একটি বেলুন সত্য মনোভাব ও আমাদের মুল্যবোধ: প্রাসঙ্গিক আলোচনা

133
balloon_values

বেলুন একটি সত্য মনোভাব – কথাটি এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। তবুও একটি বেলুন সম্পর্কিত গল্পের ভুমিকা দিয়ে শুরু করতে চাই।

এক  ব্যক্তি  মেলাতে বেলুন বিক্রি করতেন। একদিন একটি ছোট্ট ছেলে লোকটিকে জিজ্ঞেস করলো, কালো রঙের বেলুন কি আকাশে উড়ে? তখন বিক্রেতা বাচ্চাটিকে উত্তর দিল, “ভাই, বেলুন তার রঙের জন্য আকাশে উড়ে না। বেলুনের মধ্যে হিলিয়াম গ্যাস এর জন্য আকাশে উড়ে। বেলুনের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে না ভেবে আসুন বেলুন ও মানুষের মুল্যবোধ নিয়ে শুরু করি।

আমাদের বেলুন মুল্যবোধ

মানুষের জীবনেও একথা সত্য। আমাদের ভেতরের যে জিনিসটা আমাদের উপরে উঠতে সাহায্য করে তা আমাদের মনোভাব। মনোভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। ব্যক্তি জীবন, জীবিকার অর্থাৎজীবনের সমস্থ ক্ষেত্রে এই বেলুন মনোভাবের গুরুত্ব অনেক। স্ব স্ব ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের উপযোগী মনোভাব না থাকলে কেউই তার কর্তব্য যথাযথ ভাবে  পালন করতে পারেনা। তাই যে জীবিকা আপনি পছন্দ করুন না কেন, সাফল্যের ভিত্তি হচ্ছে আপনার মনোভাব বা দৃষ্টি ভঙ্গি ।

হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয় এর উইলিয়াম জেমস বলেছেন, “আমাদের প্রজম্মের সর্বশেষ্ট আবিষ্কার হল এই যে, মানুষ মনোভাবের পরিবর্তন ঘটিয়ে তার জীবন যাত্রার পরিবর্তন ঘটাতে পারে।“

একই বিশ্ববিদ্যালয় এর এক সমিক্ষায় দেখা গেছে যে, শতকরা ৮৫ টি ক্ষেত্রে প্রার্থীরা চাকরি পায় তাদের মনোভাব এর কারনে। আর শতকরা ১৫টি ক্ষেত্রে পায় অনেক তথ্য ও সংখ্যাতত্ত্ব  জানে এবং বেশ চালাক-চতুর বলে। শিক্ষাখাতে যা ব্যয় হয় তা বিপুল কিন্তু সে শিক্ষা কেবল তথ্য ও সংখ্যাতত্ত্ব মুখস্ত করায়। এই শিক্ষা জীবিকা অর্জনের সাফল্যের ক্ষেত্রে মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ দায়ি।

প্রধানত তিনটি উপাদান আমাদের মনোভাব গঠন করতে সাহায্য করে। সে তিনটি হল- পরিবেশ, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা। এর মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। প্রকৃত শিক্ষায় বুদ্ধিবৃত্তি  ও হৃদয়বৃত্তি দুইই সম্ভব। একজন অশিক্ষিত চোর মালগাড়ি থেকে চুরি করে, কিন্তু একজন শিক্ষিত চোর পুরো রেলপথটাই চুরি করে নিতে পারে।

জন হপকিন্স বিস্ববিদ্যালয় এর প্রেসিডেন্ট স্টিভেন মুলার বলেন,  “বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অতীব দক্ষ বর্বর তৈরি করছে, কারন আমরা তরুণদের কোনও মুল্যবোধের শিক্ষা দিচ্ছিনা, যদিও তারা ক্রমাগত সেই মুল্যবধের অনুসন্ধান করে চলছে। অথচ গ্রেড পাওয়ার জন্য না,আমাদের প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত জ্ঞান ও মূল্যবোধ এর জন্য।

পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবি, আমরা চাই বা না চাই পরিবর্তন আসবেই। আমাদের প্রজন্মের অনেক দেখা হয়ে গেছে এবং অবস্থানির্ভর মুল্যবোধ এর ফলে ক্ষমতাবান গোষ্টিগুলোর ক্ষতি হয়েছে। অন্যায় করে ধরা পড়লে আজকাল দুঃখিত হয় না, আবার অন্যায়ের জন্য অনুশোচনাও নয়। যে কোন সমাজে অসততা এবং অবিচার হতাশার সৃষ্টি করে। যারা মুল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ তারা লোভী এবং অবিবেচকদের অর্থনৈতিক কাজকর্ম বন্ধ করবে।

১৯৫৮ সালে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষকদের মধ্যে একটি সমীক্ষায় প্রশ্ন করা

হয়েছিল-

“আপনার ছাত্রদের প্রধান সমস্যাগুলো কি কি?”

উত্তর ছিল-

  • বাড়িতে যা কাজ দেয়া হয়, তা করেনা।
  • জিনিসপত্রের প্রতি মমতা নেই।
  • পড়ালেখায় মন নেই।
  • ঘরে থুথু ফেলে।
  • ঘরের আলো জালিয়া রাখে, অপচয় করে।

৩০ বছর (এক প্রজন্ম) পরে ১৯৮৮ সালে এই সমীক্ষার একি প্রশ্নের উওর আশ্চর্যজনকভাবে ভিন্ন। বর্তমানে  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান সমস্যাগুলো এরূপ-

  • মাদকাসক্তি
  • ধর্ষণ
  • অস্ত্রবাজি
  • হিংসাত্ত্বক হত্যা, মারামারি
  • গর্ভপাত

কেউ কেউ মনে করেন যে, দায়িত্বজ্ঞান, সততা, অঙ্গীকারাবদ্ধতা, দেশপ্রেম- এই মুল্যবোধ গুলো পুরনো হয়ে গেছে। এগুলো পুরোনো হতে পারে কিন্তু অপ্রচলিত নয়। এই মূল্যবোধ সময়ের পরিক্ষায় উত্তীর্ন। এবং  চিরকাল মানুষের সমাজে প্রচলিত থাকবে।

এই মূল্যবোধ সর্বত্র একই রকম। এগুলো সার্বজনীন। ইতিহাসে এমন সময় বা সভ্যতার কথা জানা নেই, যেখানে এই মূল্যবোধ গুলোকে শ্রদ্ধা করা হয়নি।

“সফল মানুষ হওয়ার চেষ্টা করার থেকে, মুল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হওয়ার চেষ্টা কর” –আলবার্ট আনস্টাইন।

একটি বেলুন সত্য মনোভাব ও আমাদের মুল্যবোধের সাদৃশ্যতা খোজার এই অপচেষ্টার প্রয়াসের সার্থকতা কতটুকু যৌক্তিক তা সময়ই বলে দেবে – এই বিশ্বাস নিয়ে শেষ করছি। সবাই ভালো থাকবেন। ফোকাস বাংলার সাথেই থাকবেন। ধন্যবাদ।

তাহমিনা আহাদ রোজি


লেখক, সংগঠক, বাংলাদেশ ওমেন চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি, সিলেট।

 

ফোবানি/হামিদ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন