শ্রেণি ব্যবস্থাপনা : নীতিমালা, প্রায়োগিক কৌশল ও শ্রেণি কক্ষ নিয়ন্ত্রন

35
classroom_management

শিক্ষকের পাঠদানে শ্রেণি ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ন একটি অনুষঙ্গ।জানা প্রয়োজন শ্রেণি ব্যবস্থাপনার নীতিমালা, প্রায়োগিক কৌশল ও শ্রেণি কক্ষ নিয়ন্ত্রন (Principles and Techniques of Classroom Management & Discipline). একই সাথে পড়তে পারেন শিক্ষা কি? উৎকর্ষতার জন্য শিক্ষা একটি গাছ যা সারা জীবন অক্সিজেন দেয়!

অনেকদিন ধরে ক্লাস নিচ্ছেন কিন্তু কিছুতেই ক্লাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। কিংবা আপনি একজন নতুন শিক্ষক কিন্তু প্রশিক্ষণ নেই, কিভাবে ক্লাসে দাঁড়াবেন? ভয় নেই, জেনে নিন নিচের টিপস্ গুলো।

শিক্ষাদান কার্যক্রমকে সুষ্ঠভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে উপযুক্ত শ্রণিকক্ষ ও অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। শিক্ষাকে প্রয়োগমুখী ও বাস্তবমুখী করে গড়ে তোলার জন্য শ্রেণি ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে।তাহলে আসুন জেনে নিই শ্রেণি ব্যবস্থাপনা কী?

শ্রেণি ব্যবস্থাপনা কি?

সাধারণ অর্থে শ্রেণি ব্যবস্থাপনা বলতে শিক্ষাক্রমের আলোকে শ্রেণি কক্ষে শিক্ষার্থীদের শিখন প্রক্রিয়াকে সফলভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য শ্রেণিকক্ষে যে সকল কার্যক্রম গ্রহণকরা হয় তাকে শ্রেণি ব্যবস্থাপনা বলে।

একটি সফল শ্রেনিকক্ষ তৈরির অন্যতম উপাদান হচ্ছে শিক্ষর্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সর্ম্পক এবং সে আলোকে শিক্ষাক্রম এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করা যাতে শিক্ষক শিক্ষার্থী যুগ্নভাবে সফল কার্যক্রম অংশগ্রহণ করে শিখনফল অর্জন করতে পারে।

মনে রাখবেন,কার্যকর শ্রেণি ব্যবস্থাপনা উপযুক্ত পঠন পাঠনের সহায়ক। এ ব্যাপারে শ্রেণি সজ্জিতকরণ ও শ্রেণি শৃংখলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে শিক্ষককে খুবই সচেতন থাকা প্রয়োজন। শ্রেণি ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করার জন্য বিভিন্ন রকমের কৌশল আছে।

শ্রেণি ব্যবস্থাপনা কৌশল গুলোকে চার ভাগে ভাগ করা যায়:

১. শ্রেণি কক্ষ সাজানোর কৌশল

২. প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার কৌশল

৩. সহায়ক শিখন সামগ্রী ব্যবহারের কৌশল

৪. শিখন-শেখানোর ব্যবস্থাপনার কৌশল

শ্রেণি কক্ষ সাজানোর কৌশল:

শ্রেণি কক্ষ সাজানো শ্রেণি শিক্ষকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মধ্যেই শ্রেণি নিয়ন্ত্রনের অর্ধেক সফলতা নির্ভর করে। যেমন-শ্রণি কক্ষ সাজানোর ক্ষেত্রে যে সব বিষয় মাথায় রাখতে হবে তা হলো:

   পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করা।

   শ্রেণি কক্ষের আয়তন।

   শিক্ষার্থীদের বসার উপযোগী আসবাবপত্র

   চক বোর্ডের সঠিক স্থাপন

   উপকরন গুছিয়ে রাখা

   নিরিবিলি পরিবেশ

   স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ

প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার কৌশল :

   শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি রেকর্ড করা

   শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কক্ষে প্রবেশের নির্দেশনা দেওয়া

   ক্লাস শুরুর পূর্বে,চলাকালীন এবং পাঠের শেষে শিক্ষার্থীদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা ।

   অনাকাঙ্খিত আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা ।

   শিক্ষার্থীদের আসন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ।

   নিয়মিত উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা

   একক,জোড়া ও দলীয় কাজে শিক্ষার্থীদের নির্দেশনা দেওয়া ।

সহায়ক শিখন সামগ্রী ব্যবহারের কৌশল:

   পাঠ সংশ্লিষ্ট শিখন সামগ্রী প্রস্তুত করা ।

   শিখন সামগ্রী সংরক্ষণ করা ।

   শিখন সংক্রান্ত সকল সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করা।

শিখন-শেখানোর ব্যবস্থাপনার কৌশল :

   শ্রেণি কক্ষে শিক্ষকের অবস্থান ও চলাফেরা বজায় রাখা।

   শ্রেণিকক্ষে আনন্দদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা।

   পাঠ সংশ্লিষ্ট উপযুক্ত পদ্ধতি ও কৌশল প্রয়োগ করা।

   শিখনে আগ্রহ সৃষ্টি ও কর্মতৎপর করা ।

   পাঠ সংশ্লিষ্ট উপকরণ ব্যবহার করা।

   প্রশ্ন করণে সঠিক কৌশল অনুসরণ করা

   শিক্ষার্থীদের প্রতি মনোযোগ দেওয়া।

শ্রেণিতে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করার পূর্বে শ্রেণি ব্যবস্থাপনা যথাযথ আছে কিনা এই দিকটার প্রতি শিক্ষককে যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। কারণ পরিকল্পনা মাফিক শিক্ষাদান কার্যক্রমকে সুষ্ঠভাবে পরিচালনার জন্য উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ ও অনুক‚ল পরিবেশ প্রয়োজন।

পড়ুন শিক্ষাপদ্বতি নিয়ে টুংটাং ছেলেখেলা বন্ধ করা উচিত! 

পাঠদান অনুশীলন কার্যক্রমের শুরুতেই শ্রেণি কক্ষে একজন শিক্ষক যে কাজ গুলো করবেন  সে গুলো হলো :

   শিক্ষার্থীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করা ।

   সকল শিক্ষার্থীদের প্রতি নিরবে চোখ বোলানো।

   যতদ্রুত সম্ভব শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করা ।

   শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা।

   শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করা ।

   প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের গ্রæপে ভাগ করা ।

   পার্শ্ববর্তী শিক্ষার্থীদের পাস্পরিক কথা বলা নিয়ন্ত্রণ করা ।

   পাঠের বিষয়ে প্রতি শিক্ষার্থী উৎসাহ প্রদান করা এবং শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করা।

   শ্রেণি কক্ষের ডানে,বামে,সামনে ও পিছনের শিক্ষার্থীর প্রতি সমান নজর দেওয়া ।

   বিশেষ কোন শিক্ষার্থী বা দল যাতে প্রভাব বিস্তার না করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

   দলগত কাজে শিক্ষার্থীর অধিক অংশগ্রহণ ও কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি করা ।

   সকল শিক্ষার্থীকে হাত উঠিয়ে শিক্ষকের মনোযোগ আর্কষণ করতে উৎসাহিত করা।

   সকল শিক্ষার্থীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার জন্য সহযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করা

মনে রাখুন , শ্রেণি কক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর শ্রেণিতে পাঠদানের কার্যকারিতা নির্ভর করে। এজন্য শিক্ষককে কৌশলী ও বিশেষ যত্নবান হওয়া প্রয়োজন,অন্যথায় সমস্ত শ্রম পন্ডশ্রমে পরিণত হতে পারে।এবার আসুন শ্রেণি-শৃঙ্খলা (Classroom Discipline) এ। কারণ, এটি শ্রেণি ব্যবস্থাপনার একটি অপরিহার্য অঙ্গ।

পড়ুন ডিজিটাল কন্টেন্ট নির্মান করে জিতলেন আন্তর্জাতিক পুরস্কার

শ্রেণি-শৃঙ্খলা (Classroom Discipline)

   শিক্ষার্থীদের বয়স,উচ্চতা,দৃষ্টি ক্ষীণতা ইত্যাদি বিবেচনা করে শ্রেণি শিক্ষক তাদের বসবার স্থান নির্দিষ্ট করে দেবেন।

   শ্রেণি নেতাকে শ্রেণি-শৃঙ্খলা বজায় রাখবার জন্য শিক্ষক সর্বদাই উপদেশ-নির্দেশ দেবেন,সাহায্য করবেন।

   শ্রেণি কক্ষে শিক্ষকের অবস্থান এমন হওয়া চাই,যাতে তিনি সহজেই সকল শিক্ষার্থীর ওপর সমান নজর রাখতে পারেন। কোন কারণেই তিনি ব্লাকবোর্ড,মানচিত্র বা শিক্ষার উপকরণকে আড়াল করে দাঁড়াবেন না।

   শিক্ষাদান কালে শিক্ষক সময়ের সঠিক ব্যবহার করবেন। আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষাদান করতে এবং শিক্ষার্থীকে সক্রিয় রাখতে তিনি সচেষ্ট হবেন।

   সাবলীল কথনভঙ্গী,সজীব পাঠ উপস্থাপনা শ্রেণি শৃঙ্খলার উপযোগী উপাদান। আঞ্চলিক ভাষা শিক্ষকের পাঠদানের বিরোধী।

   শ্রেণি শৃঙ্খলা রক্ষায় শিক্ষকের দৃষ্টি শাসন অন্যতম উত্তম পন্থা। মধুর ব্যক্তিত্ব্য শিক্ষকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। দৃষ্টিশাসন তাঁর মধুর ব্যক্তিত্বেরই অন্যতম অভিব্যক্তি।

   অমনোযোগী শিক্ষার্থীকে আকস্মিক প্রশ্নজিজ্ঞাসা করে মনোযোগী করা যায়, আচার-আচরণকে সংযত করা যায়।

   শিক্ষার্থীকে ভৎসনা করার আগে শিক্ষার্থীর দোষ বা অপরাধকে মুক্তমন নিয়ে বিচার করতে শিখুন

পড়ুন বিজ্ঞান শিক্ষার চালচিত্র ! দিনে দিনে আমরা কোথায় চলছি!!

 

পান্থজন জাহাঙ্গীর


শিক্ষক, লেখক ও গল্পকার

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন