দুর্যোগ কি? বাংলাদেশে দুর্যোগ পরিস্থিতি ও মোকাবেলায় জনসচেতনতা প্রয়োজন

4059
what_is_natural_disaster

দুর্যোগ কি?

সাধারনভাবে দুর্যোগ (Disaster) বলতে আমরা বুঝি প্রাকৃতিক বা মানব সৃষ্ট এমন ঘটনা যা মানুষের এবং সমাজের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পরিবেশকে গভীরভাবে ব্যাহত করে। এবং যার ফলে মানব সম্পদ ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। দুর্যোগের ফলে অর্থনৈতিক ও পারিপাশ্বিক অবস্থার ওপর সুদূর প্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে বিপর্যস্ত জনগোষ্ঠির নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে এইরূপ পরিস্থিতিতে টিকে থাকার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

দুর্যোগের প্রকারভেদ

দুর্যোগ দু’ধরনের

১। প্রাকৃতিক দুর্যোগ (Natural Disaster): ঘুর্নিঝড়, বন্যা, ভুমিকম্প, ভুমিধস, নদী ভাঙ্গন, সামুদ্রিক জলোচ্ছাস,সুনামী, খরা, মহামারি, আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, আর্সেনিক দুষন, শৈত্য প্রবাহ ইত্যাদি

২। মানব সৃষ্ট দুর্যোগ (Man made Disaster):নৌ-দর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা, যুদ্ধ, পুশ-ইন বা স্থানচ্যুতি, পরিবেশগত অবনতি, অগ্নিকান্ড, দাবানল, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ইত্যাদি।

বাংলাদেশের দুর্যোগ পরিস্থিতি

ভৌগলিক অবস্থা ও জলবায়ুর কারনে বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি দুর্যোগপ্রবন এলাকা। দুর্যোগের কারনে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টা অনেকাংশেই বাধাগ্রস্থ হয়ে আসছে। শুধৃমাত্র ১৯৯১ সালে ২৯ এপ্রিল দক্ষিনাঞ্চলে ঘটে যাওয়া ঘুর্নিঝড়ে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমান ক্ষতিসাধিত হয় এবং ১ লক্ষ ৩৮ হাজারেরও বেশি লোক মারা যায়। বিগত একশত বছরে অর্ধ শতাধিক প্রলয়ংকরী ঘুর্নিঝড় এদেশে আঘাত হেনেছে এবং গত পঞ্চাশ বছরে ৬০টিরু বেশি বন্যা, ৬টি মহাপ্লাবন হয়েছে। সর্বশেষ বাংলাদেশে সিডরের আঘাতে বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে ঘুর্নিঝড়, জলোচ্ছাস, বন্যা, পাহাড়ী ঢল, ভুমিধস, খরা, নদী ভাঙ্গন, টর্নেডো, সিডর, কালবৈশাখী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ প্রতি বছরই কোন না কোন দুর্যোগে আক্রান্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারনে ভব্যিষতে আরো নতুন নতুন দুর্যোগের সৃষ্টিসহ বর্তমান দুর্যোগগুলোর তীব্রতা ও ধ্বংসযজ্ঞ বৃদ্ধি পাবে।  যেহেতেু বাংলাদেশ বিশেষ করে উপকুলীয় এলাকায় ঘুর্নিঝড় ও জলোচ্ছাস কবলিত এলাকা তাই আমরা এই ঘুর্নিঝড়ের ক্ষ-ক্ষতি সম্পর্কে এবং ঝুঁকি হ্রাসের পদ্বতি জেনে নিতে পারি।

দুর্যোগ মোকাবেলায় জনসচেতনতা

গত কয়েক দশক ধরে বিশ্ব –পরিবেশ তার বিরূপ আচরন প্রদর্শন করে আসছে। এর অন্যতম একটি কারন হচ্ছে বিশ্ব-উষ্ণায়ন। ফলে ঘূর্নিঝড়, জলোচ্ছাস, বন্যা, খরা,ভুমিকম্প,ভুমিধস,নদী ভাঙ্গন, লবনাক্ততা ইত্যাদি দুর্যোগ বিশ্বব্যাপি বেড়েই চলেছে। ম্যাপেল-ক্রাফট বিশ্বের ২২৯টি দেশের বিগত ৩০ বছরের(১০৮০-২০১০) দুর্যোগের ক্ষয়-ক্ষতি বিশ্লেষন করে সর্বোচ্চ ঝুঁকির্পর্ন ৫টি দেশকে চিন্হিত করেছে। দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, চীন ও ভারত। সর্বোচ্চ ঝুঁকির্পর্ন ৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রথম সারির ঝুঁকিপূর্ন দেশ হিসেবে চিন্হিত করা হয়। প্রতি বছরই ঘুর্নিঝড়, জলোচ্ছাস, বন্যা, খরা, ভুমিধস, নদী ভাঙ্গন, লবনাক্ততা ইত্যাদি দুর্যোগ এদেশে বারবার আঘাত হানছে। বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের ফলে মানুষের ঘর-বাড়ি, জায়গা-জমি ও জান-মালের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। এছাড়া দুর্যোগ বিষয়ে বিশেষজ্ঞগন ভুমিকম্পকে ঘনবসতিপূর্ন রাজধানী ঢাকা শহর তথা বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের একটি বড় সমুহ বিপদ হিসেবে দেখছেন। তাই যে কোন ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য ভবিষ্যতে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। এ জন্য সমাজে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচী গ্রহন করা জরুরী। আসুন, আমরা সবাই দুর্যোগ মোকাবেলায় সচেতন হই এবং দুর্যোগে সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমান হ্রাস করি।

দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্বতি

আপদ/বিপদ(Hazard): আপদ একটি অস্বাভাবিক ঘটনা, যা প্রাকৃতিক, মানবসৃষ্ট বা কারিগরি ত্রুটির কারনে ঘটতে পারে। এবং মানুষের জীবন ও জীবিকার ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে থাকে। যেমন: ঘুর্নিঝড়, জলোচ্ছাস, বন্যা, সুনামী,খরা, নদী ভাঙ্গন, ভুমিকম্প,নৌ-দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা, বিস্ফোরন ইত্যাদি। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, আপদ/বিপদ কোন দুর্যোগ নয় বরং দুর্যোগের সম্ভাব্য কারন।

বিপদাপন্নতা(Vulnerability): কোন জনগোষ্ঠির বা তার অংশ(ব্যক্তি ও পরিবার) কোন সুনিদ্দিষ্ট আপদে আক্রান্ত হওয়ার আশন্কা বা উক্ত আপদের প্রভাব অথবা আপদ সংগঠিত হওয়ার সংলগ্ন স্থানের নিকটতম অবস্থানকে বিপদাপন্নতা বলা হয়। কোন ব্যক্তি বা বস্তুর অবস্থান আপদ থেকে যত কাছে হয়ে যায় তার বিপদাপন্নতা তত বেশী।

স্বক্ষমতা(Capability): বিপদাপন্নতা মোকাবেলার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ইতিবাচক সামর্থই হল সক্ষমতা। সামর্থ হচ্ছে সত্যিকার অথবা কাল্পনিক কোন দুর্যোগে উক্ত জনগোষ্ঠির ইতিবাচক উপায়ে সাড়া দেবার শক্তি।

ঝুঁকি(Risk): কোন আপদ ঘটার সম্ভাবনা, প্রকৃতি ও মাত্রা এবং তার ফলে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠির ক্ষতির সম্ভাবনা – এই দু’য়ের পারস্পরিকতাই ঝুঁকি।

ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্বতি: কোনে সমাজে ঝুঁকি হ্রাস ও ক্ষতির প্রভাব কমাতে ওই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠি কতটা সার্থকভাবে নিজেদের স্থানীয় ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সম্পৃক্ত করতে পারবে তার ওপরই সমাজ ও জনগোষ্ঠির টেকসই উন্নয়ন নির্ভর করে।

ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সমীকরন: দুর্যোগ ঝুঁকি x বিপদাপন্নতা / সক্ষমতা

দুর্যোগে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পাঁচটি ভাগ রয়েছে: ঝুঁকি সনাক্তকরন, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, ঝুঁকির অগ্রাধিকার, ঝুঁকি সামলানো এবং পরিবীক্ষণ ও মুল্যায়ন।

ঝুঁকি সনাক্তকরন: ঝুঁকি সনাক্তকরন হলো সম্ভাব্য ঝুঁকি ও হুমকিগুলোকে চিন্হিত করা। এর প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে স্থানীয় জনগনের ওপর ভবিষ্যতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন সম্ভাব্য ঘটনার বিস্তারিত তালিকা তৈরী করা।

ঝুঁকি বিশ্লেষণ: ঝুঁকি বিশ্লষণ একটি পদ্বতি। এর লক্ষ্য হচ্ছে সনাক্তকৃত ঝুঁকির মাত্রা ও প্রকৃতি সম্পর্কে সকলের মাঝে একটি পরিস্কার ধারনা প্রতিষ্ঠা করা। এই বিশ্লেষনের মধ্যে ঝুঁকির উৎস, ঝুঁকির ইতিবাচক ও নেতিবাচক ফলাফল এবং সম্ভাব্য পরিনতি ইত্যাদি বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে।

ঝুঁকির অগ্রাধিকার: ঝুঁকির অগ্রাধিকারকরন প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্যে সবচেয়ে জরুরী বিষয় বা ক্ষেত্রসমূহ বিশ্লেষণ ও চিন্হিত করা। ঝুঁকির মাত্রা, কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, সুনির্দিষ্ট কোনো ঘটনা সংগঠনের ফলাফল এবং বিভিন্ন ঘটনার সম্মিলিত ফলাফলের ওপর নির্ভর করেই সিদ্বান্ত নেয়ার প্রক্রিয়া।

ঝুঁকি নিরসন: নিরসন করা প্রয়োজন এমন সব ঝুঁকির তালিকা ঝুঁকির অগ্রাধিকারকরন পদ্বতি থেকে পাওয়া যায়। ঝুঁকি নিরসন প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রয়োজনীয় কৌশল চিন্হিতকরন, কৌশলসমূহের মুল্যায়ন, ঝুঁকি নিরসন পরিকল্পনা প্রনয়ন এবং এর বাস্তবায়নের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত।

পরিবীক্ষন ও মুল্যায়ন: এই ধাপটির উদ্দেশ্য হলো চিন্হিত বিভিন্ন ঝুঁকিসমূহ এবং ওই সব ঝুঁকি নিরসনের জন্যে গৃহীত কার্যকর ও যথাযথ কৌশলসমূহ এবং ব্যবস্থাপনা পদ্বতি পরিবীক্ষন বা মনিটরিং করা

পরিশেষে শুধু এটুকুই বলবো

“সমাজে যত লোক করি বসবাস, সবাই মিলে করব মোরা দুর্যোগে ঝুঁকি হ্রাস।”

জনস্বার্থে, পরিবেশ, অধিকার, নারী বিষয়ক যে কোন লেখা আমাদের লিখে পাঠান এই ঠিকানায় fbnews2017@gmail.com

ফোবানি/হামিদ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন