নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার গাংচিল জনপ্রতিনিধি মোজাম্মেল যখন জনআতন্ক

15
jonoprotinidhi-mojammel

প্রায় এক বছর ছয় মাসে পূর্বে ঘটেছিলো এই ঘটনা। দিনক্ষণ মনে করতে পারছিলেন না ইসমাইল।কোনো এক রাতে ৩০-৩৫ জনের এক দল সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা চালায় স্থানীয় যুবলীগ কর্মী ইসমাইল হোসেনের বাড়িতে। এ সময় সন্ত্রাসীরা লুটপাট চালিয়ে তার বসত ও রান্না ঘরে অগ্নি সংযোগ করে। একই সময় পার্শ্ববর্তী তার ছোট ভাই সামছুদ্দিনের বাড়িতেও হামলা চালায়। লুটপাট শেষে দুটি ঘরে অগ্নিসংযোগ করে। দুই বাড়িতে অগ্নিসংযোগ শেষে বেড়ি বাধের পাশে হাসেম বাজার সংলগ্ন তাদের বাবার বসত ঘরটি কুপিয়ে তছনছ করে। যার চিহ্ন এখনও রয়ে গেছে যেন ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে। সেদিন রাতে মারধর করে তার মাকে এবং শারীরিক নির্যাতন করে কিশোরী বোনকে। কথাগুলো যখন বলছিলেন ইসমাইল, চোখের নীচে কালো মেঘ জমে উঠে। ডুঁকরে কেঁদে উঠেন ইসমাইল। কথা থেমে যায়।

নীরবতা ভেঙ্গে ইসমাইল বলেন, তাদের নিজেদের কোনো জায়গা-জমি নেই। বাধ্য হয়েই তিনি ও তার ভাই সরকারি খাস জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা দুই ভাই ছোট-খাট ব্যবসা করেন। ব্যবসার কাজে রাতের ৯-১০টা পর্যন্ত তাদেরকে বাহিরেই থাকতে হয়। তারা যতক্ষণ বাহিরে থাকেন ততক্ষণ তাদের স্ত্রী-সন্তানরা বেড়ির পাশে তার বাবার বাড়িতে অবস্থান করেন। ঘটনার রাতে তিনি নোয়াখালী জেলার বাণিজ্যকেন্দ্র চৌমুহনীতে ছিলেন। বিষয়টি ফোনে জানতে পারেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ করে দেয় সন্ত্রাসী মোজাম্মেল হোসেন ওরফে মেম্বার মুজাম বাহিনী প্রধান মোজাম্মেলের নেতৃত্বে তার দলবল।

ইসমাইল অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন মোজাম্মেল মেম্বারের সঙ্গে ছিলেন তিনি। একসঙ্গে আওয়ামী রাজনীতিও করতেন। পরবর্তীতে মোজাম্মেলের নানা অপকর্মের বিরোধিতা করে তার কাছ থেকে সরে আসাতেই ইসমাইলের উপর মোজাম্মেলের নির্যাতন আর অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে।

মোজাম্মেল হোসেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর এলাহী ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার)। সে ও তার বাহিনী শুধু ইসমাইল নয় শত শত মানুষ ও পরিবারকে নির্যাতন করেছে। মোজাম্মেল বাহিনীর অত্যাচারে ঘর হারিয়েছে, ব্যবসা হারিয়েছে, অনেক নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

এতসব অপকর্মের অভিযোগের অনুসন্ধানে সরেজমিনে খোজ নিতে হেলে স্থানীয়রা আরো অভিযোগ করে বলেন, চাঁদাবাজী, ছিনতাই, ডাকাতি, প্রতিরাতে বোমা মেরে আতংক তৈরি করা, সরকারি খাস জমি দখল, ভ‚মিহীনদের বসত নির্মিত খাস জমি দখল করে প্রভাবশালীদের কাছে বিক্রি ও খাস জমিতে মৎস্য খামার গড়ে তুলতে টাকার বিনিময়ে প্রভাবশালীদের সহযোগিতা করা, বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে জামানত গ্রহণ ও জামানতের টাকা আত্মসাৎ, এলাকায় মাদক বিক্রি এবং সেবন সবই হচ্ছে এই মোজাম্মেল বাহিনীর নেতৃত্বে। তার দখল থেকে রক্ষা পায়নি প্রাথমিক ও হাই স্কুলের জায়গা। ২০১৬ সালের দিকে গাংচিলে প্রায় ১৭ কিলোমিটার পল্লী বিদ্যুতের লাইনের অনুমোদন আসলে মোজাম্মেল পল্লী বিদ্যুত দেয়ার কথা বলে সর্বনিন্ম ২০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ি প্রতি চাঁদা নেয়। যারা চাঁদা দিতে পারে নি তাদের বিদ্যুতের আওতায় আনা হয়নি। অথচ দেখা গেছে বিভিন্ন মৎস্য প্রজেক্ট প্রকল্প মালিকের কাছ থেকে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে এ চরে আসা ভ‚মিহীনরা মোজাম্মেলকে টাকা দিয়ে সরকারি জমিতে বসত-ভিটা গড়তে হয়েছে।ভ‚মিহীন পরিবার প্রতি সর্বনিন্ম ২০ থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত সে চাঁদা নিয়েছে। এছাড়া নিজেও বিভিন্ন স্থানে সরকারি খাস জমি দখল করে রেখেছে। সম্প্রতি গাংচিলে রবি কোম্পানীর টাওয়ার স্থাপন করতে আসা ইঞ্জিনিয়ারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবী করে সে। টাকা দিতে অস্বীকার করলে মোজাম্মেল একটি পাইপগান বের করে ওই ইঞ্জিনিয়ারকে গুলি করার ভয় দেখালে তিনি ঘটনাস্থলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

সূত্র জানায়, তার এসকল অপকর্মের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলেই তার উপর নেমে আসে নির্যাতন। নির্যাতনের প্রথম দাফ হচ্ছে প্রতিবাদীকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা, এর পর মামলা তুলে নেয়ার কথা বলে মোটা অংকের টাকা আদায় করা। মোজাম্মেলের প্রস্তাবে রাজি না হলেই নেমে আসে শারীরিক নির্যাতন, রাতের অন্ধকারে শুরু হয় বাড়ি ঘরে হামলা । কখনও কখনও প্রতিবাদকারীর পাশাপাশি নির্যাতিত হয় তার পরিবারের সদস্যরাও। অনেক প্রতিবাদকারীর পরিবারের কিশোরী কিংবা নারীরা ধর্ষণের শিকার পর্যন্ত হয়েছে মর্মে ভ‚ক্তভোগিরা জানান। অনেক প্রতিবাদকারী গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ তার ভয়ে ঘর থেকে বের হতে পারছে না। এলাকায় বেশ কয়েকজন রয়েছে যাদের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়াতেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এই মোজাম্মেল মেম্বার।

মোজাম্মেলের আপন জেঠাত ভাই দেলওয়ার জানান, চরএলাহী ইউনিয়ন দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ও নির্বাচনের সময় কেন্দ্র দখল করে নির্বাচিত সদস্য (মেম্বার)হওয়ার পর থেকে সে বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠে। স্থানীয় জসিম মেম্বার, সিরাজ কমান্ডার, ঝর্ণা ওরফে মামি সিরাজ নামের এক মহিলাসহ প্রায় ৬-৭জনকে নিয়ে এলাকায় মাদক বিক্রির সিন্ডিকেট তৈরি করেছে এই মোজাম্মেল মেম্বার। মাদকের ব্যবসার টাকায় বিশাল এক সন্ত্রাসী বাহিনী পালে সে। চাঁদাবাজী, খাস জমি বিক্রি ও মাদক ব্যবসার টাকায় মোজাম্মেল মেম্বার আজ কোটিপতি। বাজারে দোকান, বিভিন্ন স্থানে জমির মালিক ও বাড়িতে চোখ জুড়ানো বিল্ডিং। তার এসব অপকর্মের কারণে ইতোমধ্যে দলীয় পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হলেও এখনও সে আওয়ামী যুবলীগের একজন বলে দাবি করে এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

এলাকার মোহাম্মদ আলী মোহন ও আবু তাহের জানান, তারা সরকারি খাস জমিতে দীর্ঘদিন বসবাস করছেন। তবে এখনও বন্দোবস্ত পাননি। ইদানিং শহরের প্রভাবশালীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে মৎস্য প্রজেক্ট করতে ওই দুই ব্যক্তির বাড়ির আশপাশের জায়গাগুলো দখল করে নেয় মোজাম্মেল বাহিনী। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে মিথ্যা মামলা দিয়ে আবু তাহেরকে দুইবার পুলিশে ধরিয়ে দেয় মোজাম্মেল। পরে আবু তাহেরকে বের করার কথা বলে তার স্ত্রীকে এক লাখ টাকা দিতে চাপ দেয়। এভাবে অনেক ভুমিহীনকে হয়রানি করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে মোজাম্মেল।

আবদুস সামাদ (১৬) নামে এক কিশোর জানান, সপ্তাহখানেক আগে গাংচিল বাজারে অনুষ্ঠিত এক মাহফিল থেকে রাতে বাড়িতে ফিরছিলেন তারা কয়েকজন। পথিমধ্যে মোজাম্মেলের সন্ত্রাসী বাহনীর সেলিম, বাদশা, মাসুদ ও লেঙড়া সিরাজসহ কয়েকজন তাদের পথরোধ করেন। নানা কথা জানতে চায় তারা, এক পর্যায়ে ওই যুবককে বেদম মারধর করে তার কাছে থাকা মোবাইলসহ সবকিছু ছিনিয়ে নেয়। এছাড়া প্রতি রাতেই মোজাম্মেলের লোকজন গাংচিলের বিভিন্ন স্থানে ককটেল ফাটিয়ে এলাকায় আতন্ক সৃষ্টি করে নিজেদের ক্ষমতার জানান দেয়। রাস্তায় চলাচলরত মানুষের পিছনে ও সামনেও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে এলাকার মানুষ সব সময় আতন্কে থাকে।

এতসব অভিযোগে অভিযুক্ত মোজাম্মেল হোসেনের সাথে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো না। এ জন্যই চেয়ারম্যানই তার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।একাধিক মামলা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি জানান, তার বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে সেগুলোতে তিনি জামিনে রয়েছেন।

ইউপি চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক বলেন, মোজাম্মেলের সঙ্গে তার কোনো বিরোধ নেই। তিনি তাঁর পরিষদের একজন সদস্য। যদিও ওই সদস্য একদিনের জন্যও পরিষদে আসেন না। তাছাড়া মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ স্থানীয়রা আপনার কাছে করেছে তা আমার কাছেও করেছে। কিন্তু আমি নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে কোন উদ্যোগ নিতে পারি নাই। তবে আমি বিশ্বাস করি দেশে আইন-আদালত রয়েছে, কেউ অপরাধ করলে তার বিচার হবেই।

স্থানীয়রা জানান, হেন কোনো কাজ নেই মোজাম্মেল মেম্বার ঘটায় না বা করে না। তার বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করলেও তার উপর নির্যাতন করে। ইতোমধ্যে এমন একাধিক ঘটনাও ঘটিয়েছে সে। বর্তমানে মোজাম্মেল জনগণের কাছে একটা আতংকের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার বিরুদ্ধে থানা ও আদালতে ধর্ষণ, চাঁদাবাজী, লুট, ঘর পোড়াসহ প্রায় দেড় ডজন মামলা রয়েছে। একাধিকবার জেলহাজতেও ছিল সে। এত মামলা থাকাকালীনও সে কিভাবে বাহিরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং তার অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে শংকিত বাসিন্দারা। এমন অবস্থায় তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগ তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের কাছে দাবী জানিয়েছে ভুক্তভোগিরা।

কোম্পানীগঞ্জ থানার একটি সূত্র জানিয়েছে তাঁদের ওয়েভসাইটে মোজাম্মেল হোসেনের বিরুদ্ধে থানায় ও আদালতে প্রায় ১৯টি মামলার তালিকা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, ঘর পোড়া, চাঁদাবাজী, জায়গা দখলের মামলা বেশি। তবে কিছু কিছু মামলায় বর্তমানে সে জামিনে রয়েছে। মামলাগুলো কোন পর্যায়ে রয়েছে এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি সূত্রটি। (মামলার নাম্বার, তারিখ ও কোর্টের নামসহ এ প্রতিনিধির কাছে তালিকা রয়েছে)।

অবশ্য মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে এতগুলো মামলা থাকার কথা জানেন না কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদ্দুজামান। তিনি বলেন, তিনি ইতোমধ্যে মাত্র একটি মামলা পেয়েছেন। ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে চার্জশীট দেয়া হয়েছে। মামলাগুলোর বিষয়ে তাঁরই থানার একটি সূত্রের বরাত দিলে তিনি বলেন, তাহলে আমি আরো ভালো করে খুঁজে দেখবো।

দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জামিরুল ইসলাম বলেন, ইউপি সদস্য মোজাম্মেল হোসেনের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগের কথা তিনি নানাভাবে শুনছেন, তবে লিখিতভাবে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তার পরও এসব বিষয়ে তিনি খোঁজ খবর নিবেন বলে জানান।

দ্বীপ আজাদ


নোয়াখালী থেকে

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন