ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মানে বাংলাদেশী নারী জয়নাব ইসলাম। তাঁকে নিয়েই চলছে নেতিবাচক প্রচারনা!

আপনি একদিনের জন্য একজন ছাত্রকে যে কোন বিষয়ে পড়া পড়াতে পারেন কিন্তু তাকে যদি কৌতুহল করে শেখান সে যতদিন বাঁচবে শিক্ষা চারিয়েই যাবে - ক্লে পি. বেডফোর্ড।

258
what_is_digital_content

ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মান করেন জয়নাব ইসলাম। বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার চম্পট পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক।এই ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মানে পুরস্কার প্রাপ্ত হয়ে গ্লোবাল লার্নিং এ লন্ডন সফর করেছেন। দেশের জন্য বয়ে এনেছেন সম্মান। গত ১০ অক্টোবর তার লার্নিং পার্টনার জ্যাকি বোর্ডম্যান লন্ডন থেকে বাংলাদেশে আসেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখিও করেন করেন জয়নব ইসলাম। এবার একুশের বইমেলায় ‘সমর্পিত শব্দাবলী’ শিরোনামে একটি কবিতার বইও প্রকাশ হয়েছে তাঁর।

ডিজিটাল কনটেন্ট কি?

আপনি একদিনের জন্য একজন ছাত্রকে যে কোন বিষয়ে পড়া পড়াতে পারেন কিন্তু তাকে যদি কৌতুহল করে শেখান সে যতদিন বাঁচবে শিক্ষা চারিয়েই যাবে – ক্লে পি. বেডফোর্ড।

শিক্ষার মানোন্নয়নে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিখন-শেখানো কার্যক্রমে গুনগত পরিবর্তনে ক্লাসরুমসমূহে মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তির ব্যবহারই হলো ডিজিটাল কনটেন্ট। ডিজিটাল কনটেন্টভিত্তিক মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমকে সক্রিয় করতে এবং শিক্ষকদের ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরিতে সক্ষম ও দক্ষ করতে এছাড়া শিক্ষকগণ যাতে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আকর্ষণীয় কনটেন্ট তৈরি করে তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা, মতামত ও পরামর্শ শেয়ার করতে পারেন সেজন্যে শিক্ষক বাতায়ন www.teachers.gov.bd তৈরি করা হয়েছে।

ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মান, একজন শিক্ষক জয়নব ইসলাম, মিডিয়া ও জনপ্রতিনিধিগন

শিক্ষক বাতায়নে সহকারী শিক্ষক জয়নব ইসলাম এর ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণে পুরস্কারপ্রাপ্তি ও গ্লোবাল লার্নিংয়ে অংশগ্রহণকে আলীকদম উপজেলা তথা বান্দরবান জেলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। জানা যায়, www.teachers.gov.bd-এর শুরু থেকে জয়নব ইসলাম বিষয়ভিত্তিক কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তাঁর কাজের স্বীকৃতিও তিনি পেয়েছেন। দেশের মাটি জয় করে গ্লোবাল লার্নিংয়ে অংশ নিতে তিনি গত জুলাই মাসে লন্ডন সফর করেন। সেখানেও তিনি দেশের ইমেজ উজ্জ্বল করেছেন। তার লন্ডন সফর ও গ্লোবাল লার্নিং নিয়ে ‘Yellow Advertise’ সহ কয়েকটি পত্রিকায় সংবাদও প্রকাশিত হয়।

জয়নব ইসলাম জানান, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণে পুরস্কারপ্রাপ্তির পর গ্লোবাল লার্নিংয়ে অংশ গত ১২ জুলাই মাসে তিনি লন্ডন ভ্রমণ করেন। সেখানে তার গ্লোবাল লার্নিং পার্টনার জ্যাকি বোর্ডম্যান তাকে স্বাগত জানান। পাশাপাশি সেখানে কয়েকটি স্কুল ভিজিট করেন। এ অভিজ্ঞতার ওপর তিনি একটি পার্টনারশিপ প্রতিবেদনও তৈরি করেন। তিনি লন্ডনের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রাইমারি স্কুল পরিদর্শনকালে সেখানকার প্রাইমারি শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। কচি-কোমল শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে ছবিতে, গানে, আবৃত্তিতে, গল্পে ও অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরেন। আরো জানা যায়, লন্ডন সফরকালে এ কৃতী শিক্ষক বাংলাদেশ ও তার নিজ বিদ্যালয় ‘চম্পটপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নিয়ে তৈরি করা ‘পাওয়ার পয়েন্ট স্লাইড শো’ লন্ডনের হেভেরিংয়ের মেয়র ব্রায়ান ইগলিং ও সুধীমহলের সামনে উপস্থাপন করেন। উচ্ছ্বসিত মেয়র এ সময় শিক্ষক জয়নব ইসলামকে মেয়র ভবনে স্পেশাল পোশাকে সজ্জিত করে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করেন।

গত ১০ অক্টোবর গ্লোবাল লার্নিং পার্টনার জ্যাকি বোর্ডম্যান বাংলাদেশে আসেন; কিন্তু আলীকদম উপজেলায় তার নির্ধারিত সফর সরকারি সিদ্ধান্ত (অজানা কারনে) অনুযায়ী সম্ভব হয়নি। জ্যাকি বোর্ডম্যান জয়নবের চকরিয়ার বাড়িতে এসেছিলেন। তাকে স্বাগত জানাতে যান ভারপ্রাপ্ত উপজেলা চেয়ারম্যান কাইনথপ ম্রো, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আল-আমিন, ইউআরসি ইন্সট্রাকটর মোহাম্মদ আলমগীর, ইউপি চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের শিক্ষা মাঠকর্মকর্তা উইলিয়াম মার্মা, যুবনেতা আবদুল হামিদ,অংশেথোয়াই মার্মা ও সংশ্লিষ্ট স্কুলের সভাপতি নুরুল আলম।

জয়নব ইসলাম বলেন, ‘লন্ডনের স্কুলের শিক্ষাপদ্ধতি, ক্লাসে বসার স্টাইল, মুখস্থ না করে হাতে-কলমে শেখার কৌশল, শিশুদের প্রতি শিক্ষকের আন্তরিকতা সর্বোপরি এত সুন্দর শিশুবান্ধব শ্রেণিকক্ষ আমাকে অভিভূত করেছে। আমি চেষ্টা করব এর কিছুটা হলেও আমার ক্লাসরুমে প্রয়োগ করতে।’

চম্পটপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হুমায়রা বেগম বলেন, ‘একজন সহকারী শিক্ষকের এ অর্জনের আমি গর্বিত। তবে গ্লোবাল লার্নিং পার্টনার জ্যাকিকে আমার স্কুলে এনে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সাথে সাক্ষাৎ করাতে না পারাটা বেদনার। জ্যাকিকে আলীকদম আনতে ডিসি বরাবর আবেদন করা হয়েছিল; কিন্তু এ আবেদনের কী সুরাহা হলো তা আমি জানি না।’

এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা চেয়ারম্যান কাইনথপ ম্রো বলেন, ‘শিক্ষাদীক্ষায় পিছিয়ে থাকা একটি উপজেলা থেকে একজন শিক্ষকের এ ধরনের সাফল্য আমাদের গৌরবান্বিত করেছে। তিনি স্থানীয় শিক্ষকদেরও শিক্ষা-মেধার প্রতিযোগিতায় জয়নবের পথ অনুসরণের পরামর্শ দেন’।

শুধু তাই নয়, ব্রিট্রিশ কাউন্সিলের কো-অর্ডিনেটর এসএম তাহমিনার পাঠানো ইমেইল বার্তায় জানা যায়, দেশের ৩৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ইতিমধ্যে‘ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যাওয়ার্ড (আইএসএ) এর জন্য’ মনোনীত হয়েছে। যার মধ্যে প্রাইমারি স্কুল রয়েছে শুধুমাত্র ২টি।এর মধ্যে ১টি হচ্ছে চম্পট পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৩৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অ্যাওয়ার্ডভুক্ত এ তালিকায় চম্পট পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ১২ নম্বরে রয়েছে।

জয়নব ইসলাম। একজন অনুকরনীয় নারী।

২০০৩ সালে চাকুরিতে প্রবেশ করেন জয়নব ইসলাম। ২০১০ সালে ২৫ এপ্রিল যোগদান করেন চম্পট পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর তিলে তিলে নিজের মেধা ও পরিশ্রমকে কাজে লাগান। ২০১৩ সালে মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্ট তৈরির কাজ শুরু করেন। যার ফলে দেশের জন্য বয়ে আনেন একের পর এক সম্মান। ২০১৪ সালের ৬ মে শিক্ষামন্ত্রী হাত থেকে সেরা শিক্ষিকা অ্যাওয়ার্ড, ২০১৫ সালে ‘গ্লোবাল লার্নিং’র ওপর ইংল্যান্ডের মেয়র ভবনে (১৯ জুলাই) জয়নবকে রানীর পোশাকে সজ্জিত করা হয়, অতপর অ্যাওয়ার্ড অর্জন। বাংলাদেশ-কোরিয়ার উদ্যোগে আয়োজিত কারিকুলাম ডেভেলপমেন্টের কর্মশালায় এনসিটিবি চেয়ারম্যান ও কোরিয়ান গণিত ও বিজ্ঞান স্পেশালিস্ট টিম প্রশংসাপত্র প্রদান আর চারবারের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন, দেশের ৬৪ জেলা থেকে দুই স্কুলশিক্ষককে ‘টিচারস কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট’ (টিকিউআই) প্রশিক্ষক নির্বাচিত করার মধ্যেও তিনি অন্যতম একজন।

শুধু নারী বলেই কি এই নেতিবাচক প্রচারনা?

শিক্ষক জয়নব ইসলামের এত সব অর্জনে ঈর্ষান্বিত হয়ে সমাজের কিছু কীট-পতঙ্গ, বিষাক্ত বিষবাস্প শুরু করেছেন মিথ্যা প্রচারনা। নেতিবাচক প্রচারনা সম্পর্কে এখানে বিস্তারিত উল্লেখ করা যৌক্তিক কারনেই সমীচিন মনে করছি না। শুধু জয়নব আরা বেগম এর ফেসবুক টাইমলাইন থেকে তাঁর নিজের উদ্বৃতি টুকুই এখানে তুলে ধরতে চাই,আমি শিক্ষকতার মাধ্যমে অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশের শিক্ষার জন্য সম্মান অর্জন করেছি কিন্তু এই সম্মানই এখন আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে, আমাকে বাঁচতে দিন। জয়নব ইসলাম জানান,“নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গিয়ে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকেও যথেষ্ট বাঁধাপেয়েছি। আমার কিছু সহকর্মী এলাকায় আমাকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করে যাচ্ছেন।” যার জন্য নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডিও করতে হয়েছে এই নারীকে।

তবুও জয়নব ইসলাম বলেন

‘যত বাধাই আসুক, যত নেতিবাচক প্রচারনাই চলুক, কোন বাধাই আমাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। আমার এ অর্জন আমি আমার প্রধান শিক্ষক এবং ছাত্র-ছাত্রীদের নামে উৎসর্গ করলাম।’

ইন্টারনেট ও ফেসবুক অবলম্বনে

ফোবানি/ হামিদ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন