প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম সম্পর্কে – সানজিদা এনাম সুপ্রা

237
prof._jamal_nazrul_islam

প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম সম্পর্কে

একটি কৈফিয়ত দিতে চাই । লেখাটির শিরোনাম এটা ছিলো না। ইন্টারনেটে ভুমিকম্প ও ভু-কম্পন বিষয়ে তথ্যের প্রয়োজনে ঘুরে খুজছিলাম।সানজিদা এনাম সুপ্রা’র লেখা প্রফেসর জামাল উদ্দিন সম্পর্কে এই লেখাটি ভালো লাগায় পাঠকের উদ্দেশ্যে হুবহু প্রকাশ করলাম। বানিজ্যক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়নি মর্মে অনুমতি না নেয়ার অপরাধ নিজ গুণে ক্ষমা করবেন।

স্বনামধন্য বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম

প্রফেসর: “তুমি কি জানো? মিথেন, অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন আর পানি একটি পাত্রে রেখে নাড়াচাড়া করে জীবনের উৎপত্তি ঘটানো সম্ভব।”
স্ত্রী: “এখন তুমি বলো, সৃষ্টির আদিতে নাড়াচাড়াটা করেছিল কে?”

এই ছিলেন আমাদের স্বনামধন্য বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম, যিনি গল্প করতে পছন্দ করতেন মন খুলে। কখনও বিবর্তনবাদ নিয়ে, কখনও সমাজবাদ নিয়ে, আবার কখনও ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে। তিনি গল্প করতেন রজার পেনরোজ, জ্য আন্দ্যুজ, মারটিন রিজ, অমর্ত্য সেন, লুইস জনসন, ফ্রি ম্যান ডাইসন প্রমুখ তাঁর তারকাবহুল বন্ধু মহল নিয়ে।

Prof. J.N. Islam: The Shadow of a Shaal Tree

‘Prof. J.N. Islam: The Shadow of a Shaal Tree’ নামক এক ট্রিবিউটে তাঁর এক শিক্ষার্থী এমন তথ্যই উল্লেখ করেন।

১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বর্তমান বাংলাদেশের ঝিনাইদহে জন্মগ্রহণ করেছিলেন গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানী ও মহাবিশ্বতত্ত্ববিদ জামাল নজরুল ইসলাম। ১৯৮৪ সালে ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সুযোগ আর সোয়া লাখ টাকার চাকরি ছেড়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যোগ দেন এ তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ‘এমিরেটাস প্রফেসর’ হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

স্টিফেন হকিংস তাঁকে বারংবার ক্যামব্রিজে ফেরত যাবার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর দেশপ্রেম এবং মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা নিয়ে কাজ করার স্পৃহা আমৃত্যু অটুট ছিল।

তিনি মহাবিশ্বের উদ্ভব ও পরিণতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণার জন্য বিশেষভাবে খ্যাত।তিনি চট্টগ্রামে ফেরার পর প্রফেসরএ.এম. হারুন-অর-রশীদ, আব্দুল্লাহ আল মুতী শরীফুদ্দিন ও প্রফেসর সালামের সহযোগিতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের অন্যতম স্বনামধন্য গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন যা বর্তমানে Jamal Nazrul Islam Research Center for Mathematical and Physical Sciences (JNIRCMPS) নামে পরিচিত।

তিনি চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডভাইসরি বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চায় অবদানের জন্য ২০০১ সালে একুশে পদকে সম্মানীত করা হয় অধ্যাপক জামাল নজরুলকে। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি স্বর্ণপদকও পান তিনি।

১৯৯৮ সালে ইতালির আব্দুস সালাম সেন্টার ফর থিওরটিক্যাল ফিজিক্সে থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমি অফ সায়েন্স অনুষ্ঠানে তাকে মেডাল লেকচার পদক দেয়া হয়। ২০১১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজ্জাক-শামসুন আজীবন সম্মাননা পান।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘কৃষ্ণ বিবর’, ‘মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ’, ‘শিল্প সাহিত্য ও সমাজ’ ।
তার দি আল্টিমেট ফেইট অফ দি ইউনিভার্স ১৯৮৩ সালে প্রকাশের পর বিজ্ঞানী মহলে বিশেষ সাড়া ফেলে। জাপানি, ফরাসি, পর্তুগিজ ও যুগোশ্লাভ ভাষায় তা অনুদিত হয়।

ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি, রোটেটিং ফিল্ড্‌স ইন জেনারেল রিলেটিভিটি, অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি, স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ তার লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তারের পর যখন গুজব ছড়ালো যে মুজিবকে মেরে ফেলা হবে, তখন প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম ইংল্যান্ডের শহর স্যাফ্রন ওয়াল্ডেনের বার্টন বাটলার ও ট্রিনিটি কলেজের মাস্টার এর উদ্দেশ্যে চিঠিতে লেখেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হলে এটি বিশ্বযুদ্ধে গড়াবে যেমনটা ঘটেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ডিউক ফার্দিনান্দকে হত্যা করাতে। এভাবে তিনি মুজিবের হত্যা প্রতিরোধে তাঁর অবস্থান জানান দেন।

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও নোবেলবিজয়ী স্টিভেন ওয়েইনবারগ

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও নোবেলবিজয়ী স্টিভেন ওয়েইনবারগ তাঁর সম্পর্কে বলেন- “We are particularly indebted to Jamal Islam, a physicist colleague now living in Bangladesh. For an early draft of his 1977 paper which started us thinking about the remote future.”

নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম

নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম বলেছিলেন, এশিয়ার মধ্যে আমার পরে যদি দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি নোবেল পুরস্কার পায়, তবে সে হবে প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম।

“গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অনাড়ম্বর ভাবেই চলে গেল এই বাংলাদেশী মহারথীর জন্মদিবস।”

আজ কোন সুন্দরী মডেল বা সুদর্শন ক্রিকেটারের জন্মদিন হলে… তারা সকাল-সন্ধ্যা কোন রঙের কোন ঘরানার পোশাক পড়ে কোন ফ্লেভারের কেক কাটতেন তাওহয়তো ফলাও করে বিশেষ ক্রোড়পত্র আকারে ছাপা হতো স্বনাম ধন্য জাতীয় পত্রিকাগুলোতে!
আজ স্টিভজবসেরও জন্মদিন ছিল। আমেরিকান এই উদ্যোক্তাকে নিয়েও ফিচার চোখেপড়ল। দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বারবারই স্মরণ করলাম, আমাদের জামাল নজরুল ইসলাম স্যারেরও তো জন্মদিন আজকে!

থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স, অ্যাপ্লাইড ম্যাথেম্যাটিকস, ম্যাথেম্যাটিক্যাল ফিজিক্স, কসমোলজি, কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরির মত বাঘা সব শাখায় মহারথী এ বাংলাদেশী কোথায় দেশী মিডিয়ায়???

আমরা কি ভেবে নিচ্ছি… মডেলিং আর ক্রিকেটে, গান আর নাটকে, ব্যবসা আর এভারেস্ট জয় করে… জাতি হিসেবে খুব এগিয়ে যাবো আমরা??
শিশুদের আমরা খুব করে পড়তে তো বলি… তারপর সামনে প্রতিনিয়ত রোল মডেল হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিই সুদর্শনাদের!! অথবা বিদেশীদের!

হিপোক্রিটিক আমাদের এই হিপোক্রিটিক আদর্শে বড় হওয়া শিশুদের দিয়েই আবার নিজের দেশের দিনবদলের আশা করে যাই দিনরাত…

সানজিদা এনাম সুপ্রা 

 

ফোবানি/হামিদ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন