মৃত্যু – পান্থজন জাহাঙ্গীর

96
death_the_truth_of_life

মৃত্যু (ইংরেজি: Death) বলতে জীবনের সমাপ্তি বুঝায়। জীববিজ্ঞানের ভাষায় প্রাণ আছে এমন কোন জৈব পদার্থের (বা জীবের) জীবনের সমাপ্তিকে মৃত্যু বলে। অন্য কথায়, মৃত্যু হচ্ছে এমন একটি অবস্থা (state, condition) যখন সকল শারিরীক কর্মকাণ্ড যেমন শ্বসন, খাদ্য গ্রহণ, পরিচলন, ইত্যাদি থেমে যায়। কোন জীবের মৃত্যু হলে তাকে মৃত বলা হয়।

বল, ‘তোমাদেরকে মৃত্যু দেবে মৃত্যুর ফেরেশতা যাকে তোমাদের জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। তারপর তোমাদের রবের নিকট তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে।’ সূত্র: উইকিপিডিয়া

“পান্থজন জাহাঙ্গীর গল্পটি লিখেছেন মৃত্যু শিরোনামে । জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার মৃত্যু নিয়ে ক’জন ভাবে ! লেখক তাঁর ভাবনার জগতে একটি দৃশ্যপট এঁকেছেন। চিত্রশিল্পী না হয়েও কল্পনায় জীবনের এই চরম সত্যির উপলব্দি হোক সার্বজনীন- সম্পাদক।”

মৃত্যু

– পান্থজন জাহাঙ্গীর

কিছুক্ষন আগেও চৈত্রের  আকাশে টাট্কা প্রখর রোদে শাদা-কালো যে মেঘগুলো ইতস্ত ভেসে বেড়াচ্ছিল। সে মেঘগুলো এখন শাদা মখ্মলে পেজা শিমুল তুলার মতো সারা আকাশ জুড়ে স্থির হয়ে জমে আছে। মেঘের ভেতরে ভেতরে রোদ। চরাচরে এখন রোদ- আর মেঘের  লুকোচুরি খেলা। সূর্য অনেকটা পশ্চিম দিকে হেলে পড়ছে। কিছুক্ষন পর পর ঠান্ডা ও গরম হাওয়ার ঝলকা বাড়ির চারপাশের বর্ষীয়ান বৃক্ষের ডাল-পালাগুলোকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। আর দক্ষিনের দরজা দিয়ে বাশঁবাগান থেকে ধেয়ে আসা ঝির ঝির কোমল বাতাসে গা এলিয়ে দুপুরে মা ঘুমিয়েছিল। অনেক ক্লান্তির ঘুম। মায়ের মাথাটা ছুঁ ছুঁ করছিল। এর মধ্যে আবার কাকের ডাক। কাকটি সকাল থেকে থেমে থেমে কা কা করছিল। তারপরও মা বিরক্ত না হয়ে অনেক সংযমী হয়ে বলল,ও কাক মরা-সরার খবর নিয়ে যা,তারপর মা পাশ ফিরে শুইল। এ রকম দুপুরে কাক ডাকলে, মায়ের কাছে একটা শোকের আবহ তৈরি হয়। মায়ের মনটা কেমন জানি উতাল-পাতাল হয়ে যায়। এমনি তো এই বয়সে মায়ের মনে যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে সেটা হচ্ছে মৃত্যু। তার মনে এখন মৃত্যুর অনেক রং। মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যে মৃত্যুর সাথে কথা বলে। মৃত্যু এসে ঘুমের মধ্যে চেপে ধরে। জবান খেয়ে ফেলে। হাত-পা নাড়তে পারেনা। অনেক ছুটাছুটি,ধস্তাধস্তির পর অবশেষে ঝিম্ করে নাকি ছাড়ে। তাহলে এটা কি মৃত্যু? না মৃত্যুর রিহার্সেল? না এমন সুখের মরণ হতে পারেনা। এখানে মৃত্যুদূত অদৃশ্য। মৃত্যু নাকি এর চেয়েও ভয়ংকর। যমের মতো ডাক ছাড়ে,অদ্ভুত কিম্ভূতকিমাকার দৃশ্যে তার কাজ শেষ করবে। উহু কি যন্ত্রনা !! কিছুক্ষন পর কাকটি আবার কা.. কা.. রবে ডেকে ওঠল। কাকটি এবার এমন করুনসুরে ডাকলো যেন মায়ের ভেতরটা এবার খচ্ করে  ওঠল। মায়ের কাছে শোকের আবহটা গভীর থেকে আরো গভীরতর হল। কাকের ডাকে পরিবেশটা যেন ভারী হয়ে উঠল। এইবার মা ঘুম থেকে একেবারেই উঠে গেল এবং  উঠানে গিয়ে দুটো তালি দিয়ে কাক টিকে অবশেষে তাড়াল। অহনা মায়ের পাশে শুয়েছিল। মায়ের ছটফটানি দেখে আধাঘুম থেকে সেও জেগে ওঠল। সে মাথার চুলগুলোতে আঙ্গুল চালাচ্ছিল। কাক পক্ষী নিয়ে মায়ের এই আধ্যাত্বিকতা সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারেনা। তিনি তো আর বাদশাহ সোলাইমান নন। মার কথা অনুযায়ী  কাক নাকি মৃত্যুর  খবর নিয়ে আসে। আর মৃত্যু মানে আত্মীয় স্বজনের মৃত্যু। তাই  মায়ের ছটফটানী বেড়ে যায়। মায়ের মনটা দুরু দুরু করে। বাতাসে তিনি মৃত্যুর গন্ধ খুঁজে পায়। আর আকাশে শোকের বীণ। শিরিষ গাছের পাতাগুলো যেন মৃত চোখের মতো কাফনের কাপড়ের অপেক্ষায় নুয়ে রয়েছে। মাঝে মাঝে বাতাসের ঝাপটায় বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে যেন কার কান্নার বিলাপ ভেসে আসছে। মাটিগুলো কেমন জানি শুষ্ক হয়ে আছে। মায়ের এরকম কল্পনা মাঝে মধ্যে অহনার মনটাকেও ধাক্কা মেরে যায়। কল্পনার জালে তখন সেও আটকা পড়ে যায়। অবিশ্বাসের মধ্যে  কেমন জানি একটা বিশ্বাসের টান চলে আসে। মা বলে তার সব কথা কি বিশ্বাস করতে হবে? কিছুক্ষন পর কাকটি আবার এসে শিরিষ গাছের ডালে বসল। এবার অহনা খাট থেকে উঠে বসল। তারপর ওড়নাটা মাথায় দিয়ে তড়িৎ বের  হয়ে গেলো। দেখে শিরিষ গাছে ইয়া বড় একটা দাঁড় কাক বসে আছে। মায়ের ভাষায় এটি হচ্ছে ভূত কাউয়া। রাতের আধারে গ্রামের ভূতগুলো নাকি এই কাকের ছদ্ধবেশ ধারণ করে। ওদের মুখে নাকি চেরাগ জ্বলে। ভয় পেয়ে তাই অন্ধকার রাতে দিকভ্রান্ত হয়ে ওদের কাছে যাইতে নেই। ঠোট লম্বা, সামনে সুচালো। দু’পায়ে লম্বা ধারালো নখর। গাঢ় কালো চোখ। লম্বা গলা। মোটা-সোটা নিকষ কালো দেহ। অদ্ভুত চাহনী। ভ্রু কুচকিয়ে যখন অহনা উপর দিকে তাকালো তখন ওপর থেকে লম্বা গলা নিচু করে, চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চক্ষু টেনে অদ্ভুত প্রখর দৃষ্টিতে কক্ -র্ক-র-র-র করে ভেল্কি মেরে এমনভাবে তার দিকে তাকাল যেন তার সামনে গভীর অ›ধকার রাতের এক চিলত্ ভৌতিক দৃশ্যের অবতারণা হলো। তাই দিন-দুপুরেই তার মনে একটু ভয় লেগে গেল। এতো চোর কাক, ডাইনী বলে অহনা দৌঁড়ে ঘরে ঢুকে গেল। ভর দুপুরে সে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করল। যখন চোখে একটু-আধটু ঘুম জুড়ে আসলো তখন বাইরে থেকে হঠাৎ মায়ের চিৎকার ভেসে আসলো ‘অহনা.. ও অহনা..ওরে ওঠ… তোর বেটকা নানা (রফিকের বাপ) নাকি শহরে মারা গেছে! লাশ আনতাছে!

খামখেয়ালী ভাবনায় জীবনের পরম ও চরম সত্যি হলো মৃত্যু।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন