কেমন বাংলাদেশ দেখতে চাই – প্রবাসীদের ভাবনায় প্রিয় স্বদেশ

144
bangladesh

বাংলাদেশ, প্রিয় স্বদেশ আমার। দেশের ভাবনায় প্রবাসীরাও বসে নেই। সুদূর প্রবাসে বসে এই ঐক্য স্থাপনের প্রচেষ্টায় এক প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে কানাডার ২৪ ঘণ্টার প্রথম বাংলা টেলিভিশন এনআরবি টিভি। গত জানুয়ারিতে টরন্টোর ড্যানফোর্থের এক্সেস পয়েন্ট কমিউনিটি সেন্টারে এনআরবি টিভির উদ্যোগে ‘কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান’ শীর্ষক সংলাপটি  অনুষ্ঠিত হয়।একই মঞ্চে দেখা গেল বাংলাদেশের  সাবেক ছয়জন ছাত্রনেতা, যাঁরা এখনও  প্রতিটি শব্দে বাংলাদেশের মানচিত্রকে ধারণ করেন। প্রবাসের প্রতি মুহূর্তের ব্যস্ততার মাঝেও ভাবেন, আলোচনা করেন এবং লিখেন দেশ মাতৃকার ভালো-মন্দ। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, শুধু সমালোচনা নয়, আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়নে ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো তুলে আনা।

বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্যরা এক মঞ্চে উপবিষ্ট হয়ে দেশের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে পারস্পরিক আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধানের উপায়গুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন – এমন দৃশ্য ভাবনায় আনাটাই যেন আজ ভয়ানক এক স্বপ্ন দেখা। অথচ যে সমন্বয়ের চিত্র দেখা যেতে পারতো আমাদের জাতীয় সংসদে – দেশের সর্বদলীয় নেতা এবং প্রতিনিধিগণ সুস্থধারার আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে ঐক্যমতে পৌঁছে দেশকে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কেননা দল এবং মতে ভিন্নতা থাকলেও দেশটি সবার। দেশের বৃহত্তর স্বার্থ এবং উন্নয়ন দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে হওয়াটাই বাঞ্চনীয়।

আর দেশের এই বর্তমান রাজনৈতিক দলাদলি-সংস্কৃতির পুরোটাই দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই প্রবাসেও বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একইভাবে বিদ্যমান থাকতে দেখা যায়। পারস্পরিক মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও সহিষ্ণুতা যেন অচিন পাখির মতোই আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু বিশ্বের মুক্ত বাতাসে দাঁড়িয়ে আমাদের এই মানসিকতায় নিশ্চয়ই পরিবর্তন আসা প্রয়োজন।

মঞ্চে উপবিষ্ট আলোচকদের সাথে দর্শকদের সরাসরি প্রশ্ন-উত্তর নিয়ে আয়োজনের পরিকল্পনায় দর্শকমঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কানাডায় বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিগণ। আলোচকমঞ্চকে আলোকিত করে ছিলেন, ডাকসুর সাবেক নির্বাচিত সহ সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি নাসির উদ দুজা, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি মো. সাহাবুদ্দিন লাল্টু, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি শরিফ সালাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হল ছাত্র সংসদের সাবেক নির্বাচিত সদস্য ও ছাত্রলীগ (বাসদ)-এর সাবেক নেতা ব্যারিস্টার কামরুল হাফিজ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি ড. মঞ্জুরে খোদা টরিক ও ছাত্রলীগ (বাসদ)-এর সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা আনোয়ার হোসেন মুকুল।

প্রশ্ন এবং উত্তর নিয়ে আলোচনা  কেন্দ্রীভূত ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনা, গণতন্ত্রের সুপ্রতিষ্ঠা,  দেশের প্রাত্যহিক কিছু সমস্যা, উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় ঐক্যমত নিয়ে। বিশেষত, নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার রায়, গাইবান্ধার এমপি লিটন হত্যা, রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের আহ্বান এবং যানজট। দর্শকদের প্রশ্নের উত্তরে আলোচকবৃন্দ তাঁদের অভিজ্ঞতার আলোকে সুচিন্তিত এবং পরিশীলিত মতামত ব্যক্ত করেন।

নারায়ণগঞ্জের সাতখুনের মামলার রায় নিয়ে আশাবাদী হলেও, সবার বেলায় একই আইন প্রযোজ্য হওয়া উচিত বলে অভিমত ব্যক্ত করেন অভিজ্ঞ প্রবীণ ছাত্রনেতা শরীফ সালাম। আনোয়ার হোসেন মুকুল এই বিচারের রায় যেন শুধু ‘রাজনৈতিক চমক’ না হয় বলে মত প্রকাশ করেন। ভারতের সাম্প্রতিক এক আইনের উদাহরণ দিয়ে তিনি আরও বলেন, সরকারের সমালোচনা দেশদ্রোহিতা নয়। ব্যারিস্টার কামরুল হাফিজ বাংলাদেশে সুশাসন এবং অগ্রগতির ক্ষেত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। ড. মঞ্জুরে খোদা টরিক তাঁর বক্তব্যে বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় ঐক্যমত তখনই আসবে যখন দেশে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। আইনের শাসন গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি।

জনসমর্থিত রায়ের জন্য সরকারকে অভিনন্দন জানান নাসির উদ দোজা। তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন এবং তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের  মূল দাবিদার হচ্ছে তরুণ সমাজ। এক প্রশ্নের উত্তরে মো. সাহাবুদ্দিন লাল্টু একটি প্রয়োজনীয় কথা বলেন,আমাদের দেশের রাজনীতি এখন হয়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। আওয়ামীগলীগ চলে শেখ মুজিবকে নিয়ে এবং বিএনপি চলে জিয়াকে নিয়ে। যার দরুন, সব ধরণের আলোচনায় তাঁদের টেনে আনার যে প্রবণতা সেটা না করলেই বরং তাঁদের মর্যাদা এবং সম্মান অক্ষুন্ন থাকবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

বিভিন্ন মতাদর্শের এই সাবেক ছাত্রনেতাদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় যে সারমর্মটি উঠে আসে, তা হলো, গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা, সমাজের সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় ঐক্যমতের মাধ্যমে সরকার পরিচালিত হলে বাংলাদেশ উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে দ্রুত এগিয়ে যাবে।

অনুষ্ঠানের সার্বিক সঞ্চালনা এবং সুনিয়ন্ত্রিত কাঠামোতে ধরে রাখাতে সঞ্চালক এনআরবি টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল হালিম মিয়ার দক্ষতা প্রশংসনীয়। অনুষ্ঠানটির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন এনআরবি টিভির প্রধান নির্বাহী শহিদুল ইসলাম মিন্টু। তিনি এই উদ্যোগের ধারাবাহিক আয়োজনের ব্যাপারে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। সেই সাথে আমরা দর্শকরাও আশাবাদী হতে চাই, এই ইতিবাচক উদ্যোগ অব্যাহত হোক এবং আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুস্থধারার রাজনীতি ও পরমত-সহিষ্ণুতার চর্চা গড়ে উঠুক।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন