মণি বেগম কাজের আশায় প্রবাসে গিয়ে জানেন যৌনকর্মী হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে, উদ্বারে সাহায্য প্রয়োজন

70
moni_begum_violence_aginist_women

মণি বেগম, সংসারের স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে কাতার যাওয়ার উদ্দেশে দেশ ছেড়েছিলেন। গত সপ্তাহে হঠাৎ একটা নম্বর থেকে ঢাকায় বড় বোন নাজমা বেগমের মোবাইলে একটা ফোন আসে। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে একটি মেয়ে কন্ঠ,“আফা, আমি মণি বেগম। কাঁদতে কাঁদতে মনি বেগম বলেন, আমারে নাকি কিন্যা আনছে, দ্যাশে যাইতে দেয় না,‘আমারে দ্যাশে নিয়ে যাও,নইলে আত্মহত্যা করুম।’

সংসারের দারিদ্রতা গুচাতে দেশ ছেড়েছিলেন মণি বেগম, গত দুই বছর তাঁর কোনো খোঁজ পায়নি পরিবার। এই সময়ের মধ্যে মণি বেগমের মা মারা গেছেন। সন্তান দুটো এখন বড় হচ্ছে খালার কাছে।

হঠাৎ একটা নম্বর থেকে ফোনে মনি বেগম বলেন, তাঁকে কাতারে পাঠানো হয়নি। যৌনকর্মী হিসেবে যুদ্ধকবলিত সিরিয়ায় বিক্রি করা হয়েছে। তাঁকে দিয়ে করানো হচ্ছে অসৎ কার্যকলাপ।

মণি বেগম তাঁর বোনকে জানান, ‘বাধা দিলে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। আর প্রতি মাসে বেচাকেনার ধকল তো আছেই। যেকোনোভাবে সিরিয়া থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়ে মণি বেগম বোনকে বলেন, ‘দ্যাশে নিয়ে যাও আমারে, নইলে আত্মহত্যা করব।’

খোঁজ নিতে যাত্রাবাড়ীতে মণির বোনের বাসায় গেলে বোন নাজমা বেগম জানান, আড়াই বছর আগে মো. জাভেদ ও সিরাজ সিকদার নামের স্থানীয় দুই দালাল তাঁর বোনকে সিরিয়া নিয়ে যান।

সিরিয়ায় মণি বেগমের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ভুক্তভোগী এই নারী। তিনি সিরিয়ার দামেস্ক শহরের একজন নারীর অধীনে কাজ করছেন।

মণি বেগম বলেন, ‘এরা ভালো না, আমারে নাকি কিন্যা আনছে, দ্যাশে যাইতে দেয় না। আমারে কাতারের কথা কইয়্যা দ্যাশ থাইক্যা নিয়া আইছে। এখন দেখি খালি যুদ্ধ আর বোমের আওয়াজ, ঘুমাইতে পারি না, ঠিকমতো খাওনও দেয় না।’

বোনের মুখে এমন দুর্দশার কথা শুনে নাজমা বেগম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কল্যাণ শাখার পরিচালকের কাছে বোনকে সিরিয়া থেকে ফেরত আনার আবেদন জানান। মন্ত্রণালয় নাজমার অভিযোগের বিষয় খতিয়ে দেখে।

বৈরুতের বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে মণি বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। মণি বেগমের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের সচিবকে অনুরোধ জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মো. জাভেদের বাসা মীর হাজারিবাগ। নাজমাকে সঙ্গে নিয়ে জাভেদের বাসায় গেলে তিনি বলেন, তিনি কিছু জানেন না। সিরাজ সিকদারই এসবের মূল হোতা। তিনি ঢাকার ফকিরাপুলের একটি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মণি বেগমকে সিরিয়ায় পাচার করে বিক্রি করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এর আগে নারী পাচারের অভিযোগে সিরাজ সিকদারকে গ্রেপ্তার করা হলেও এখন জামিন পাওয়ার পর একই কাজ করছেন। ফকিরাপুল থেকে অফিস পাল্টে এখন গুলিস্তানে অফিস নিয়েছেন।

এসব নারী দেশে ফিরতে চাইলেও কেউ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এই পাচারের সঙ্গে জড়িত দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সির কয়েকজন মালিককে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) গ্রেপ্তার করলেও ইতিমধ্যে তাঁরা জামিনে মুক্তি পেয়ে গেছেন। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এঁরা কিভাবে জামিন পায়?

সিরিয়ায় পাচার হওয়া নারীদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে কি না, এ প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘সিরিয়ায় পাচার অত্যন্ত ভয়াবহ। সেখানে বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকায় এবং ওই নারীদের অবস্থান না জানায় তাঁদের ফিরিয়ে আনা কঠিন বিষয়। কারণ, কয়েকজনের পরিবারও বলেছে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই।’

সিরাজ সিকদারের সঙ্গে কথা বলতে তাঁর গুলিস্তানের অফিসে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে সেখানে ভুক্তভোগী কয়েকটি পরিবারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। গফুর মিয়া নামের একজন বলেন, তাঁর স্ত্রী হালিমা খাতুনের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না তিনি। এখানে এসে সিরাজ সিকদারকেও পাচ্ছেন না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, এ পর্যন্ত ৭৯ জন নারীকে যুদ্ধকবলিত সিরিয়ায় পাচার করা হয়েছে। ভুক্তভোগী মণি বেগমসহ সকল নির্যাতিত নারীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্যসূত্র: সম্পাদক ডট কম

ফোবানি/হামিদ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন