জঙ্গি খাদিজা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান

109
jongi_khadija

জঙ্গি খাদিজা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী। স্বামীর প্ররোচনায় হয়ে গেলেন জঙ্গি। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ছিলেন ভয়ানক জঙ্গি। দুই যমজ শিশু সন্তানকেও তারা জঙ্গিবাদে জড়িয়েছেন। স্বামী ও এক ছেলে হয়েছেন আত্মঘাতী। আরেক ছেলেকে নিয়ে তিনি এখন কারাগারে। জঙ্গিবাদে জড়িয়ে তছনছ হয়ে গেছে তার সোনার সংসার। ভয়ানক এই নারী জঙ্গির নাম আবেদাতুল ফাতেমা আশা। এখন জঙ্গি খাদিজা নামেই তিনি বেশী পরিচিত।

জঙ্গি খাদিজা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তার জবানবন্দিতে উঠে এসেছে চাঞ্চ্যকর ও হৃদয় বিদারক কাহিনী।

গেল বছরের ১০ সেপ্টেম্বর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগ রাজধানীর আজিমপুরের লালবাগের একটি পাঁচতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে অভিযান চালায়। অভিযানকালে জঙ্গিদের সঙ্গে পুলিশের কয়েক দফায় গোলাগুলি হয়। গ্রেফতারের হাত থেকে বাঁচতে ও সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাতে প্রকাশ না পায় এজন্য আত্মহত্যা করে ফাতেমার স্বামী তানভীর কাদেরী।

জঙ্গি খাদিজা জবানবন্দীতে জানান, তার বাবা নাম আবদুত তাওয়াব। গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুন্সেফপাড়ায়। ১৯৯৬-৯৭ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। পরিচয় হয় ঢাকা কলেজের ছাত্র তানভীর কাদেরের সঙ্গে। পরিচয় থেকে প্রেম ও বিয়ে করে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স ও ২০০১ সালে এমএ পাশ করেন। এরপর সেভ দ্য চিলড্রেন ও মুসলিম এইডে চাকরি করেন।

জবানবন্দীতে জঙ্গি খাদিজা জানান, তিনি ও তার স্বামী ২০১৪ সালে হজ করেন। হজ থেকে ফেরার পরেই স্বামীর মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। ২০১৫ সালের শেষ দিকে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। স্বামী ডাচ বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং শাখার হেড অব দ্য ডিস্ট্রিবিউশন ছিলেন। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর নিজেই হোম ডেলিভারি ব্যবসা শুরু করেন। তার কাছে প্রায়ই মেজর জাহিদের কথা বলতেন। মেজর জাহিদের কাছ থেকে তার স্বামী খেলাফতে জড়ানোর অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। স্বামী তাকে বুঝাতে ব্যর্থ হয়ে একাই হিজরত করার সিদ্ধান্ত নেন।

জবানবন্দীতে জঙ্গি খাদিজা বলেন, ‘স্বামীর এমন সিদ্ধান্তে আমার মধ্যে ব্যাপক ভয় কাজ করে। কিভাবে একা থাকব? আত্মীয়স্বজনের কাছে স্বামীর ব্যাপারে আমি কী জবাব দেব? এমন ভয়ের কথা জানানোর পর স্বামী আমাকে বাচ্চাদের স্কুলে চাকরি করবে বলে লোভ দেখাত। সেখানে অনেকেই শিক্ষিত লোক সমাজ সেবার জন্য চাকরি করছে। আমিও সমাজ সেবার জন্য চাকরি করতে পারব। লোভ আর ভয় থেকেই আমি ২০১৬ সালের মার্চে হিজরত করতে রাজি হই।’

‘এরপর স্বামীর কথায় আমি এক মাসের নোটিসে সেভ দি চিলড্রেনের চাকরি ছেড়ে দেই। এরপর মেজর জাহিদের হাতে হাত রেখে আমার স্বামী বায়াত গ্রহণ করেন। আমি আমার স্বামীর কাছে বায়াত নিই। ২০১৬ সালের ৩০ এপ্রিল মেজর জাহিদের নির্দেশে আমরা মিরপুরে বাসা নিই। মিরপুরে বাসা নেওয়ার পর এ বাসায় রাহুল নামে একজন দেখা করতে আসেন। পুলিশ জানায়, রাহুলই গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলা হামলার আসামি গ্রেফতার রাজীব গান্ধী।’

‘রাহুল পরীক্ষা নিয়ে যায়, আমরা খেলাফতের জন্য কতটা প্রস্তুত। আমার স্বামীকে নব্য জেএমবি প্রশিক্ষণ দিতে দেরি করে। এমনকি সংগঠনের লোকজন তাদের বাসায় দেরিতে যাতায়াত শুরু করে। রোজার আগের মাসেই বাশারুজ্জামান রাহুলকে বাসায় নিয়ে যায়। তারা জানায়, সংগঠনের কয়েকজনের জন্য বসুন্ধরায় একটি বাসা ভাড়া করে দিতে হবে আমার স্বামীকে। রাহুল কয়েক দিন আমাদের বাসায়ই আমাদের ছোট ভাইয়ের মতো থাকে। এরপর বসুন্ধরার বাসায় চলে যায়। পরবর্তীতে তারাও বসুন্ধরার বাসায় চলে যায়।’

‘পুলিশ জানায়, ওই বাসাটি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি গিয়াস উদ্দিনের। বসুন্ধরার বাসায় রাহুল সান, মামুন, শুভসহ পাঁচ জনকে নিয়ে আসে। কয়েকদিন পর রাহুল ওই বাসায় তামিম চৌধুরী আনেন। পরে ওই বাসায় মারজানও আসে। বেশ কয়েকদিন তারা বাসায় অবস্থান করেন। এরপর বাসাটিতে শুভ তার বাবা, মা ও প্রায় ২০ বছরের ছেলে হৃদয়কে নিয়ে আসে। তখন তামিম চৌধুরী ওই বাসায় ছিল। মাস্টার বেডে থাকা পাঁচ ছেলে কোন সময়ই রুমের বাইরে বের হতো না। তামিম চৌধুরী বাসায় থাকা তিনটি দলকে ভাগ করে দেয়। আমার স্বামীর অধীন একটি দল। রাহুল আর মাস্টার বেডে থাকা পাঁচ জনকে নিয়ে একটি দল। আর শুভ, তার বাব ও প্রায় ২০ বছরের ছেলে হৃদয়কে নিয়ে একটি দল। তামিম চৌধুরী নির্দেশ দেন কোন দল কোন দলের রুমে যেতে পারবে না।’

তামিম চৌধুরী জানায়, মাস্টার বেডে থাকা ৫ ছেলে একটি বড় কাজের প্রস্তুতি নিচ্ছে। হলি আর্টিজানে হামলার আগে শুভ, তার পিতা ও ছেলে হৃদয় বাসা থেকে চলে যায়। গুলশান হামলার সকাল বেলা মাস্টার বেডে থাকা পাঁচ ছেলে, রাহুল ও তামিম চৌধুরী চলে যায়। আমরা মাগরিবের আযানের পর বাসা থেকে নেমে ট্যাক্সিক্যাবযোগে মিরপুরের বাসায় যাই। আমার স্বামী একজনকে এসএমএসের মাধ্যমে মিরপুর যেতে বলেন। তার কিছুক্ষণ পরই বসুন্ধরা বাসায় জুনিয়র নামে আসা ছেলেটি আমাদের এসএমএস করে টেলিভিশন দেখতে বলে। আমরা টেলিভিশনে গুলশানে হামলার বিষয়টি দেখি। পরদিন সকালে অন্য একটি মোবাইল নম্বর থেকে এসএমএসের মাধ্যমে গুলশান হামলায় সবাই শহীদ হয়েছে বলে জানায়। সিরিয়ায় মিত্র বাহিনীর হামলা হয়েছে। সিরিয়ায় নিহতদের পাশে দাঁড়ানো উচিত বলে আমার স্বামী আমাকে বলেন।’

‘ঈদের কয়েকদিন পর মুসা নামে একজন আমাদের বাসায় আসেন। মুসা আমাদের নতুন বাসা খোঁজ করার পরামর্শ দেন। এছাড়া জুনিয়র নামে ছেলেটিও নতুন বাসার খোঁজ কার কথা বলে। তারা জানায়, রাহুলকে পাওয়া যাচ্ছে না। ওইদিনই আমরা রাজধানীর রূপনগরের ৩ নম্বর সড়কের বাসায় শুধু ব্যাগ নিয়ে চলে যাই। এরইমধ্যে কল্যাণপুরের ঘটনা টিভিতে দেখদে পাই। এরপর আমরা মিরপুর ছেড়ে লালবাগ যায়। এরইমধ্যে জুনিয়র ওরফে মুসা নামে ছেলেটি আমাদের একটি টাকার ব্যাগ দেয়। আমাদের যমজ ছেলের মধ্যে আফিফ ওরফে আদরকে কম্পিউটার শেখানোর কথা বলে আমার স্বামী নিয়ে যায়। পরে তাকে মুসা নিয়ে যায়।’

‘আমরা লালবাগের বাসায় অবস্থান করছিলাম। এ সময় নারায়ণগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে দুই সহযোগীসহ তামিম চৌধুরী নিহত হয়। ঘটনার দিন সকাল নয়টা কি দশটার দিকে মেজর জাহিদ এসএমএস দিয়ে আমার স্বামীকে পরিবারসহ তার বাসায় যেতে বলেন। আর নারায়ণগঞ্জের ঘটনা টেলিভিশনে দেখতে বলেন। পরে মেজর জাহিদ তার স্ত্রী ও দুই সন্তান, সাব্বির ওরফে মারজানের স্ত্রী, রাহুলের স্ত্রী ও ১০ মাসের মেয়েসহ রাত নয়টার দিকে ওই বাসায় যান। এর ৫/৬ দিন পরই পল্লবীতে মেজর জাহিদ পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। এরপর সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলেন আমার স্বামী। পল্লবীর ঘটনার পর সবার ওই বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ছিল। এরপর আর যাওয়া হয়নি।’

‘পরে পুলিশ বাড়ি ঘিরে ফেলে। পুলিশ সবাইকে তাদের সামনে যেতে বলে। সবার পরিচয় জানতে চায়। এমন পরিস্থিতিতে মরিচের গুঁড়া পুলিশের চোখে মুখে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। বঁটি দিয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ হয়। পুলিশ গুলি চালাতে থাকে। এমন অবস্থার মধ্যেই আমার স্বামী একটি কক্ষে গিয়ে আত্মহত্যা করেন। এক পর্যায়ে পুলিশ আমার মাথায় আঘাত করে। আমি জ্ঞান ফিরে নিজেকে হাসপাতালের কেবিনে আবিষ্কার করি। তখনই আমার উপলব্ধি হয়, আমি কি করলাম। আমি ও আমার ছেলে বন্দি। আমার স্বামী আত্মহত্যা করেছে। আমি স্বামী হারা। সোনার সংসার তছনছ হয়েছে। আমি এ পথে এসে কী পেলাম? ভুল করেছি, অনুশোচনা হচ্ছে। আমি কেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গেলাম। আমি তো রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে পারতাম। আমি এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই।’

ফোবানি/মৃত্তিকা

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন