মোগল রসুই ঘরের ইতিহাস থেকে রেসিপি শিখুন

84
mogol_kabab

মোগল রসুই ঘর থেকে আমার কুড়িয়ে পাওয়া রান্নার একটি রেসিপি শেয়ার করবো সবার সাথে। কিন্তু তার জন্য একটু কষ্ট করে হলেও আপনাকে সময় নিয়ে মোগল রসুই ঘরের ইতিহাসটি পড়ে নিতে হবে। বাজার করতে গিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া শওকত ওসমান এর লেখা ‘মোগলদের রসুই থেকে’ পড়ুন। টুকরো কাগজে শওকত ওসমান সম্পর্কে কোন তথ্য না থাকায় এই মুহুর্তে ঠিক বলা যাচ্ছে না একজন কথাসাহিত্যিক কিভাবে রন্ধনশিল্পী হলেন? বাঙ্গালীর ইতিহাসে খাদ্য কিংবা বাঙ্গালী খাদ্য সংস্কৃতি বা খাদ্য শিল্পের ইতিহাস জানাতে লেখাটি এতই মনে ধরেছে যে শেয়ার করছি। এই মুহুর্তে গিন্নিকে ধন্যবাদটাও দিতে চাই। ভাগ্যিস, বাজারটা করতে দিয়েছিলো যদিও পেশাটা এমনই বাজার করা।

এক অর্থে খাওয়াদাওয়াই কিন্ত আমাদের এই ভুখন্ডে পরাধীনতা নিয়ে আসার একটা সুযোগ করে দিয়েছিলো। সে কথা বলার জন্যই একটু অতীত ভ্রমন করা দরকার।

বঙ্গ দেশে মুসলমানেরা আসতে শুরু করে দুই ভাবে। প্রথমত, আরবরা চট্টগ্রাম এসেছিল নৌপথে। নিতান্তই বানিজ্যের জন্য। এরা ছিলো মৌসুমি ব্যবসায়ী। মৌসুমের একটা সময় তারা আসত, আবার চলেও যেত। এখানে স্থায়ী বসত গড়ার কোন ইচ্ছা তাদের ছিলনা। বাঙ্গালীরা তাদের মাধ্যমেই প্রথম মুসলমানদের সংস্পর্ষে আসে। আমাদের খাদ্যাভাসে ওদের প্রভাব কতটা পড়েছিলো, তা বোঝা যাবে মসলার অন্দরমহলে খোজ খবর নিলে।

আরবরা মুলত ভারতবর্ষ থেকে মসলা নিয়ে যেত, আবার নিজেদের মসলাও নিয়ে আসত এই দেশে। চট্টগ্রাম থেকে এরা নিয়ে যেত পিপুল, যাকে বেঙ্গল পেপার বলা হয়। এই এলাকার কলাও ছিলো আরবদের খুব পছন্দের ফল। এখান থেকে তারা কলা নিয়ে গিয়েছিল।চাষ করেছিল আফ্রিকায়। আবার আফ্রিকা থেকে তেতুল নিয়ে এসেছিল চট্টগ্রামে। জাফরান নিয়ে গিয়েছিল ইউরোপে। তখন পর্যন্ত মসলা বানিজ্যের পুরোটাই ছিল আরবদের হাতে। তাদের দেখাদেখি ইউরোপিয়রাও এ ব্যবসায় যোগ দেয়। যে কথা বলছিলাম, মসলার জন্যই ভারতবর্ষ স্বাধীনতা হারায়। মসলার ব্যবসা করতে এসে ইউরোপীয়রা দেখল, আরে! এখানকার লোকেরা নিজেদের মধ্যে মারামারি-কাটাকাটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে আছে। জায়গাটাতো দখল করে নেয়া খুব সহজ। ধীরে ধীরে তারা এ অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করে ফেলল।

বঙ্গদেশে আরেক দল মুসলমান এসেছিল সুলতানি যুগে। দিল্লিতে সে সময় শিয়া-সুন্নির বিরোধ চরমে।আর আফগান থেকে যে সুলতানরা আসে, তারা ছিল সুন্নি। সুন্নিরা ক্ষমতায় এলে শিয়াদের নির্যাতন করতে লাগল। ফলে দিল্লি থেকে শিয়ারা পালিয়ে যায়। তাদের কিছু অংশ বাংলাদেশে আসে। এ দেশে যে বড় বড় পীর সাহেবদের দেখা যায়, তাঁদের বড় অংশ এভাবেই এখানে এসেছেন। এখানে এসে তাঁরা বসতি স্থাপন করেন।

ইবনে বতুতা আসার পর ভারতে মুসলমানরা আসতে শুরু করল শাসক হিসেবে। রাজ্য দখল করতে তখন একের পর এক চলছিল ধুন্ধুমার যুদ্ধ। তখনো শাসকদের সংস্কৃতির প্রভাব সাধারন মানুষদের মধ্যে খুব একটা পড়েনি। এ প্রভাব পড়তে শুরু করে মোগলরা এলে। মোগলরা কারো বাড়া ভাতে ছাঁই দিত না। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি ছিল না তাদের। তারা ছিল সুশাসক। সে সময় মোগল আমলারা ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে যেতে লাগল। নানা পদবী নিয়ে এ অঞ্চলের মানুষ জনকেও শাসনব্যবস্থায় সম্পৃক্ত করা হলো। এভাবেই মোগলদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষদের যোগাযোগ গড়ে উঠল। আরও নানা কিছুর সঙ্গে মোগলদের খাওয়া-দাওয়ার সঙ্গেও পরিচয় হলো স্থানীয় মানুষদের।

খেয়াল করলে দেখবেন, মোগলদের আগে এই এলাকায় খুব বেশী রান্নার নাম পাওয়া যায় না। ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ব্রাক্ষনবাড়িয়ায় এখনো ডিমকে বলা হয় বয়দা বা আন্ডা। আমার ধারনা,মুরগীর ডিম খাওয়ার ব্যাপারটা এই এলাকায় এসেছে মুসলমানদের হাত ধরে। সেদ্ব ডিম স্লাইস করে সাজানোর ধারনা এসছে এসেছে পারস্য থেকে। ডিমের নানা রকম ব্যবহারও এসেছে তাদের মাধ্যমে। ডিম ও দুধের মিশ্রনে পুডিং বানানো পারস্যের আবিস্কার। গাজর ও পেঁয়াজের ব্যবহারও তাদের কাছ থেকেই শেখা। সিরকার ব্যবহারটাও আরবরাই শুরু করে। আরবরা মুসলমান হওয়ার পর মদ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তারা ওয়াইনের বদলে সিরকা ব্যবহার করতে শুরু করে। সিরকায় এ্যালকোহল নেই।

আমাদের সংস্কৃতিতে আরবদের চেয়ে পারস্যের প্রভাব অনেক বেশি। ভারত বর্ষ পারস্য সংস্কৃতি থেকে দু’হাত ভরে নিয়েছে। এ ব্যাপারে বাদশাহ হুমায়ুনের বিরাট ভুমিকা। বাদশাহ হুমায়ুন সিংহাসনচ্যুত হ্ওয়ার পর চলে যান পারস্যে। হুমায়ুনের স্ত্রী ছিলেন ইরানের। হুমায়ুন রাজ্য পুনরুদ্বারের জন্য ইরানের বাদশাহের সাহায্য চান। একটি শতূ পুরন করেলেই বাদশাহ তাঁকে সৈন্য-সামন্ত দিয়ে রাজ্য পুনরুদ্বারে সাহায়্য করবেন বলে জানান। শর্তটি হলো, সুন্নি হুমায়ুনকে শিয়া হতে হবে। হুমায়ুন তাতে রাজি হলেন। এরপর ইরানের বিশাল সৈন্য বাহিনীর মাধ্যমে তিনি রাজ্য ফিরে পেলেন।

হুমায়ুন যখন ভারতে ফিরলেন, তখন তাঁর সঙ্গে শুধু সৈন্য-সামন্তই ছিল না, ছিল বাবুর্চির দলও। ছিলেন শিল্পীরাও। মোগল মিনিয়েচার হুমায়ুনের সঙ্গে ইরানি শিল্পীদের ভারতবর্ষে আসার ফল।ইরানি খাদ্যে ততদিনে হুমায়ুন মজে গেছেন।

এবার বলি আসল কথাটা। আমরা যাকে মোগল খাবার বলি, সেটা আসলে রূপান্তরিত ইরানি খাবার। সেই খাবার ভারতবর্ষ হয়ে এই বাংলায় এসে ঠেকেছে।

অনেক কথাই হলো। আমরা যেহেতু খাসির মাংসের রান্না-বান্না করব, তাই এবার খাসি নিয়ে কিছু বলা যাক। বৈদিক যুগ থেকেই ভারতবর্ষে ছাগল খাওয়ার প্রচলন ছিল। প্রাচীন বাংলায় ছাগলের মাংস খাওয়া হতো। এর পাশাপাশি খাওয়া হতো হরিনের মাংস। তখন জাল পেতে হরিন ধরা হতো। কেউ কেউ সেই মাংস শুকিয়ে শুঁটকি করেও খেত। এ অঞ্চলের পুরুষ পাহাড়ি ছাগলের শরীরে দারুন দুর্গন্ধ হতো। এদের অন্ডকোষ ফেলে যখন খাসি করা হলো,তখন কিছু কিছু হরমোন নি:সরন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাংস দুর্গন্ধমুক্ত হলো। মাংসটা হয়ে উঠল সুস্বাদু। বাঙ্গালীরা দ্রুত এই মাংসে অভ্যস্ত হয়ে উঠল। বিশেষ করে কুষ্টিয়ার ‘ব্লাক বেঙগল গোট’ ছিল রসনা তৃপ্ত করার জন্য অনবদ্য। ছাগলকে খাসিতে রুপান্তরিত করার পর খাসির মাংসের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়।

বাদশাহ জাহাঙ্গীরের শখ ছিল বন্য ছাগল শিকার করা। তিনি খাসির মাংস বেশ পছন্দ করতেন। ইরানিদের মধ্যে গরুর মাংস খাওয়ার খুব একটা প্রচলিন ছিল না। ছাগল বা ভেড়ার মাংসের প্রতিই তাদের দুর্বলতা বেশি ছিল।

কলকাতায় বিরানী এল কি করে, তা নিয়েও আছে চমকপ্রদ কাহিনী। বিট্রিশরা লখনৌ থেকে ওয়াজেদ আলী শাহকে কলকাতায় পাঠিয়ে দিল। তিনি তাঁর শ তিনেক স্ত্রী ও অসংখ্য বাবুর্চি নিয়ে চলে এলেন কলকাতায়। ইংরেজরা বিরক্ত হলেন, কারন এত মানুষ একসঙ্গে রাখার খরচ কিন্তু কম নয়। কিন্তু লখনৌ থেকে ইংরেজদের যে আয় হতো, তাতে ওয়াজেদ আলী শাহকে কলকাতায় রাখার পরও নিজেদের জন্য অনেক অর্থ থেকে যেত। ওয়াজেদ আলী শাহ মারা যাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে আসা বাবুর্চিরা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তারা রেস্তোরা খুলে মোগল খাবার বিক্রি করতে শুরু করে। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পরে তাদের অনেকে চলে আসে ঢাকায়। সাইনু পালোয়ানের মোরগ পোলাও বা হাজির বিরিয়ানি – এসব খাবার এসেছে ইতিহাসের সেই পথ ধরেই। ঢাকায় আলুর ব্যবহার ছিল ব্যাপক। আলু সহকারে কাচ্চি বিরিয়ানি হয়ে উঠে ঢাকাই রান্নার পরিচয়। এভাবেই এ দেশে মোগল রান্না ছড়িয়ে পড়ে।

মোগল তাওয়া কাবাব

আগুন আবিস্কারের পর থেকেই মানুষ বুঝে গেছে,আগুনে ঝলসে যে মাংস খাওয়া হয়,তার স্বাদ অপূর্ব।কাবাবের স্বাদ বিশ্বজোড়া। আমরা এখানে যে কাবাবটির কথা বলছি, তা হলো মোগল তাওয়া কাবাব। ঝলসানো কাবাব নয়। তবে খেয়ে দেখুন মোগল তাওয়া কাবাব, কেমন লাগে!

উপকরন

খাসির মাংসের কিমা ১ কিলোগ্রাম। আদা বাটা ১ টেবিল চামচ। রসুন বাটা দেড় টেবিল চামচ। কাঁচা মরিচ কুচানো ২ টেবিল চামচ। কালি জিরা গুড়া আধা টেবিল চামচ। জায়ফল গুড়া আধা চা-চামচ। পুদিনা পাতা কুচানো আধা কাপ। লবন আড়াই চা-চামচ।

রান্নার প্রনালী

সব উপকরন একসঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। ঢাকুন। রেখে দিন আধা ঘন্টা ঠান্ডা জায়গায়। হাতের তালুতে দুই টেবিল চামচ কিমা নিয়ে ৩০ সেকেন্ড চাপ দিয়ে গোল করতে থাকুন। দেড় সিন্টিমিটার পুরু প্যাটি তৈরী করে রেখে দিন। এভাবে পুরো কিমা দিয়েই তৈরী করুন প্যাটি। একটি ননষ্টিক ফ্রাইং প্যানে কিছুটা ঘি ব্রাশ করুন। আস্তে আস্তে প্যাটিগুলো ভাজুন, আবার ওল্টান। এভাবে কয়েকবার ওল্টান। ব্যস, হয়ে গেল মোগল তাওয়া কাবাব।

ফোবানি/হামিদ