শাওন ও হুমায়ুন প্রেম কাহিনী ‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপে যদি একা চলে যাই, সব ছেড়ে? তুমি থাকবে?’

70
sawon_humayun_love_story

দশম শ্রেণির পাট চুকেনি তখনো। দুইকাধে দুই বিনুনি, স্কার্ট আর ফ্রগ পড়ে ছুটোছুটি করা স্বভাবের দুরন্ত এক কিশোরী শাওন। আর দশটা কিশোরীর চেয়ে হয়তো একটু বেশিই কৌতুহল ছিলো সবকিছুতে। তখনো প্রেম-ভালোবাসার মতো জটিল বিষয়ে ভাবনার পরিধিও তৈরি হয়নি তার।

সবকিছুতেই ছেলেমি করা প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ানো ছটফটে সেই কিশোরী হুট করেই যেনো বড় হয়ে যায় একদিনেই। একটি মাত্র কথায় বদলে যায় তার পুরো পৃথিবী! বিচ্ছিন্ন সব ভাবনাগুলো কেন্দ্রীভুত হয় ভালোলাগার আর ভালোবাসার একটি মাত্র বিন্দুতে। সেদিনের সেই ভালোলাগা বয়ে যাওয়া কিশোরী ক্রমেই হয়ে ওঠে আজকের পরিণত মেহের আফরোজ শাওন।

সম্প্রতি একটি ভারতীয় শীর্ষ দৈনিকের সাংবাদিকের সাথে আলাপকালে অনবদ্য এক স্মৃতিচারণে শাওন জানিয়েছে কিশোরী বেলায় তার প্রথম প্রেমে পড়ার প্রায় অজানা গল্পটিই।

জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা লেখক, তখন পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই হুমায়ুন আহমেদের। সেদিনের দেখায় সেই ‘হৃদয় ছুয়ে যাওয়া প্রশ্নটি এবং প্রশ্নকর্তাকে আজও যেন চোখের সামনে ভাসতে দেখেন শাওন। স্মৃতিকাতর শাওন জানিয়েছেন দারুন রকম ধুকপুক বেড়ে গিয়েছিলো বুকে সেদিন।

একদিন আকস্মিক হুমায়ন আহমেদ বলেছিলেন, ‘গুহাচিত্র যাঁরা আঁকতেন, তাঁদেরও কাউকে লাগত ওই অন্ধকারে প্রদীপটা ধরে রাখার জন্য। যাতে সেই চিত্রকর নিজের কাজটা করতে পারেন। তুমি কি আমার জন্য সেই আলোটা ধরবে?’’

এমন শক্ত কথার মর্মোদ্ধার করার মতো বয়স তো তখন ছিলো না শাওনের । তখনি কোন উত্তর দিতে পারেনি শাওন ।

মেহের আফরোজ শাওন। একাধারে নৃত্যশিল্পী, কণ্ঠশিল্পী, অভিনেত্রী, চলচ্চিত্র নির্মাতা। কিছু মানুষের কাছে একটা বিতর্কিত নাম। কিছু মানুষের কাছে একটা সাহসী চরিত্র। কিন্তু তাঁকে আমরা অধিকতর চিনি প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী হিসেবে। লেখক নিজেই সব ছেড়েছুড়ে যাঁকে নিয়ে নতুন ঘর বেঁধেছিলেন।

ভালোলাগায় বুদ হয়ে শূন্যের দিকে তাকিয়ে শাওন বলতে থাকে,‘ঐ প্রথম কারো জন্য অদ্ভুত এক শিহরণ ছুঁয়ে দেয়! প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতে না পারলেও এত বড় একজন মানুষ ও প্রিয় লেখকের মুখ থেকে তার উদ্দ্যেশ্যে বলা এমন প্রশ্ন, অভাবনীয় এক ভালোলাগায় আচ্ছন্ন করে রাখে শাওনকে। তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল কিশোরী মেহের আফরোজ শাওনের পৃথিবী। চুপ করে থেকেছিলেন কয়েকটা দিন।

চকিত চোখে শাওন বলতে থাকে,‘‘কী বলব বলুন! এই আচ্ছন্নতা না কাটতেই চার-পাঁচ দিন পর উনি আবার বললেন,‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপে যদি একা চলে যাই, সব ছেড়ে? তুমি থাকবে?’

গতকদিন ধরে অবিরত ধুকপুক করা বুকে ফের প্রচণ্ড আলোড়ন শুরু হয় আমার। মন্ত্রমুগ্ধ যেন আমি! তবে এবার আর উত্তর দিতে দেরি করিনি। ছোট্ট কথায় উনার চোখে তাকিয়ে বলেছিলাম, থাকব। সবসময় থাকব।’’

সেই মুগ্ধতা বয়েই সব প্রতিকুলতা দূরে সরিয়ে ‘কথা রেখেছিলেন শাওন। মানুষটির হাত ছাড়েননি তাঁর মৃত্যু অবধি।

ঝড় উঠেছিল হুমায়ুন আহমেদের দ্বিতীয় এবং অসমবয়সী বিবাহ নিয়ে। ছড়িয়েছিল অনেক রটনা, যা এখনও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে শাওনকে। সম্প্রতি যার প্রতিবাদ করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন শাওন নিজেই। ইরফান খান এবং বাংলাদেশি অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা অভিনীত চলচ্চিত্র ‘ডুব’ ছবিটিকে ছাড়পত্র না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সেন্সর বোর্ডে একটি চিঠি জমা দিয়েছেন তিনি। ‘ডুব’ নিয়ে শাওনের অভিযোগ, হ‌ুমায়ুন আহমেদের জীবনের কিছু স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে সিনেমাটির চিত্রনাট্য সাজানো হয়েছে, যার মাধ্যমে হ‌ুমায়ুন আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মানহানি ঘটতে পারে।

dub_film
ডুব ছবির অন্তরঙ্গ মুহুর্তে ইরফান খান ও নুসরাত ইমরোজ তিশা

যে চিঠিটি তিনি লিখেছিলেন তার ভাষা অনেকটা এ রকম, ‘বেশ কিছুদিন আগে কলকাতা ও বাংলাদেশের কয়েকটি প্রভাবশালী গণমাধ্যমে ‘ডুব’ সিনেমার নায়কের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। যেখানে চরিত্র ও কাহিনি বিন্যাসে প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদের জীবনীকেই তুলে ধরা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু ছবিটির পরিচালক নিজে কখনও এই বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কিছুই বলেননি। আর আমার দুশ্চিন্তা মূলত এখানেই। আমি চাই না প্রয়াত স্বামী ও আমার জীবনের স্পর্শকাতর কোনও ঘটনা তুলে ধরা হোক যার কোনও ভিত্তি নেই। আর এ সব কারণেই ‘ডুব’ ছবি নিয়ে আমি আশঙ্কা প্রকাশ করেছি।’ বললেন, ‘‘আমি চাই না আমার সন্তান, পরবর্তী প্রজন্ম ভুল ধারণা নিয়ে বাঁচুক। হুমায়ুন আহমেদের মতো মাপের মানুষকে নিয়ে কোনও কাজ করতে হলে গবেষণা করা উচিত। আমি সেন্সর বোর্ডকে জানিয়েছি, যদি এই ছবি পরিমার্জন না করা হয়, আমি বাধা দিয়ে যাব।’’ কী সেই স্পর্শকাতর ঘটনা?

dub_short_filmএবার আর স্মৃতিকাতরতা নেই। বরঞ্চ ঝাঁঝালো ক্ষোভ। ‘‘অনেক দিন ধরেই একটি গুজব সচেতন ভাবে ছড়ানো হয়েছে আমাদের লোকচক্ষে খাটো করার জন্য। এই ছবিটিও সে ভাবেই সাজানো হয়েছে। দেখানো হয়েছে, হুমায়ুন আহমেদের মেয়ের এক বান্ধবী তাঁদের বাড়ি আসত। সেখান থেকেই নাকি প্রেম। কি ডাহা মিথ্যা কথা এটা।

শাওন জানালেন, কোনদিন হুমায়ুনের মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব তো দূর কোনও পরিচিতিও ছিল না। ‘‘থাকবেই বা কী করে! আমাদের স্কুল-কলেজ সবই তো আলাদা।

শাওন জানালেন, ‘হুমায়নের সাথে আমার পরিচয়ের সূত্রটা ছিল গান।’ রবীন্দ্রসঙ্গীতের অত্যন্ত ভক্ত ছিলেন হুমায়ুন। দিনভর প্রবল পরিশ্রমের মধ্যে সেটাই ছিল তাঁর বড় আশ্রয়ের জায়গা। সেখানেই গান দিয়ে দ্বার খুলেছিলেন শাওন। বা বলা ভাল, তিনি খোলেননি, দরজা খুলে গিয়েছিল আপনা হতেই।

শাওন বলছেন, ‘‘সেই ক্লাস সিক্স-এ পড়ার সময় থেকেই তো ওনার নাটকে অভিনয়, গান করি। ইউনিটের কেউ যদি গান জানতেন, উনি রিহার্সালের পর তাঁর কাছে শুনতে চাইতেন। সেভাবে আমার কাছেও অনেক বার শুনতে চেয়েছেন। আমি খুব চটপট গান তুলে নিতে পারতাম বলে আমার নাম দিয়েছিলেন টেপ রেকর্ডার!’’ সেই ‘টেপ রেকর্ডার’ যে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কবে থেকে বাজতে শুরু করল হুমায়ুনের জীবনে, আজ আর তার সঠিক ঠাহর পান না শাওন। ‘‘মাঝে মাঝে সিগারেটের রাংতায় হাতচিঠি দিতেন। একবার লিখে দিয়েছিলেন সুনীলের লাইন-‘ভ্রু পল্লবে ডাক দিলে দেখা হবে চন্দনের বনে।’ হয়তো রিহার্সালের পর একা বসে খাচ্ছেন, আমি হয়তো এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছি কিছু লাগবে কি না। ছেলেমানুষের মতো খুশি হতেন। একটু যত্ন একটু মায়া খুবই চাইতেন উনি।

শাওনের কাছে প্রশ্ন ছিলো, ‘ব্যক্তি জীবনে বিবাহিত হুমায়নের মায়া আর ভালোবাসার কি অভাব ঘটেছিল একটা সময়ে পৌঁছে? অজস্র অমর চরিত্রের এই স্রষ্টা কি মধ্যজীবন পার করে নিজেই হয়ে উঠছিলেন নিঃসঙ্গ কোনও চরিত্র?

জবাবে কোনও নেতিবাচক উত্তর দেয়নি শাওন। প্রয়াত স্বামীর প্রথম স্ত্রী গুলকেতিন সম্পর্কেও প্রকাশ করেননি কোন অভিযোগ। শাওন বলতে থাকেন, ‘‘দেখুন সবাই শিক্ষিত মানুষ। কখনও কোনও কটুবাক্য বিনিময় হয়নি আমাদের মধ্যে। বরং হুমায়ুন সাহেবের বড় পুত্র নুহাসের সঙ্গে আমার মধুর স্মৃতি রয়েছে। আমরা ওকে নিয়ে বিদেশে বেড়াতেও গিয়েছি। এখন আর কোনও যোগাযোগ নেই। কিন্তু আমি অপেক্ষা করব। আমার ধারণা, ও যখন সত্যি বড় হয়ে যাবে সেদিন আমাদের আবার দেখা হবে।

দীর্ঘ আড্ডায় শাওন অনেক স্মৃতির কথাই জানান প্রতিবেদককে। সামাজিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এসব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একটা গুমোট পরিবেশ একটু হালকা করতে এবার প্রতিবেদকের প্রশ্ন, হুমায়ুন আহমেদের কাছ থেকে পাওয়া প্রিয়তম উপহারটা কী ছিলো বলুন তো?

শাওনের জবাব, ‘‘বিয়ের আগে আমি তো কোনও দামি উপহার নিতাম না। ওনার পাথরপ্রীতি ছিল খুব। একটা লাল গোমেদ দিয়েছিলেন, খুবই দামী। আমি নিইনি। তারপর যেটা দিলেন তা ওনার পক্ষেই সম্ভব। রেললাইন থেকে তুলে আনা একটা বড় পাথরে কলম দিয়ে কয়েকটা ক্রস চিহ্ন করে দিয়ে বলেছিলেন, এটা নিতে নিশ্চয়ই কোনও বাধা নেই! আমি সেই পাথরটার প্রেমে পড়লাম যেন। সব সময় সঙ্গে রেখে দিতাম, কলেজে নিয়ে যেতাম! মা বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন আমার আচরণে। ওনার একটা গল্প রয়েছে পাথর নামে। সেই গল্পে এই ঘটনার ছায়া রয়েছে।

ইন্টারনেট অবলম্বনে

ফোবানি/মৃত্তিকা