ভূমিকম্প কি? ভুমিকম্প কেন হয়ে থাকে? রিকটার স্কেল কি? বাংলাদেশে ভূমিকম্প।

938
what_is_eartquake

ভূমিকম্প কি?

ভুমিকম্প হচ্ছে ভুমির কম্পন। ভূ অভ্যন্তরে যখন একটি শিলা অন্য একটি শিলার উপরে উঠে আসে তখন ভুমি কম্পন হয়ে থাকে। ভূমিকম্প মূলত ভূ-পৃষ্ঠে সংঘটিত আকস্মিক ও অস্থায়ী কম্পন। ভূ-অভ্যন্তরস্থ শিলারাশিতে সঞ্চিত শক্তির আকস্মিক অবমুক্তির কারণে সৃষ্ট এই স্পন্দনের মাত্রা মৃদু কম্পন থেকে প্রচন্ড ঘূর্ণনের মধ্যে হতে পারে। ভূমিকম্প হচ্ছে তরঙ্গ গতির এক ধরনের শক্তি, যা সীমিত পরিসরে উদ্ভূত হয়ে ঘটনার উৎস থেকে সকল দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত কয়েক সেকেন্ড থেকে এক মিনিট পর্যন্ত ভূমিকম্প স্থায়ী হয়।

স্থলভাগের যে বিন্দুতে ভূমিকম্পের তরঙ্গের সৃষ্টি হয় তাকে কেন্দ্র বলে এবং এই কেন্দ্র থেকে স্পন্দন সকল দিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম এটি কেন্দ্রের ঠিক উপরের বিন্দু বরাবর ভূ-পৃষ্ঠে অনুভূত হয় যাকে উপকেন্দ্র (epicentre) বলে। এই উপকেন্দ্রেই ভূমিকম্পের প্রথম ঝাঁকি অনুভূত হয়। কেন্দ্রের গভীরতার ভিত্তিতে ভূমিকম্পকে অগভীর কেন্দ্র (০-৭০ কিমি), মাঝারি কেন্দ্র (৭০-৩০০ কিমি) ও গভীর কেন্দ্র (৩০০ কিমি) ইত্যাদি সংজ্ঞায় অভিহিত করা হয়। ভূমিকম্পের আকার পরিমাপের সবচেয়ে প্রচলিত মাপক হচ্ছে রিকটারের মান (M)। রিকটার স্কেলে তীব্রতা নির্ধারণে সিসমোগ্রামে সর্বোচ্চ পৃষ্ঠ তরঙ্গ বিস্তার (Surface Wave Amplitude) এবং প্রাথমিক (P) ও মাধ্যমিক (S) তরঙ্গ পৌঁছানোর সময়ের পার্থক্যকে ব্যবহার করা হয়। ১৯১২ সনে জার্মান বিজ্ঞানী আলফ্রের্ড ওয়েগনার পৃথিবীর মানচিত্র পর্যবেক্ষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে এক সময় পৃথিবীর মহাদেশগুলো একত্রে ছিল যা কালক্রমে ধীরেধীরে একে অপরের থেকে দূরে সরে গিয়েছে। ওয়েগনারের এই তত্ত্বকে বলা হয় কন্টিনেন্টাল ড্রিফ্ট।

এ তত্ত্ব বলে পৃথিবীর উপরিতল কতগুলো অনমনীয় প্লেটের সমন্বয়ে গঠিত। এই প্লেটগুলোকে বলা হয় টেকটনিক প্লেট। একেকটি টেকটনিক প্লেট মূলতঃ পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গলিত পদার্থের বাহিরের আবরণ যা একটি পাথরের স্তর। ভূ-স্তরে যা কিছু রয়েছে তা এই প্লেটগুলোর উপরে অবস্থিত। টেকটনিক প্লেটগুলো একে অপরের সাথে পাশাপাশি লেগে রয়েছে। এবং এই প্লেটগুলো সবসময়ই সঞ্চারণশীল। এগুলো প্রায়ই নিজেদের মাঝে ধাক্কায় জড়িয়ে পড়ে। কখনও মৃদু, কখনও সজোরে। যেহেতু প্লেটগুলো শিলা দ্বারা গঠিত, তাই ধাক্কার ফলে তাদের মাঝে ঘর্ষণের সৃষ্টি হয়।

এই ঘর্ষণের মাত্রা অধিক হলে এক ধরনের শক্তি নির্গত হয় যা ভূ-স্তরকে প্রকম্পিত করে। যদিও ভূমিকম্পের আরও কারণ বিদ্যমান (যেমন আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ), তবে এই কারণটিই অধিকাংশ ভূমিকম্পের জন্যে দায়ী। ভূমিকম্প বেশী হবার সম্ভাবনা থাকে প্লেট সীমান্তে। যেখানেই দুটো প্লেটের সংযোগস্থল রয়েছে সেখানেই ঘর্ষণ সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা থাকে এবং এর ফল স্বরূপ সৃষ্টি হয় ভূমিকম্পের। ভূমিকম্পের কেন্দ্রে কম্পনের তীব্রতার মাত্রা সর্বোচ্চ হয়। কেন্দ্র থেকে দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে কম্পনের তীব্রতাও কমতে থাকে। ভূমিকম্প রোধ কিংবা আগাম পূর্বাভাসের কোন ব্যবস্থা নেই। যে কারণে একবিংশ শতাব্দীতে মানবসভ্যতার জন্য অন্যতম বড় হুমকি এই ভূমিকম্প।

ভুমিকম্প কেন হয়ে থাকে?

বিশেষজ্ঞদের মতে গোটা ভূপৃষ্ঠই কয়েকটি স্তরে বিভক্ত। আবার প্রতিটি স্তর একাধিক প্লেটে বিভক্ত। এসব বিশাল আকারের টেকটোনিক প্লেটগুলো যখন একের সঙ্গে অপরে ধাক্কা খায় তখন কেঁপে ওঠে মাটির নীচের তলদেশ। আর আমরা ভূপৃষ্ঠের ওপর ভূকম্পন অনুভুত করি।

ভূমিকম্পের কারণ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভূপৃষ্ঠের উপরের স্তরে অনেকগুলো প্লেট আছে এগুলো আবার অনেকগুলো সাবপ্লেটে বিভক্ত। এগুলো সবসময় নড়াচড়া করছে। একটার সঙ্গে আরেকটার ঘর্ষণে এই ভুকম্পনের সৃষ্টি হয়। আবার আগ্নেয়গিরির কারণে ভূ অভ্যন্তরের ভেতর থেকেও ভুকম্পনের সৃষ্টি হয়ে থাকে। আবার কোন কোন এলাকায় ভূপৃষ্ঠের গভীর থেকে অতিরিক্ত পানি কিংবা তেল ওঠানোর ফলে ভূপৃষ্ঠের অবস্থানের তারতম্য ঘটে।’

রিকটার স্কেল কি?

বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিদিনই ভূপৃষ্ঠের ভেতরে কোথাও না কোথাও ভূমিকম্পের সৃষ্টি হচ্ছে৷ তবে সবগুলো অত জোরালো নয়৷ ভূমিকম্পের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে জমে থাকা শক্তি নির্গত হয়৷ এই শক্তিকে মাপা হয় রিখটার স্কেলের মাধ্যমে৷ সাধারণত ভূমিকম্পকে ১ থেকে ১২ মাত্রা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়৷ ৩ থেকে ৪ মাত্রার ভূমিকম্প বোঝা গেলেও ক্ষয়ক্ষতি তেমন হয় না৷ তবে ৫ কিংবা ৬ পর্যন্ত পৌঁছে গেলেই সেগুলোকে উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে ধরা হয়৷ রিখটার স্কেলের এক মাত্রা পার্থক্যের অর্থ হচ্ছে আগেরটির চেয়ে পরেরটি ভূত্বকের ভেতর ৩২ গুন বেশি শক্তিশালী৷ তবে ভূপৃষ্ঠে এই তীব্রতার পরিমাণ হয় ১০গুন বেশি৷

বাংলাদেশে ভূমিকম্প

দুর্ভাগ্যবশত: আমাদের বাংলাদেশ ভারতীয়, ইউরেশিয় এবং মায়ানমার টেকটনিক প্লেটের মাঝে আবদ্ধ। ফলে এই প্লেটগুলোর নাড়াচাড়ার ফলে আমাদের দেশে মাঝেমাঝেই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। তাছাড়া ভারতীয় এবং ইউরেশিয় প্লেট দুটো হিমালয়ের পাদদেশে আটকা পড়ে রয়েছে এবং ১৯৩৪ সনের পর তেমন কোন বড় ধরনের নাড়াচাড়া প্রদর্শন করেনি। এ কারণে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছে এই প্লেট দুটো হয়তো নিকট ভবিষ্যতে নড়ে উঠবে যা বড় ধরনের ভূমিকম্পের কারণ হবে।

টেকটনিক প্লেটের অবস্থান দেখলে বোঝা যায় যে আমাদের উত্তর ও পূর্বে দুটো বর্ডার বা টেকনিকাল ভাষায় ‘ভূ-চ্যুতি’ রয়েছে যা বাংলাদেশের ভূমিকম্পের কারণ। এজন্যে বাংলাদেশের উত্তরপূর্বাঞ্চল তথা সিলেট এবং ততসংলগ্ন এলাকা প্রবল ভূমিকম্প প্রবণ। এর পরের অংশগুলোও যেমন ঢাকা ও রাজশাহী শহরও ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা।

১৮৯৭ সনের ১২ জুন ৮.৭ মাত্রার ‘দ্যা গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’ ভারতবর্ষকে আঘাত হানে যা আজও পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ভূমিকম্প হিসেবে পরিচিত। এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল ভারতের শিলং শহর তবে এর প্রভাব বর্তমান বাংলাদেশ সহ বহু দূর পর্যন্ত অনুভূতি হয়েছিল। সে সময়ের ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন মিশনারীদের বিল্ডিং ভেঙে পড়েছিল এই ভূমিকম্পের কারণে। এছাড়াও ঢাকায় ৪৫০ জনের মত নিহত হবার খবর পাওয়া গিয়েছিল যা সেই সময়ের তুলনায় রীতিমত অনেক বড় সংখ্যা।

এ ভূমিকম্পগুলোর একটা বৈশিষ্ট্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মোটামোটি প্রতি একশ বছর পরপর এই অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ১৯১৮ সন ছিল সর্বশেষ বড় ভূমিকম্পের বছর। এরপর প্রায় একশ বছর কেটে গিয়েছে কিন্তু আর কোন বড় ভূমিকম্প আঘাত করেনি বাংলাদেশকে যা বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে।

অনেক আবহাওয়াবিদ এটাও মনে করেন যে ছোটছোট ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের বার্তা বহন করে। সে হিসেবে বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্প যে কোন সময় আঘাত হানতে পারে। আর যদি সেটা ঘটে, তাহলে সেটার ভয়াবহতা হবে মারাত্মক।

তবে স্মরণকালের ইতিহাসে ২৫ এপ্রিল শনিবার বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ভুমিকম্প হয়েছে বলে মানছেন আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা। এদিন ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে।

এই ভূমিকম্প উৎপত্তি হয়েছে নেপালের লামজং স্থান থেকে। একইসাথে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, ভুটানে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।

ফোবানি/হামিদ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন