ছাত্র ব্রিগেড। এর ফলে বিদ্যালয়ের অনিয়মিত ছাত্রছাত্রীদের সস্পর্কে খোঁজ নেওয়া, ক্লাস ফাঁকি ও ঝরে পড়া রোধ করা যাচ্ছে। এছাড়াও প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে নিয়মিতভাবে মা সমাবেশ, উঠান বৈঠক, হোম ভিজিট করার ফলে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার মান যেমন উন্নয়ন হয়েছে পাশাপাশি বিদ্যালয়ে অনুপস্থি’তি ও ঝরেপড়া রোধ হয়েছে। সেই সাথে অভিভাবকরা মিড-ডে স্কুল মিল কার্যক্রমকে সক্রিয় রাখার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে অংশীদারিত্ব তৈরি করেছে।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী রাসেদুল ইসলাম সাব্বির জানায়, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রায়ই তাদের বাড়িতে গিয়ে পড়ালেখার খোঁজ-খবর নেয় এবং মা-বাবার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করেন।

স্থানীয়রা বলছেন, বিদ্যালয়টি অনেকটা আদর্শ মানুষ গড়ার কারখানা। বর্তমান প্রধান শিক্ষক রাবেয়া খাতুন ২০১৫ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এখানে এখন সবই হয়। প্রথম প্রথম অনেক বেকায়দায় পড়তে হয়েছে তাঁকে। অনেকের রক্তচক্ষুর দৃষ্টিতে পড়তে হয়েছে। তিনি প্রতিবাদ করেছেন, সবাইকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন এবং সব কিছু আজ নিজের মতো করে গড়ে তুলেছেন। অথচ এক সময় একটি ব্যানারে ‘ছেলে-মেয়ে সমান’ লিখে বিদ্যালয়ে টানানো হলে তা রাতের আঁধারে ছিড়ে ফেলা হয়েছিল। তবুও থেমে নেই থাকেনি বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া খাতুন।

প্রধান শিক্ষক রাবেয়া খাতুন বলেন, আমি চেষ্টা করেছি মাত্র। যদি কোনো উন্নতি হয়ে থাকে তাহলে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিসহ স্থানীয়দের সহযোগিতায়। তিনি জানান, এখনও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শুরুর দিকে বিদ্যালয়ের জন্য প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ ভূমি থাকলেও ১৯ শতাংশ ভূমি এখনও বেদখলে রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা পাঁচশ। বিদ্যালয়ের কোন সীমানা দেয়াল নেই, যা খুবই জরুরি। একটি শহীদ মিনার দরকার। বিদ্যালয়ে কোনো মাল্টিমিডিয়া টুলস নেই। তারপরও পাশের উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাল্টিমিডিয়া এনে মাঝে মাঝে ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন বিষয়ে আলোকচিত্র, ইন্টার-অ্যাকটিভ ভিডিও ও পাওয়ার পয়েন্টে উপস্থাপন করা হয়। এটি শিক্ষার্থীরা যেমন উপভোগ করে পাশাপাশি তেমনি তাদেরকে ডিজিটাল শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলছে। সীমাবদ্ধতা কাটানো গেলে বিদ্যালয়টি পরিপূর্ণ হতো।

দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জেলা প্রাথমিক কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, তিনি যোগদান করেছেন মাত্র কিছুদিন হলো। যোগদানের পর থেকেই এ বিদ্যালয়ের বদলে দেয়ার দৃষ্টান্তের কথা ও সুনামের কথা শুনে আসছেন। খুব সহসায় বিদ্যালয় পরিদর্শন করবেন তিনি। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের যেসব সমস্যা রয়েছে এগুলো সমাধানে পদক্ষেপ গ্রহণ করারও আশ্বাস দেন তিনি।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন