যৌনশিক্ষা : টিনএজ জীবনে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

366
যৌনশিক্ষা শব্দটি শুনলে শুরুতেই অামরা অনেকে অনৈতিক বা অশ্লীলতার সঙ্গে শব্দটিকে গুলিয়ে ফেলি। এ নিয়ে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নেই কোনো অধ্যায়। বাবা-মা অভিভাবকরাও বিষয়টি এড়িয়ে যান। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে যৌনশিক্ষা কথাটি যেন নিষিদ্ধ শব্দ, আর যৌনতা যেন পাপ। অথচ উন্নত দেশগুলো স্কুল পর্যায়েই ফর্মাল প্রোগ্রাম বা পাবলিক হেলথ ক্যাম্পেইনে সেক্স এডুকেশন বা যৌনশিক্ষা যুক্ত থাকে। টিনএজ জীবনে অর্থ্যাৎ বয়ঃসন্ধিকালে এই শিক্ষা ভীষণ জরুরী। অথছ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছাড়াই দিব্যি চলছে আমাদের সমাজ। নারী-পুরুষের স্বাভাবিক যৌন সম্পর্ক নিয়ে আমাদের সমাজে রাখ-ঢাক ব্যাপারটা এত বেশি যে, যৌনতা বা সেক্স নিয়ে বিদ্যমান নানা কুসংস্কার দুর করতে বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠ্যসূচিতে সেই শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের উপযোগী যৌনশিক্ষা (Sex Education) অন্তর্ভুক্ত করাই শুধু নয়, বরং সেই পাঠ্যসূচীর আলোকে শিক্ষার্থীর নিকট যৌনতা বিষয়ক সঠিক জ্ঞানের আলোতে তাকে আলোকিত করে তোলা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যৌনতা নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ক্ষেত্র বিশেষে স্বাস্থ্যহানীর কারণ ও যৌন আনন্দ লাভের ক্ষেত্রে এক ধরণের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের বর্তমান পাঠ্যসূচীত ও পাঠ্যপুস্তকে যৌনশিক্ষা বিষয়টি প্রাথমিকভাবে ‘যৌনস্বাস্থ্য’ বিষয়টি ইতিমধ্যেই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু যৌনস্বাস্থ্য নামকরণ করে যৌনশিক্ষা পড়ানো নিয়েও নানান ধরণের সমস্যা দেখা দিয়েছে। শিক্ষকরা যেমন এখনো এই বিষয়টিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেননি তেমনি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিষয়টিকে নানান ধরণের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।

যৌনশিক্ষা আসলে কি

যৌনশিক্ষা নিয়ে তরুনরা কি ভাবছে? এ বিষয়ে ডয়েচেভেলে অ্যামেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। তাদের প্রায় সবারই বক্তব্য এমন যে, নারী-পুরুষের শারীরিক মিলন সম্পর্কিত জ্ঞানকেই যৌনশিক্ষা বলে৷ একজন শিক্ষার্থী জানালো, যৌনশিক্ষা হলো যৌন মিলনের উপর জ্ঞান, আরেকজন বলেছেন, যৌনশিক্ষা জীবনের জৈবিক চাহিদা সম্পর্কে জানা এবং যৌনতার সঠিক প্রয়োগ ও সতর্কতাকে বোঝায়। আরেকজন তো প্রাক্টিক্যাল ব্যাপার স্যপার উল্লেখ করেছেন, যৌন শিক্ষা হলো শারীরিক সম্পর্কের হাতে কলমে শিক্ষা। অনেকের আবার এমন মন্তব্যও ছিল যে, ‘যৌনশিক্ষা আগে থেকে জানার কিছু নেই, নেই ভালো কোনো দিক৷ যখন এ বিষয়ে জানার প্রয়োজন হবে তখন এমনিতেই তা জানা যাবে।’
বিষয়টা এমন না যে, নারী পুরুষ বন্ধ ঘরে আসলো এরপর কি করতে হবে তা কাউকে শিখিয়ে দিতে হবে না! এটা যৌনশিক্ষা নয়। বরং যৌনশিক্ষা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকায় পিরিয়ড হবার কারনে যে মেয়েটিকে তার পরিবার ঘরে বন্ধ করে রাখে, কোনো কিছু ছুঁতে দেয়না- সেই পরিবারকে সচেতন করার দরকার আছে। যে কিশোর যৌনতা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারনা নিয়ে আজীবন ভয়ের মধ্যে দিনানিপাত করে তাদের জন্য এই শিক্ষার প্রয়োজন আছে। যৌন শব্দটা আমাদের মধ্যবিত্ত মানুষদের মধ্যে এমনিতেই একটা নেতিবাচক আলোড়ন তৈরি করে। এর প্রথম এবং প্রধান কারণ হল বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের ভ্রান্তধারনা। আমরা যৌন সম্পর্কিত বিষয় এর উল্লেখ হলেই মনে করি যৌন কার্যক্রম সংক্রান্ত বিষয়। কিন্তু এটা মোটেই ঠিক নয়। যৌনশিক্ষা হল বিষয়ভিত্তিক নির্দেশনা যা কিনা মানুষের যৌনতার (human sexuality) সাথে সম্পর্কিত। এটা আরও আলোচনা করে সেক্সচুয়াল এনাটমি (sexual anatomy), প্রজননতন্ত্র (sexual reproduction), যৌন কার্যক্রম (sexual activity), প্রজনন স্বাস্থ্য (reproductive health), আবেগিক সম্পর্ক (emotional relations), প্রজনন সংক্রান্ত অধিকার ও দায়িত্ব (reproductive rights and responsibilities), যৌন সম্পর্ক তৈরি করা থেকে বিরত থাকা (abstinence) এবং জন্ম নিয়ন্ত্রন (birth control) নিয়ে।
যৌন শিক্ষা মানে শারীরিক সম্পর্কের হাতে কলমে শিক্ষা নয়
যৌনশিক্ষা মানে কিভাবে সেক্স করবেন তা হাতে কলমে শেখানো নয়। যৌনশিক্ষা বলতে শুধুমাত্র নারী-পুরুষের দৈহিক মিলনকেই বুঝায় না, এর সঙ্গে আরও অনেক বিষয় জড়িত। তাছাড়া যৌনকর্ম বলতেও শুধুমাত্র মানব শিশুর জন্ম দেওয়াকেই বুঝায় না। যৌনশিক্ষা স্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কিত। কিশোর-কিশোরীর বয়ঃসন্ধীকালীন শারীরিক-মানসিক পরিবর্তন, যৌনতা নিয়ে ভ্রান্ত ধারনা, পিরিয়ডকালীন পরিচ্ছন্নতা সবই পড়ে। সুতরাং যৌবন প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে এই বিষয়ে ছেলে-মেয়েদেরকে শিক্ষা দিতে হবে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমন, এখানে কেউ উচ্চশিক্ষা লাভ করার পরও যৌনতার বিষয়ে থাকে অজ্ঞ। এজন্য বিয়ের পরে অনেক বর-কণেকেই পড়তে হয় বিব্রতকর অবস্থায়!
যৌনতা মানব জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যৌনশিক্ষা এই কথাটা শুনলে অনেকেই মনে করতে পারেন, এটা মনে হয় কিভাবে সেক্স করতে হয় সেই বিষয়ে শিক্ষা দান। কিন্তু আসলে বিষয়টা তা নয়, যৌন সম্পর্কিত যেসব ক্ষতিকারক দিক গুলো রয়েছে, সেগুলো থেকে রক্ষা পাওয়া, যৌনতাকে সুন্দর করে উপস্থাপনা করা, একে উন্নত করা ইত্যাদিকেও বোঝায়। আর এই স্বাস্থ্যগত শিক্ষা আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিকতা গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

টিনএজ বা বয়ঃসন্ধিকালে যৌনশিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

এগারো-বারো বছর বয়সের পর থেকেই ছেলে-মেয়ে সবারই যৌনস্বাস্থ্য বিষয়ে জানা দরকার৷ এটা না থাকায় অনেকেই ভুল ধারণা নিয়ে বড় হয়, যা তাদের পরবর্তী জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে৷ তাই এই শিক্ষা স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য খুবই প্রয়োজন৷ এই সময়টা বয়ঃসন্ধিকাল, অর্থাৎ কিশোর-কিশোরী থেকে নারী ও পুরুষ হয়ে ওঠার সময়৷ এই বয়স থেকে সাধারণত মেয়েদের ‘পিরিয়ড’ বা ‘মাসিক’ শুরু হয়৷ পাশাপাশি শরীর এবং মনে ঘটতে থাকে নানা পরিবর্তন৷
শরীর মনের এই পরিবর্তনে তাদের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হয়৷ তারা এই পরিবর্তন নিয়ে তুলনা করে হতাশায় ভুগতে পারে৷ কিন্তু বিষয়টি যদি তাদের কাছে পরিষ্কার থাকে৷ তারা যদি জানে যে এটা স্বাভাবিক পরিবর্তন, তাহলে তাদের মধ্যে কোনো সংকোচ থাকবে না৷ তারা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠবে৷ আমাদের দেশে মেয়েরা তাদের এই পরিবর্তনের খানিকটা ধারণা হয়ত পায় বড় বোন বা বান্ধবীদের কাছ থেকে৷ তাও অতি গোপনে, লুকিয়ে যেন বাড়ির বড়রা তা জানতে বা বুঝতে না পারে৷ ফলে মেয়েরা অধিকাংশক্ষেত্রে মাসিক সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পায় না৷ না বাড়িতে, না স্কুলে৷ ভাবটা এমন যেন ব্যাপারগুলো বিয়ে হলেই জানবে, আগে জানবার প্রয়োজন নেই৷ মনে রাখতে হবে, যৌনশিক্ষা মানে যৌনতা নয়৷ যৌনশিক্ষা আমাদের স্বাস্থ্য এবং স্বাভাবিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য।

উন্নত বিশ্ব এবং আমাদের দেশে যৌনশিক্ষার অবস্থা

উন্নত বিশ্বে কিশোর বয়স থেকেই যৌনশিক্ষা প্রদানের পদ্ধতি প্রচলিত আছে। জার্মানিতে প্রাথমিক পর্যায়েই যৌনশিক্ষা, অর্থাৎ যৌনতা সম্পর্কে খোলাখুলিভাবে জানানো হয়৷ যৌন সম্পর্ক কী?, কম বয়সে যৌনতার ক্ষতিকর দিক, জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, গর্ভধারন, গর্ভপাত এবং অবশ্যই যৌনরোগ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দিয়ে কিশোর-কিশোরীদের সচেতন করা হয় স্কুলেই৷ নিজের শরীর সম্পর্কেও সচেতন করে দেয়া হয় তাদের৷ ফলে কোনটা ভালোবাসার স্পর্শ আর কোনটি অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে – সেটা তারা সহজেই বুঝতে পারে৷ যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের মতো কোন পরিস্থিতে করণীয় কী – সেটাও তাদের বোঝানো হয়৷
ব্রিটেনের প্রাইমারি স্কুলগুলোতে যৌনশিক্ষা বাধ্যতামুলক করা হয়েছে। সরকারী স্কুলগুলোর পাঁচ থেকে ১৬ বছর বয়সী ‌ছাত্র ছাত্রীরা শিক্ষকদের কাছ থেকে যৌনতার নানা দিক নিয়ে গঠনমুলক শিক্ষা পাচ্ছে৷ এর পাশাপাশি মাদকের ভয়াবহতা, অনিরাপদ গর্ভধারণ ও সুস্বাস্থ্য রক্ষায় বিভিন্ন নিয়মকানুন সম্পর্কেও শিক্ষা দেয়া হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের৷
বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে যৌনশিক্ষা অন্তর্ভুক্তির পর থেকে নানা ধরনের অপঃপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদি চক্র। বিশাল একটা মহল ‘স্কুলে শিক্ষার্থীদের মাঝে যৌন সুড়সুড়ি বিষয়ক বই বিতরণ হচ্ছে’ বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে! হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ) গবেষণা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী ও সেক্রটারী জেনারেল মাওলানা হাফেজ আবু তাহের যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, অশ্লীল ব্লু-ফ্লিম দেখিয়ে যৌনশিক্ষার নামে সুকৌশলে শিশুদের চরিত্রকে ধ্বংস করার সব আয়োজন সম্পন্ন করে ফেলা হয়েছে! যৌনশিক্ষামূলক পাঠ্যপুস্তক বাতিল করে এগুলোর সম্পাদক ও প্রনেতাদের গ্রেফতার এবং বিচার করার দাবী জানিয়েছিল।

যৌনশিক্ষা বিষয়ে শেষকথা

বর্তমান যুগটা প্রযুক্তিনির্ভর এবং ইন্টারনেটের যুগ। এইযুগে অভিভাবক বা শিক্ষকরা তাদের ছেলে-মেয়ে কিংবা শিক্ষার্থীদের সাথে অনেক বিষয়ের আলোচনা না করলেও সন্তান-শিক্ষার্থীরা ঠিকই সেটি প্রযুক্তির কল্যাণে জেনে যাচ্ছে যা কিনা তাদের মাঝে কৌতুহলের জন্ম দিয়ে থাকে। আর সেই কৌতুহল মেটাতে গিয়ে তারা তাদের সমবয়সী বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে অধিকাংশ সময়েই ভ্রান্ত ধারণা অর্জন করে থাকে। আর সেই ভ্রান্ত ধারণাগুলো একবার তাদের মনের ভিতরে গেঁথে বসলে সহজেই আর সেটাকে পরিবর্তন করাটা সম্ভব হয়ে উঠেনা। যৌনতা আর যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জনের জন্য যৌনশিক্ষার কোন বিকল্পই নেই।
যৌনশিক্ষাটা ফরমালি হলে ভাল, তবে তা ইনফরমালিও হতে পারে। বিশেষ করে অভিভাবক, বন্ধু-বান্ধব বা কাছের কারো সাথে এই বিষয়ে শেয়ারিং হতে পারে। বই পড়ে, মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে কিংবা প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করেও এই বিষয়ে উপযুক্ত ধারণা ও জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব। বিষয়টি আসলেই একটি স্পর্শকাতর বিষয়। আর তাই এই বিষয়ের ধারণা অর্জনের জন্য সঠিক পথেই পা রাখাটা প্রয়োজন। পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্তি এবং তার যথাযথ পাঠদান নিশ্চিত করা সম্ভব হলে এর সামাজিক গুরুত্বও বৃদ্ধি পাবে অনেক বেশী। আবার এই বিষয়ে পাঠদান করবার সময় শিক্ষকগণকেও বিশেষ যত্নবান এবং সঠিক জ্ঞানসম্পন্ন হয়ে বিচক্ষণতার পরিচয় রাখতে হবে।

 

ফোবানি/আহমেদ মাসুদ বিপ্লব

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন