ঘর – পান্থজন জাহাঙ্গীর

32
House

মিয়ার যে একটা ঘর বাঁধতে হবে। এই চিন্তা কোনদিন মাথায় ছিল না। মাথায় নেওয়ার মতো মানুষও না মিয়া সাহেব। আসগর আলীর মৃত্যর পর জৌলুস করে মেজবান দিয়েছে। অর্থ ও শ্রম দুই দিয়েছে মিয়া। নাম ফেটেছে সব ভাইয়ের। মিয়া ঐই সব তোয়াক্কা করে না। মিয়া প্রচার বিমুখ। মিয়ার সব কর্মকান্ড চাপানো থাকে। বাবার মৃত্যর পর জায়গা জমি ও ভাগ – বাটোয়ারাতেও অংশ নিলনা মিয়া। মিয়া ছিল ঝোঁকালো। বউয়ের কথায় তেমন পাত্তা দিত না। যখন যেদিকে ঝোঁক ছুটে সেদিকে যাবে সেটা করেই ছাড়বে। জোয়ান মরত। গায়ে জোর আছে। শক্তি আছে। নাম দস্তখত করতে জানে। চাষ-বাষে নিখাদ শ্রম দিতে জানে। একেবারে সাচ্চা শ্রম। কোন অসততা কিংবা ফাঁকিবাজি নেই। কিন্তু তা দিয়ে কি হবে? তা কয় দিন? গায়ে জোর থাকতে সহায় সম্পত্তি না করলে শেষ বয়সে এগুলো অর্জন করা যায় না। বাঘের বল তো বার বছর। বাবা মৃত্যুর পর ভাইয়েরা জায়গা-জমি নিয়ে সিন্দুকে বাধা টাকা নিয়ে গমাগম ঘর-বাড়ি, ভিটে-জমি করে ফেলছে। মিয়াসাব অদ্যাবধি একটা ভালো ঘরও করতে পারল না। সংসারে ধীরে ধীরে নতুন মুখ আসতে লাগল।

অবশেষে মিয়া কে একটা ঘর বাঁধতেই হল। তাও নলখাগড়া দিয়ে। দু-তিনটা ছেলে মেয়ে সহ সদ্য পৃথক হওয়া স্ত্রী কে পথের ধারে একলা ঘরে রেখে মিয়া সাব অবশেষে নারায়গঞ্জে পাড়ি জমাল। সুদুর প্রবাসে জীবীকা। রাতে-বিরাতে পাশের পুকুরে একটি জিয়ল মাছ নড়লে ছেলে-মেয়েগুলো ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে। একটা বাদুর উড়লে মিয়ার বউয়ের বুকটা ধুকপুক করে ওঠে। এই ঘর নিয়ে মিয়ার  বউ সন্তুষ্ট না। কয়েক বছর পর নদীনে ভাঙনে এই ঘর বিলীন হয়ে গেল। আবার ভাঙ্গা ঘর। এবার একেবারে পাহাড়েরর পাদ্দেশে। মিয়ার বউয়ের দীর্ঘশ্বাস-‘ আহা একটা সুন্দর ঘর আজও হলো না! যৌথ পরিবারে থেকে কি লাভ হল। আমও গেল ছালাও গেল। ছোট্ট একখানা ভাঙগা-চোরা ঘর। এতগুলো ছেলে-মেয়ে। ঘুমানোর একটা ভালো জায়গা নেই। খাওয়ার জায়গা নেই। আহা মানুষ কত সুন্দর সুন্দর ঘর বাধে! আমার একটা ঘর হলো না। ’বউয়ের এরকম ঘ্যানঘেনানী মিয়ার কিছুদিন পর পর হজম করতে হয়। তাইমিয়া সাহেব মাঝে মধ্যে সান্ত¦না বাক্য ছুড়ে ‘ওগো শুন নদী ভাঙা মানুষ কখনো ঘর নিয়ে সুখী হয়না। যে ঘর আছে সে ঘর নিয়া সুখে থাক। এই ঘর হাছন রাজার ঘরের চেয়ে সুন্দর। দেখবা এক সময় পাক্কা ঘর বাঁধবো। সেই দিনের আসায় বসে আছি।’ ‘ হইছে আর লাহা মেরোনা। ওড়নচন্ডি এই বাউলা জীবনে সবই শেষ করলা। আমার গহনাঘাটি আইনা দাও। ওগুলো বেইচা আমি ঘর করুম। গহনাঘাটি বেচে মিয়া এক জোড়া হালের বলদ কিনছিল। জব্বর মাঝি কে সেই গরু বর্গা দিয়েছিল। কিছুদিন পর সেই বলদজোড়া খুরারোগে মারা গেল। এরপর থেকেই মিয়ার বউ থাকি থাকি সেই গহনার খুটা দেয়। নলখাগড়া থেকে বেড়া,বাশের বেড়া, বেড়া থেকে কাঁদামাটি ও খড়ের একটা নতুন কুঁটির হল। মিয়ার বউ তারপরও আফসোস করে দেখতে দেখতে ছেলে-মেয়ে কয়টা বিয়ের উপযুক্ত হল। একটা মেহমান আসলে ঘরে থাকনের জায়গা দেয়া যায়না। কই কোথায় ঘর? কিছুই হল না। লজ্জায় অপমানে মিয়ার বউয়ের শরীরখানা যেন মাটিন সাথে মিশে যায়। বউয়ের এই নাই নাই অভিভযোগে মিয়া মাঝে মধ্যে  চিৎকার দিয়ে ওঠে। ওই তুই কি এখন ঘরের বাইরে আছস? মনে কর গোটা পৃথিবীটা একটা ঘর আর আমরা সবাই এই ঘরের মেহমান। আমরা এই ঘরের মধ্যেই আছি। এইঘর অনেকটা সুন্দর। এই ঘরে অনেক জায়গা। আসল ঘরের কথা চিন্তা কর।

ছনের চাল। দু’এক বছর বদলাতে পারেনি। বৃষ্টির পানি গলে পড়ে বলে অপেক্ষাকৃত সস্তা দামে চিনা কাগজ দিয়ে কোন রকমে রক্ষা করা হয়েছ। চালের উপর ছায়া দিয়েছে বিশাল কাঁঠালী চাঁপা। সারারাত সেই কাঠালী চাপার টেঁপানী বৃষ্টি আর ঘুঘুর ডাকে খুব ভোরেই উঠে গেল মিয়া। ক্ষিধায় তার পেট টা চিন্ চিন্ করে উঠল। ভাল তরিতরকারির অভাবে সেহেরীটা ভালো হয়নি। ডাল-ভাত আর কতই বা গিলা যায়। ডালও এখন বড় লোকের খাবার হয়ে গেছে। তাই অগত্যা পাইন্না জালটা নিয়ে অদুরে নদীতে নেমে পড়লো। ইফতারে একবেলা ভালো খাবারের আশায়। কিছু সুস্বাদু মৎস্য আজ ইফতারে তাদের ভালো খাবার হবে-এই আশায় পরিবার পরিজন নদীর দিকে উম্মুখ হয়ে চেয়ে রইল। ভাঁটা গড়িয়ে নদীতে জোয়ার আসলো। জোয়ার গড়িয়ে আবার ভাঁটা। দিনের পর রাত। রাতের পর দিন। চরাষ্ণলের সবাই ঘরে ফিরলো কিন্তু মিয়া সাব ফিরলনা। তবে এখন মিয়ার বউকে এক সাথে দুইটা ঘরের চিন্তা করতে হচ্ছে। তার মধ্যে একটার পরিমাপ সাড়ে তিন হাত।

 পান্থজন জাহাঙ্গীর


শিক্ষক, ইউসেপ বাংলাদেশ