বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অমর কবিতা ‘স্বাধীনতা’- এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো

131
bongobondhu_sheikh_mujib

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৭তম জন্মদিন ১৭ মার্চ শুক্রবার।দিনটি জাতীয় শিশু দিবসও। বাঙ্গালীর স্বাধীকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবন তাঁকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে। তার সংগ্রামী চেতনা রাজনৈতিক অঙ্গনে যে গভীর প্রভাব ফেলেছে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে; তেমনি তা সাহিত্য অঙ্গনেও আলোড়িত হয়েছে। সমসাময়িক সাহিত্যিকদের লেখায় শেখ মুজিব উঠে এসেছেন নানা ভাবে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কবি-সাহিত্যিকরা তাদের লেখায় বঙ্গবন্ধুকে ফুটিয়ে তুলেছেন অসাধারণভাবে।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কবিতাগুলো কেবল ব্যক্তিকেই প্রতিফলিত করেনি, কোন কোন কবিতা সময়কে ধারণ করেছে অসাধারণভাবে; আবার একইভাবে সময়ের গন্ডি পেরিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল- গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা ‘শোনো একটি মুজিবুরের থেকে’ কবিতাটি, যা গান হিসেবে এখনো সমান জনপ্রিয়। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে/লক্ষ্য মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি/আকাশে বাতাসে উঠে রণি।/বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।’ বাঙ্গালীদের হৃদয়ে অফুরন্ত আশার সঞ্চার করেছিল।

তেমনি অসম্ভব জনপ্রিয় আরেকটি কবিতা লিখেছেন অন্নদা শংকর রায়। তিনি লিখেছেন- ‘যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা/গৌরি যমুনা বহমান/ততদিন রবে কীর্তি তোমার/শেখ মুজিবুর রহমান।/দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা/রক্তগঙ্গা বহমান/নাই নাই ভয় হবে হবে জয়/জয় মুজিবুর রহমান।’

সব্যসাচী কবি সৈয়দ শামসুল হক তার ‘আমার পরিচয়’ কবিতায় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে লিখেছেন- ‘এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান?/যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান;/তাঁরই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলায় পথ চলি-/চোখে নীলাকাশ, বুকে বিশ্বাস, পায়ে উর্বর পলি।’

আরেক বিখ্যাত কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তার ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে চিত্রিত করেছেন এভাবে- ‘আমি কবি এবং কবিতার কথা বলছি।/সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান কবিতা/সুপুরুষ ভালবাসার সুকণ্ঠ সংগীত কবিতা/জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি মুক্ত শব্দ কবিতা/রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।/আমরা কি তাঁর মত কবিতার কথা বলতে পারবো/আমরা কি তাঁর মত স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো।’

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতি উত্তরে নয়াদিল্লির সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত মনিপুরের অন্যতম শীর্ষ কবি এলাংবম নীলকান্ত তাঁর ‘তীর্থযাত্রা’ গ্রন্থে ‘শেখ মুজিব মহাপ্রয়াণে’ কবিতায় লিখেছেন- ‘হে বঙ্গবন্ধু/নিষ্ঠুর বুলেটের আঘাতে নিহত হয়েছো শুনে/পেরিয়েছি আমি এক অস্থির সময়/খোলা জানালা দিয়ে সুদূর আকাশের দিকে/পলকহীন তাকিয়ে থেকেছি/উত্তরহীন এক প্রশ্ন নিয়ে/বিন্দু বিন্দু রক্ত দিয়ে গড়ে তুলেছিলে স্বদেশ তোমার/কিন্তু এ কোন প্রতিদান পেলে তুমি।’

কবি নির্মলেন্দু গুণ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‘প্রচ্ছদের জন্য : শেখ মুজিবুর রহমানকে’, ‘সুবর্ণ গোলাপের জন্য’, ‘শেখ মুজিব ১৯৭১’, ‘সেই খুনের গল্প ১৯৭৫’, ‘ভয় নেই’, ‘রাজদণ্ড’, ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’, ‘মুজিব মানে মুক্তি’, ‘শেষ দেখা’, ‘সেই রাত্রির কল্পকাহিনী’, ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো’, ‘শোকগাথা : ১৬ আগস্ট ১৯৭৫’, ‘পুনশ্চ মুজিবকথা’, ‘আগস্ট শোকের মাস, কাঁদো’, ‘প্রত্যাবর্তনের আনন্দ’ প্রভৃতি কবিতা লিখেছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার লেখা প্রথম কবিতা ‘প্রচ্ছদের জন্য : শেখ মুজিবুর রহমানকে, ১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর এ কবিতাটি তিনি যখন লেখেন তখন মুজিব কারাগারে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর প্রথম কবিতাটি লিখেছিলেন এ কবি। ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যতরুণ গোষ্ঠীর একুশে স্মরণিকা ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ এ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এটিই ছিল প্রথম প্রতিবাদী কবিতার সংকলন।

নির্মলেন্দু গুণের লেখা কবিতাগুলোর মধ্যে ‘স্বাধীনতা- এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো’ বিশ জনপ্রিয়। যেখানে তিনি লিখেছেন- ‘ব্যাকুল প্রতীক্ষা, শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে, জনসমুদ্র,/গণসূর্য্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি :/‘এবারের সংগ্রাম- আমাদের মুক্তির সংগ্রাম?/এবারের সংগ্রাম- স্বাধীনতার সংগ্রাম’।/সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের’।

কবি শামসুর রহমানের ‘ধন্য সেই পুরুষ’ কবিতায় বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ওঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন- ‘ধন্য সেই পুরুষ, যার নামের ওপর পতাকার মতো/দুলতে থাকে স্বাধীনতা,/ধন্য সেই পুরুষ, যার নামের ওপর ঝরে/মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।’

মার্কিন লেখক রবার্ট পেইনের ‘দি চর্টার্ড এন্ড দ্য ডেমড’, সালমান রুশদীর ‘মিড নাইট বিলড্রেম’ এবং ‘শেইম’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্ব পশ্চিম’, জাপানি কবি মাৎসুও শুকাইয়া, গবেষক ড. কাজুও আজুমা, প্রফেসর নারা, মার্কিন কবি লোরি এ্যান ওয়ালশ, জামান কবি গিয়ার্ড লুইপকে, বসনিয়া কবি ইভিকা পিচেস্কি ও ব্রিটিশ কবি টেড হিউজসহ বিভিন্ন বিদেশি লেখকদের কবিতায় বঙ্গবন্ধু উপস্থাপিত হয়েছেন নানাভাবে। এছাড়া ভারতীয় ও পাকিস্তানি প্রচুর কবিই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক কবিতা রচনা করেছেন।

পাকিস্তানের পাঞ্জাবি কবি আহমেদ সালিম পাঞ্জাবি ভাষায় ‘বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক এবং সোনার বাংলা’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কবিতা লিখে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে লাহোর ডিস্ট্রিক্ট জেলে বসে তিনি ‘সিরাজউদ্দৌল্লাহ ধোলা’ কবিতাটি লিখে উৎসর্গ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর নামে। কবিতাটিতে তিনি সিরাজউদ্দৌল্লাহ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে বর্ণনা করেন।

ভারতের উর্দু কবি কাইফি আজমী ‘বাংলাদেশ’ কবিতায়, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান সাহিত্যিক আবিদ খানের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা ‘সিজনাল এডজাস্টমেন্ট’ উপন্যাসে প্রসঙ্গক্রমেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কথা ওঠে এসেছে।

মার্কিন সাংবাদিক এবং ঔপন্যাসিক এ্যানি লোপা তার স্মৃতিচারণে বলেছিলেন- ‘শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল ঘরোয়া পরিবেশে। একবারও মনে হয়নি এতো বড় একজন নেতার সামনে বসে আছি। বন্ধু সুলভ মুজিব নিজে চা-এর কাপ তুলে দিলেন আমার হাতে। এমন অসাধারণ মনের পরিচয় পাওয়া কঠিন। আমার সাংবাদিক জীবনে পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরেছি, বহু নেতানেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি, কিন্তু বাংলাদেশের শেখ মুজিবের মতো এমন সহজ-সরল মানুষ আর পাইনি।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন- ‘আজকের দিন যদি ব্যর্থ হয় তাহলে আছে কাল, একশ মুজিব যদি মিথ্যে হয় তবুও থাকে সত্য।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিভিন্ন সময় অসুস্থ কবি-সাহিত্যিককে সুচিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠিয়েছিলেন। এর মধ্যে একজন ছিলেন মহাদেব সাহা। যিনি বার্লিনে চিকিৎসাকালীন সময়ে বুঝতে পেরেছিলেন বাংলাদেশ থেকেও বঙ্গবন্ধু নামটি কতটা জনপ্রিয়। ‘আমি কি বলতে পেরেছিলাম’ কবিতায় তিনি লিখেছিলেন- ‘তাই আমার কাছে বার্লিনে যখন একজন ভায়োলিন বাদক/বাংলাদেশ সম্বন্ধে জানতে চেয়েছিল/আমি আমার দুপকেট থেকে ভাঁজ করা একখানি দশ/টাকার নোট বের করে শেখ মুজিবের ছবি দেখিয়েছিলাম/বলেছিলাম, দেখো এই বাংলাদেশ।’

কবি আবু জাফর শামসুদ্দিনও তার ‘আরেক ভুবন : সোভিয়েত ইউনিয়ন’ গ্রন্থে লিখেছিলেন যে ওই দেশের মানুষ কিভাবে বাংলাদেশ বলতে বঙ্গবন্ধুকেই চিনে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকরা তাদের হতাশার কথা ব্যক্ত করেছেন। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী উইলি ব্রান্ট বলেছিলেন- মুজিব হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না।

কবি শামসুর রাহমানও তার ৭৫ লাইনের ‘ইলেকট্রার গান’ কবিতায় নিহত জনক, এ্যাগামেমনন্, কবরে শায়িত আজ। লাইনটি ১৫ বার লিখেছিলেন। তার ভাষায়- ‘নন্দিত সেই নায়ক অমোঘ নিয়তির টানে/গরীয়ান এক প্রাসাদের মতো বিপুল গেলেন ধসে।/বিদেশী মাটিতে ঝরেনি রক্ত; নিজ বাসভূমে,/নিজ বাসগৃহে নিরস্ত্র তাঁকে সহসা হেনেছে ওরা।’

এছাড়াও কবি জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামাল, হাসান হাফিজুর রহমান, বনফুল, বুদ্ধদের বসু, অমিয় চক্রবর্তী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত, কবীর চৌধুরী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আবদুল গাফফার চৌধুরী, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আবুল হোসেন, রোকনুজ্জামান খান, শহীদ কাদরী, বেলাল চৌধুরী, রফিক আজাদ, মুহম্মদ নুরুল হুদা, আসাদ চৌধুরী, বেবী মওদুদ, লুৎফর রহমান রিটন, আবু হাসান শাহরিয়ার, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, রুবী রহমান, নাসির আহমেদ, অসীম সাহাসহ অনেক বিখ্যাত কবির কবিতায় বঙ্গবন্ধু চিত্রিত হয়েছেন তার কর্মের মহিমায়।