তরুন লেখকদের নানাভাই নুর মোহাম্মদ রফিক

13
Nur Mohammed Rofiq

জীবন ক্ষণস্থায়ী। পাখির বাসার মতোই এখানে কয়েকদিনের বাসা বেঁধে থাকতে হয় আমাদের। সঠিক গন্তব্য কোথায় কখন হয়ে পড়ে কেউ জানি না। জানি না তাই বলে থেমেও থাকি না। আমাদের এই থেমে না থাকার প্রচেষ্টা নিরন্তন। আমরা মানুষ। মানবিক গুণে গুণান্বিত হওয়ার সাধনা করে যাই। কেউ কেউ এই সাধনার মাধ্যমে জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকার মতো কিছু করে যাই, রেখে যাই অবিস্মরণীয় স্বাক্ষর। এমনি একজন মানুষ নিয়ে আমার আজকের এই আলোকপাত যাঁকে নিয়ে সত্যিকারে গর্ব করে কিছু বলা যায়, দেশমাতৃকার তরে দান করে যাওয়ার মতো বিশেষ অবদান যাঁর জীবনে খুঁজে পাওয়া যায়।

চট্টগ্রামের তরুণ লেখিয়েদের কাছে ‘নানাভাই’ বিশেষণপ্রাপ্ত বিশিষ্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা, একনিষ্ঠ সাংবাদিক, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার তুখোর ছড়াকার ও ‘চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’ এর একমাত্র প্রণেতা জনাব নূর মোহাম্মদ রফিক’র কথা।চট্টগ্রামের সাহিত্য, শিক্ষিত ও সাংবাদিক মহলে যিনি আপন আলোয় আলোকিত। এক্ষেত্রে তাঁর নতুন পরিচয় দেয়ার সাহস নেই আমার। তবে এই মহান মুক্তিযোদ্ধার সাথে আমার রয়ে গেছে কিছু গভীর স্মৃতি। যে-সব স্মৃতি আজ আমাকে তাঁর খুব কাছে টানে, চোখের সামনে তাঁর হাস্যোজ্জ্বল বদনখানি আয়নার ভেতরের প্রতিবিম্বের মতো ভেসে ওঠে।

চট্টলার এই কৃতি সন্তান নূর মোহাম্মদ রফিক’র সাথে আমার পরিচয় ঘটে লেখালেখির মাধ্যমে উদীয়মান তরুণ লেখক ইলিয়াস বাবরের মাধ্যমে। সেটা ২০১৪ সালের শেষের দিকের কথা। তখন তিনি বসা ছিলেন চট্টগ্রামের বলাকা প্রকাশনার অফিসে। সেই থেকে তাঁর সাথে প্রায়ই দেখা হতো, কথা হতো। আমার কোনো লেখা পত্রিকার পাতায় দেখলে তিনি পড়তেন ও আমাকে জানাতেন। বিভিন্ন পরামর্শও দিতেন। কয়েকবার একসাথে চা-পানের স্মৃতিও রয়েছে। মুক্তোর মতো সাদা দাঁত আর সাদা গোঁফের মুখওয়ালা মানুষটি যখন আদর করে হেসে নাতি-নাতি বলে ডাকতেন, তখন তাঁর সাথে প্রাণের একখানা সুদৃঢ় সেতু বন্ধনের সৃষ্টি হতো। বড় চশমার ভেতর দিয়ে আমাকে যেন ভালো করে দেখতেন। মিষ্টিময় ছিল তাঁর মুখনিসৃত শব্দগুচ্ছ। রসালো ছিল তাঁর সার্বক্ষণিক বচন। রসায়নে ভরপুর মজিয়ে রাখতেন আমার মতো সকল তরুণ লেখিয়েদের। নাতি-নাতি বলে কাছে টেনে নিতেন পরম স্নেহে। আমরাও তাঁর হাতের ছোঁয়া, মুখের বাণী আর চোখের চাহনীতে খুঁজে পেতাম নানার পরম স্নেহে।

বলতে সত্যিই কষ্ট লাগে- এই মিষ্টিমধুর চরিত্রের নায়ক আমাদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ তাঁর বৈরী-জীবনের যবনিকা ফেলে চলে গেলেন আপন নিবাসে।তাঁর এইপ্রস্থান মনে হয়, আমাদের বৈরী পরিবেশের সাথে একপ্রকার অভিমান করে চলে যাওয়া। আর আমাদের জন্য রেখে গেলেন তাঁর অশেষ স্নেহ-ভালোবাসা, উপদেশ-পরামর্শ আর সহযোগিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের শিকার এই মহান মানুষটি নিজের জীবনের পুরোটাই উৎসর্গ করে দিয়েছেন তাঁর পরম ভালোবাসার দেশের জন্য। ২৮ বছর বয়সে এই অকুতোভয় দেশপ্রেমিক অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বাধীনতাযুদ্ধে। যুদ্ধ করেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। এক পর্যায়ে দুর্ভাগ্যক্রমে ১৯৭১ এর ৩০মার্চ তাঁর বাম পায়ে শত্রæপক্ষের বুলেট আঘাত হানে। দেশীয় চিকিৎসায় বুলেট বহিষ্কার সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। হাড়ের সাথে মিলে যাওয়াতে তাঁর চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে। তারপর যুদ্ধ শেষ হয়, তাঁর স্বপ্নের বিজয় অর্জিত হয়। দেশে বিজয়ের পতাকা উড়তে থাকে। তাঁর সংগ্রামী স্বাধীনচেতা মন পতাকার উড়ন্ত ঢেউয়ে খুঁজে পায় এক অনাবিল সুখের ছোঁয়া। তিনি পা হারালেও দেশের মান হারাননি, এটাই যেন তাঁর গর্ব।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্যারিসে পাঠান। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। ফলে তিনি চিরদিনের মতো পঙ্গু হয়ে যান দেশের জন্য অস্ত্র হাতে তুলে শত্রæর সাথে সংগ্রাম করতে গিয়ে। এটাও তাঁর জীবনের একটা বড় গৌরব ছিল।যখনই তাঁর সাথে দেখা হতো, তখনই তাঁর পা থেকে রস ঝরতে দেখতাম। রস-ঝরা পা নিয়ে সারাজীবন খেটে গেছেন মানুষের জন্য, দেশের জন্য। হালিশহর থেকে খ্ুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট করে জামালখানের প্রেসক্লাবে গিয়ে পড়ে থাকতেন। যেন প্রেসক্লাবটাই ছিল তাঁর আরেকটা জীবন। আমার খুব কষ্ট লাগতো তাঁর এই কষ্টময় পথচলা দেখে।

আবদুন নবী খান ও ফুলমেহের খাতুনের ছেলে জনাব নূর মোহাম্মদ রফিক আশির দশকে দৈনিক আজাদীতে যোগ দিয়ে সাংবাদিকতা পেশায় নিজেকে যুক্ত করেন। পরে দৈনিক পূর্বকোণ, ইত্তেফাক, দৈনিক স্বাধীনতা, দৈনিক ঈশান, দৈনিক নয়াবাংলাসহ বেশ কিছু দৈনিকে কাজ করেন।আশির দশকে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন সিইউজের সহ-সভাপতির দায়িত্বে থাকার সময় তিনি বেশ কিছুদিন ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।এছাড়া তিনি বিএফইউজের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ছিলেন। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত বইয়ের মধ্যে ‘চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, চতুষ্পদে (কবিতা), ‘বত্রিশ লিমেরিক, ফাঁন্দে পড়িয়া বগা (কৌতুক), বিশ্ব মনুষ্য বসতি: আসন্ন সংকট (প্রবন্ধ), কালবৈরি’ উপন্যাস উল্লেখযোগ্য।

এই মহান ব্যক্তির সাথে পরিচিতি হতে পেরে বারবার মনে হয়েছে আরো দশ বছর আগে তাঁর সান্নিধ্য কেন পেলাম না। পেলে মনে হয় জীবনের অভিজ্ঞতা আরো সুগভীর হতো। এক নির্ভেজাল মনের ও চরিত্রের মানুষ ছিলেন বৈরীজীবনের এই বৃদ্ধ নায়ক। যিনি জীবন সায়াহ্নে এসেও হেসে গেছেন একগাল নির্মল হাসি। সারাজীবন কুমার থেকেও জীবনকে কর্মমুখর রেখে আমাদের জন্য রেখে গেছেন অগাধ ভালোবাসা আর স্মরণীয় সাহিত্যকর্ম। মোদ্দাকথা, তিনি তাঁর সমগ্র জীবনটাই দেশের তরে উৎসর্গ করে গেছেন। এটাই তাঁর মতো একজন মহান মুক্তিযোদ্ধার শ্রেষ্ঠ অবদান।

‘কালবৈরী’ তাঁর আত্মজৈবনিক উপন্যাস। তাঁর এই উপন্যাসখানি নাগরিকজীবনের এক নিপুণ চিত্রায়ন। এটি এমনই এক জীবন-গাঁথা যা ভাষার মায়াজালে বশীভূত করে পাঠককে নিয়ে যায় বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত।

বইটিতে শুদ্ধ-ভাষার সাথে সাথে হৃদয় ছোঁয়া কিছু আঞ্চলিক ও প্রাঞ্জল শব্দের যুতসই ব্যবহার একজন পাঠককে বড়বেশি মুগ্ধ করে। আঞ্চলিক শব্দগুলোর ব্যবহার পাঠকের তৃষিত মনে এনে দেয় অনাবিল এক পাঠানুভূতি। বইটিতে লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদের প্রেম নেই কিন্তু পাঠককে যথেষ্ট পরিমাণে আকৃষ্ট করার মতো বিরহ রয়েছে। যে-বিরহ একজন পাঠককে মানুষ হিসেবে যথেষ্ট ভাবিত করে দাঁড় করায় জীবনবোধের বাস্তবতার দুয়ারে।

বইটিতে নাগরিক জীবনের আনাচে-কানাচে একজন শহরবাসী মানুষের দীর্ঘ জীবনদৃষ্টি জোনাকির মতো জ্বলে উঠেছে। সেই জ্বলে ওঠা আলোয় দেখা যায়- কীভাবে গল্পের নায়ক শহরকে দেখেছে এবং আজো দেখছে শহরের আচার-ব্যবহার আর ক্রমাগত পরিবর্তন। নায়কের চোখের সামনে বদলে যায় তাঁর প্রিয় শহরের চেহারা। সেই পরিবর্তিত শহুরেজীবনের সাথে তাঁর ওঠা-বসা কেমন হয়, কেমন হয়ে ওঠে তাঁর হৃদয়ের আকুতি?

গলিতে-গলিতে মসজিদ, মন্দির, বড়ো বড়ো রাস্তা, বিশাল মার্কেট, আধুনিক জীবনযাত্রা সবই আছে নায়কের হৃদয়তুল্য শহরে। শহরের রাতারাতি যে উন্নতি হয় তাও নয়নের তৃপ্তি মিটিয়ে দেখে নায়ক। অনেক ভারিক্কী বুদ্ধি-সম্পন্ন নায়কের বয়স একটু বেশি হলেও বোঝা যায়, কপালের ভাঁজের মতো বৈরীকালের বুকে তাঁর চঞ্চলা মনটায় এখনো বিন্দু পরিমাণও ভাঁজ পড়েনি।

কাহিনীর ধাপে ধাপে শব্দের ফ্রেমে ছবি হয়ে ওঠে নায়কের বাড়িঘরের অবস্থা, বইয়ের প্রতি অকৃত্রিম প্রেম আর কৌতুহলী দৈনন্দিন জীবন। সহজেই পাঠক বুঝতে পারে কতটুকু গোছানো তাঁর নির্মোহ জীবন। জীবনবোধে তাঁর রুচিশীলতা, চিন্তা-ভাবনার স্বাধীনতা, দেশের প্রতি নিখাদ প্রেম, সমাজের প্রতি সুনিবিড় দৃষ্টি অনেক বেশি বিস্তৃত যা একজন সাধারণ পাঠককে নিয়ে যায় অসাধারণ এক অনুভূতি-উপলব্ধির জগতে। প্রগতিশীল নায়কের সৃজনশীল শুদ্ধদৃষ্টি পাঠকমনকে সহজেই ঋদ্ধ করে তোলে।

চলমান জীবন সমন্ধেও রয়েছে নায়কের যথেষ্ট দার্শনিকদৃষ্টি। বইটিতে যে-সমস্ত দর্শন খুঁজে পাওয়া যায় সে-সবের মধ্যে একটি এমন- “এ দুনিয়ায় যারা ঠকা খেতে এসেছে তাদেরকে সারাক্ষণ পাহারায় রেখে পথ দেখাবে কে?” এমনি করে জীবনের আনাচে-কানাচে নায়কের গভীর দার্শনিকদৃষ্টি গিয়ে পড়ে সু²ভাবে।

আসলেই এ জগতটা সবার জন্য সমান নয়। রঙধনুর এই জগতে কারো জীবন দেখে এমনও মনে হয় যেন তারা শুধু ঠকবার জন্যই জগতে এসেছে। নায়কের এই ধারণা সাধারণ পাঠকের মনে ভাবনার সৃষ্টি করে দুর্ভাগা মানুষদের জীবন সম্পর্কে নান্দনিক দৃষ্টি খুলে দেয়।

একটা জায়গায় সমাজ জীবনের অন্ধত্বের বিরুদ্ধে নায়কের প্রখর অনুভূতি এরকম একটি চরম উক্তির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়-“জানালার ধারে টবে রাখা চক্ষুকর্ণহীন সামান্য একটি লতিকাও যদি আলোর সন্ধানে বাইরে বেরোনোর পথ খোঁজে অবিরাম, তবে সৃষ্টির সেরা মানুষ কেন চোখকান বুজে অন্ধকারে বুঁদ হয়ে থাকবে, আলোর অভিসারী হবে না?”

তারপরে আমাদের সমাজে যে-কুসংস্কার জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য দায়ী, সেই কুসংস্কারও উঠে এসেছে কাহিনীর ধারাবাহিকতায়। একবিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগেও যে মানুষ কী পরিমাণ অন্ধবিশ্বাসী তারও রয়েছে স্পষ্ট ছাপ! আমাদের সমাজবৃক্ষের ডালে ডালে ঝুলে আছে কুসংস্কার, অপ্লবিদ্যা আর ভন্ডামির রংবাহারী বিষাক্ত ফল! সহজ-সরল সাধারণ মানুষেরা সেই বিষাক্ত ফল প্রতিদিন ভোজন করে জীবনের বারোটা বাজিয়ে যাচ্ছে।

বইটি এমন এক রুচিশীল সাহিত্যখন্ড যা পাঠকের কাছে চট্টগ্রাম শহরের ধারণা লাভের পাঠযোগ্য এবং সংগ্রহে রাখার মতো। বইটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য আধুনিক নগরায়ণের আলোকিত দিনেও নায়কের বুকফাটা বৈরিতা। কী নিয়ে সেই বৈরিতা? বিস্তারিত জানতে কার না ইচ্ছে করে নূর মোহাম্মদ রফিক রচিত- ‘কালবৈরী’ উপন্যাস পড়তে?

সূত্র:

১। দৈনিক আজাদী

২। বাংলা নিউজ২৪.কম

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন