তথ্য অধিকার আইন ও আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস। তথ্যই শক্তি, তথ্যই উন্নয়ন।

২০১৬ সাল পর্যন্ত মোট ১১৩ দেশে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর করা হয়।১৭৬৬ সালে বিশ্বে তথ্য অধিকার স্বীকৃতি পায় সুইডেনে এবং ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে তথ্য অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬৬ সালে Freedom of Information Act প্রনয়ন করে।

230
right_to_information_act_2009

২৮ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস। গেলো বছর এ দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘তথ্য পেলে মুক্তি মেলে, সোনার বাংলার স্বপ্ন ফলে’। এ দিবস উপলক্ষে ওসমানী মিলনায়তনে আলোচনা সভায় রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ বলেন, ‘তথ্য শক্তি’। সঠিক তথ্য অমুল্য সম্পদ। তথ্য মানুষকে সর্বদাই সচেতন করে এবং সঠিক সিদ্বান্ত নিতে সাহায্য করে’।

তথ্য অধিকারের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগন ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের নাগরিকদের তথ্য অধিকার সংবিধান দ্বারা সংবদ্ধ। ২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন প্রাতিষ্ঠানিক রুপ লাভ করে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরনের মাধ্যমে রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তথ্য অধিকার আইন এর ভুমিকা অপরিসীম। গনতান্ত্রিক অধিকার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে দৃঢ় অঙ্গিকার বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার জনগনের ক্ষমতায়নের জন্য তথ্য জানার অধিকার একটি প্রয়োজনীয় অনুসঙ্গ। নির্বাচনী অঙ্গিকার অনুযায়ী নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ পাস করা হয়। এই আইনের আওতায় তথ্য কমিশন গঠন করা হয়। এতে জনগন ও গনমাধ্যমের প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

দেশের গনমাধ্যমের বিকাশ ও অগ্রযাত্রায় বর্তমান সরকার অগ্রনী ভুমিকা পালন করছে। ৪১টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচারের অনুমোদনের পাশাপাশি বেসরকারি মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২৮টি এফএম বেতার কেন্দ্র বা এফএম রেডিও ষ্টেশন ও ৩২টি কমিউনিটি রেডিও। সহজতর হয়েছে তথ্য প্রকাশ ও প্রচার। গনমাধ্যম এখন পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে। যে কোন সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি সংস্থা, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, বিভাগ ও মন্ত্রনালয়ের কর্মকান্ড পরিকল্পনা সেবা ইত্যাদি সম্পর্কে যে-কোন নাগরিক যদি তথ্য পেতে চান, তথ্য অধিকার আইন অনুসারে সে তার প্রাপ্য তথ্য পেতে পারেন। নামমাত্র মুল্য পরিশোধের মাধ্যমে একজন নাগরিক নিদ্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা পেয়ে যাবেন।

স্বচ্ছ প্রশাসন ও স্বচ্ছ সমাজ গড়ার লক্ষ্যে তথ্য অধিকার আইন কার্যকরের কোন বিকল্প নেই। তথ্য অধিকারের ব্যাপক প্রসার ও প্রয়োগে ডিজিটাল প্রযুক্তির ভুমিকা অপরিসীম। বর্তমানে দেশে সবগুলো ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ,দপ্তর ও মন্ত্রনালয়ের প্রায় ২৫ হাজার ওয়েব সাইট নিয়ে “জাতীয় তথ্য বাতায়ন” চালু হয়েছে। ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ হ্রাস পেয়েছে বলেই দেশে আজ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। তথ্য প্রাপ্তির অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতাকে নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তারই আলোকে তথ্য অধিকার আইন সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজে দুর্নীতি বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে এবং দেশে একদিন সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। এ কথা সত্য যে, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এবং দেশের নাগরিকদের সক্রিয় অংমগ্রহন ছাড়া তথ্য অধিকার আইন পূর্ন বাস্তবায়ন কোনভাবেই সম্ভব নয়। দেশে বিরাজমান তথ্য অধিকারের সুফল পেতে সর্বস্তরের জনগনকে এই আইনের প্রয়োগ সম্পর্কে জানতে হবে এবং এর মাধ্যমে জনগনের ক্ষমতায়নের পথ সুগম করতে হবে। উন্নয়ন যোগাযোগ ছাড়া কোনো সমাজ, কোনো রাষ্ট্রের বিকাশ চিন্তা করা যায় না। প্রতিদিন তথ্যের আদান-প্রদান বাড়ছে। সারা পৃথিবী আজ একটি গ্লোবাল ভিলেজ। তথ্য প্রবাহ যোগাযোগ বাড়ায়। যোগাযোগ রাষ্ট্র ও জনগনের মাঝে যোগসূত্র তৈরী করে। বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে অঞ্চলের, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের এবং তথ্য প্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আশির দশক থেকে বিশ্বে তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে নতুন মাত্রা। বর্তমান বিশ্বের অর্থ ব্যবস্থায়(New World Economic Order) যোগাযোগ বিপ্লব ঘটিয়েছে। বর্তমান বিশ্বে উন্নয়ন যোগাযোগ রাষ্ট্রযন্ত্র ও জনগনকে এক মেরুতে দাঁড় করে দিয়েছে। উন্নয়ন যোগাযোগের অন্যতম উপাদান অবাধ তথ্যপ্রবাহ।

খবর আদান প্রদানই তথ্য।তথ্য মানুষের জীবনের চাহিদা মিটায়। বর্তমান বিশ্বে তথ্যের ব্যবহারিক মুখ্য ও বিনিময় মুল্য দুটোই রয়েছে। এ কারনেই তথ্য এখন পন্য। বর্তমান যুগকে আইসিটি যুগও বলা হয়। আমরা প্রতিদিন পরিবার, সমাজে, অফিস-আদালতে, হাটে, মাঠে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমনকি পথ চলতে বিনিময় করি। তথ্য সরবরাহ ও তথ্য গ্রহন আমরা জাতীয় পর্যায়েও লক্ষ্য করি।প্রধানমন্ত্রী জনগনের উদ্দেশ্যে ভাষন দেন। ভাষনের মাধ্যমে তিনি জনগনকে কিছু মেসেজ দেন। পহেলা বৈশাখ, ঈদ, বড়দিন, বড়দিন, বৌদ্ধপূনিূমাসহ বিশেষ সময়গুলোতে সংবাদপত্র, ইন্টারনেট, টেলিভিশন ও বেতারে বিভিন্ন তথ্য জনগনের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করেণ। এই সরবরাহ থেকে আমরা তথ্য সম্পর্কে অবহিত হই এবং কর্মজীবনে নানাভাবে উপকৃত হই।

কেন এই তথ্য অধিকার আইন ?

জ্ঞানের জন্য তথ্য। তথ্য আমরা পাই একমুখী ও দ্বিমুখী যোগাযোগের মাধ্যমে। রেডিও, টেলিভিমন, সংবাদপত্র, মাইকিং ইত্যাদির মাধ্যমে আবহাওয়াসহ নানামুখী খবর শুনি এবং দেখি। আগামীকাল জলোচ্ছাস কিংবা প্রবল ঝড়বৃষ্টি বার আশন্কা যদি থাকে এবং প্রবল বর্ষনের পর যদি রৌদ্রকোজ্জল একটি দিন পাবার সম্ভাবনা থাকে, প্রচন্ড খরা বা অনাবৃষ্টির পরেও যদি ‘লু’ বইবার আশন্কা থাকে, সেটিও আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জেনে নিতে পারি।

তথ্য আমাদের সিদ্বান্ত গ্রহনে সাহায্য করে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তথ্যের প্রয়োজন। ২০১৬ সাল পর্যন্ত মোট ১১৩ দেশে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর করা হয়। আজ থেকে ২৫০ বছর পূর্বে ১৭৬৬ সালে বিশ্বে তথ্য অধিকার প্রথম স্বীকৃতি পায় সুইডেনে এবং ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে তথ্য অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬৬ সালে Freedom of Information Act প্রনয়ন করে।

জনগনের সচেতনতা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত তথ্য কাজে লাগাতে সহায়ক হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তথ্য কমিশিনের তথ্য বাতায়ন উদ্বোধনকালে বলেন.“ তথ্য অধিকার দরিদ্র,প্রান্তিক এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। তিনি আইনটি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির গুরুত্বারোপ করেন। ৭০%-৮০% জনগন মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। সমাজের সর্বস্তরে তথ্য অধিকার আইন এবং এর ব্যবহার সম্পর্কে ধারনা থাকতে হবে”।

তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুগে তথ্য লুকানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এক সময় বিভিন্ন অফিস-আদালতের তথ্য গোপন রাখার প্রবনতা ছিল। আজ তথ্য জানা একটি অধিকার। বাংলাদেশ তথ্য অধিকার আইন এর বাস্তবায়ন ৭ বছরে সমাজে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে এ বিষয়টি গবেষনার দাবি রাখে। তথ্য অধিকার আইনের উপযোগিতা সম্পর্কে জনগনকে জানানোর জন্য প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গনমাধ্যম আরো কার্যকর ভুমিকা রাখতে পারে।

সুফিয়া বেগম


সচিত্র বাংলাদেশ, অক্টোবর ২০১৬ সংখ্যা।

ফোবানি/হামিদ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন