রিলংপোয়েঃ দিয়ে শেষ হলো পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী উৎসব বৈসাবি

98

রিলংপোয়েঃ দিয়ে শেষ হলো পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী উৎসব বৈসাবি। নামটা বেশ অদ্ভুতই মনে হবে আপনার কাছে। রিলংপোয়ে: কি? আসুন জানি,

সাংগ্রাইমা ঞি ঞি ঞা ঞা, রিকজাই গে পা মে” (এসো মিলি সাংগ্রাই এর মৈত্রী পানি বর্ষণের উৎসবে) ঐতিহ্যবাহী এই মারমা গানের সুর মূর্ছনায় উদ্বেলিত পাহাড়ি জনপদে মারমা সম্প্রদায়ের বৈসাবি উৎসবের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ থাকে রিলংপোয়েঃ। যা অন্য ভাষা-ভাষির লোকের কাছে মৈত্রী বর্ষণ, জলকেলি উৎসব নামে পরিচিত। সকল পাপাচার ও গ্লানি ধুয়ে-মুছে নিতে তরুণ-তরুণীরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটানোর উৎসবে মেতে উঠেছিল এবারও। পুরাতন বছরের সব গ্লানি, দুঃখ ও বেদনা ধুয়ে মুছে নতুন বছর যাতে সুন্দর এবং স্বাচ্ছন্দময় হয় সেজন্যই ছিল নানাধরণের প্রয়াস। এই উৎসব শুধু বাঙালিরাও নন পাহাড়ীরাও নানা ভাবে পালন করছেন মিলে মিশে।

গত ১২ এপ্রিল হতে শুরু হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের প্রধান সামাজিক ও প্রাণের উৎসব বৈসাবি এর সমাপ্তি হলো মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই জলোৎসব বা রিলংপোয়েঃ উদযাপনের মধ্য দিয়ে। সাংগ্রাই জলোৎসব ছিল পাহাড়ি-বাঙালি সব সম্প্রদায়ের মিলনমেলা। মারমা তরুণ-তরুণীরা পানি খেলায় একে অপরের প্রতি পানি ছুড়ে তাদের ভালবাসার অনুভূতি প্রকাশ করতে থাকে; ভিজিয়ে দেয় পরস্পরকে।

সাংগ্রাই উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বীর বাহাদুর বলেন, ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির আগে এই সাংগ্রাই উৎসবের কথা চিন্তাও করা যেত না। শান্তি চুক্তির পর পাহাড়ে শান্তি বিরাজ করায় প্রতিবছর আমরা এই উৎসব পালন করে থাকি। বীর বাহাদুর আরো বলেন, অনেকে বলে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি। এটা সত্য না। এটি চলমান প্রক্রিয়া। তিনি বলেন, ভূমি সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু আইনের ধারা পরিবর্তন করা প্রয়োজন যা আগামী সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এতে যেটুকু সমস্যা আছে আশা করছি তাও দূর হয়ে যাবে। সাংগ্রাই জল উৎসবে অন্যান্যরা বলেন, পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে যাতে ভাতৃত্ববোধ ও একাত্মবোধ থাকে এবং একে অপরের যাতে আরো কাছে আসতে পারি তাই আজকের এ সাংগ্রাই উৎসব ও নতুন বছর আমাদের প্রেরণা যোগাবে।

পরে প্রধান অতিথি ফিতা কেটে জলকেলির উদ্বোধন করেন। এর পর প্রধান অতিথিসহ অন্যান্য অতিথিরা মারমা যুবক যুবতিদের গায়ে পানি ছিটিয়ে জলকেলির শুভ সূচনা করেন। জলকেলির পর বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মারমা শিল্পিদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগদেন অতিথিরা।

বৈসাবি’ উৎসবকে মূলত পাহাড়ে বসবাসরত তিন প্রধান আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাৎসরিক একটি উৎসবকে বোঝানো হয়। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের উৎসব বৈসু, মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই এবং চাকমা সম্প্রদায়ের বিজু উৎসবের নামগুলোর আদ্যাক্ষর দিয়ে সম্মিলিত এ উৎসব বোঝানো হয়।

মূলতঃ চৈত্রমাসের শেষের দুই দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন বিজু উৎসব পালন করা হয়ে থাকে। এই তিনদিনে পূর্ব পুরুষদের পালিত কতগুলো রীতি-নীতি থাকলেও এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় এসব মেনে চলতে আগের মত উৎসাহ তেমন আর দেখা যায় না। বিজুর এ তিন দিন ভোরে পশু-পাখি না জাগার আগে শরীরের রোগব্যাধি ও অশুচিকে ধুয়ে-ম‍ুছে পবিত্র করার জন্য স্নানের প্রতিযোগিতা হতো। কে প্রথম গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে  স্নান করে আসতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলত। ভোরে স্নানের পর ফুল বিজুর দিনে সকালে নানা ফুল সংগ্রহ করে জল বুদ্ধের উদ্দেশ্যে মঙ্গলময় প্রার্থনা দ্বারা পানিতে ভাসানো হতো। এর পর একই দিনে সকালে পুরো সমাজে একে অন্যের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মোরগ-মুরগীর খাদ্য (ধান, চাল) উঠানে ছিটিয়ে দেওয়া হতো। নতুন বছরের প্রথম দিনে স্থানীয় কবিরাজ বা বৈদ্যদের তিল পড়া, করলা শাক সিদ্ধ পড়া, নারিকেলের পানি পড়া ইত্যাদি মন্ত্র দ্বারা পড়ে খাওয়ানো হতো। এগুলো সারা বছর কুষ্ঠ রোগ, বসন্ত ও কলেরা না হওয়ার জন্য প্রতিষেধক হিসেবে খাওয়াতেন বলে পূর্ব পুরুষরা বলে থাকতেন।এছাড়া  দুই গ্রুপের প্রতিযোগিতায় সারারাত কেরচিনের বোম্বা’র (বাঁশের তৈরি বাতি) সাহায্যে ঘিলে খেলা প্রতিযোগিতা হতো। এ খেলা যার বাড়ির উঠোনে সারারাত পোহানো হতো সে বাড়ির মালিককে পরদিন দুপুরে মুরগি কিংবা শুকর জবাই করে ভাত খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হতো।

কালের বিবর্তনে এবং আধুনিকতার ছোঁয়ায় আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে হারাতে হচ্ছে অনেক ঐতিহ্য-সংস্কৃতি। ঐহিত্যঘেরা তাদের এই রিলংপোয়েঃ উৎসবে অতিরিক্ত আধুনিকতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই বছরও পার্বত্য অঞ্চলের বিজুতে বিভিন্ন সমাজে এসবের তেমন আয়োজন করা হয়নি বলে  তথ্য পাওয়া গেছে। বংশ পরম্পরায় লালন করে আসা এসব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আধুনিকতার করালগ্রাসে হারিয়ে যেতে বসেছে। আশু উদ্যোগ না নিলে বাংলাদেশের আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর এসব চিরায়ত ঐহিত্য হয়তো এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তার উপর অন্যান্য অনেক বিষয়ের মত আদিবাসীদের উৎসব পালনের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা প্রতিকূলতার বাঁধা।

ফোবানি/আহমেদ মাসুদ বিপ্লব

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন