গণহত্যা দিবস আজ ও ইতিহাসের দায়মুক্তি

76

বিগত ১১ মার্চ ২০১৭ ইং তারিখ মহান জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে ২৫ মার্চ তারিখকে গণহত্যা দিবস পালনের প্রস্তাব পাশ হয়েছিল। একই সাথে এই দিনটিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি অর্জন ও উদযাপনের লক্ষ্যে জাতিসংঘ সহকারে অন্যান্য আন্তর্জাতিক মহলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাবটিও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। তারই ফলশ্রুতিতে আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রথমবারের মত পালিত হচ্ছে গণহত্যা দিবস। স্বাধনিতা লাভের দীর্ঘ কয়েক বছর পর অবশেষে দায় মোচন হলো ইতিহাসের এক নৃশংসতম অধ্যায়ের।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালীর জাতীয় জীবনে এক বিশাল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পর্বত সমতূল্য বৈষম্য, অন্যায়, শাসন-শোষণ, অত্যাচার-নির্যাতন, স্বার্থপরতা আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাঙালি জাতির আন্দোলন-সংগ্রাম ও প্রতিরোধসহ শত রকমের কর্মতৎপরতার সফল পরিণতি আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়েই প্রকৃত প্রস্তাবে সেদিনকার বাংলাদেশে পাকিস্তানি শাসনের কবর রচিত হয়ে গিয়েছিল। কেবল ক্যান্টনমেন্ট এলাকা ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানি পতাকা উড়তে দেখা যায়নি, গ্রাম-গঞ্জে পর্যন্ত সগৌরবে উড্ডীন হয়েছিল বাংলাদেশের মানচিত্র সমন্বিত লাল-সুবজ পতাকা। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই চলছিল দুর্বার অসহযোগ আন্দোলন। মার্চের ১৫ তারিখে রাজনৈতিক সমাধানের ধোঁয়া তুলে তৎকালীন পাকিস্তানের জঙ্গি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এলেন ঢাকায়। এই দিনই ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকসহ বিভিন্ন নেতার অনুরোধে দেশের ক্ষমতা তথা শাসনভার বঙ্গবন্ধু নিজের হাতে তুলে নেন। এক ঘোষণায় তিনি জানালেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি জনগণের কল্যাণের জন্যই এ দায়িত্ব তাকে গ্রহণ করতে হয়েছে। তাই ভবিষ্যৎ বংশধরদের মুক্ত মানুষ হিসেবে আত্মমর্যাদার সঙ্গে বসবাসের নিশ্চয়তা বিধান করার লক্ষ্যে যে কোনো ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকার জন্যও জনগণের প্রতি তিনি আহ্বান জানালেন।এর পরদিন অর্থাৎ ১৬ মার্চ থেকে শুরু হলো মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা। ইয়াহিয়ার আমন্ত্রণে জুলফিকার আলী ভুেট্টা পাকিস্তান থেকে এসে এই আলোচনায় যোগ দেন। ভুট্টো ইয়াহিয়া চক্র আলোচনার নামে আসলে সময়ক্ষেপণ করছিল মাত্র। ভেতরে ভেতরে চলছিল বাংলাদেশে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি। সেই প্রস্তুতির অংশ রূপেই পাক-সেনারা এখানে-ওখানে চালাচ্ছিল নানা উস্কানিমূলক অপতৎপরতা।

কেন গণহত্যা দিবস?

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সৈন্যরা সেনানিবাসে বাঙালি সেনাসদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তারা পিলখানাস্থ পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) সদর দফতর, রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক, খিলগাঁওয়ের আনসার সদর দফতরেও সশস্ত্র হামলা চালায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ট্যাংক দিয়ে পুরো ঢাকা শহরকে ঘিরে রেখে মেশিনগান আর ভারী অস্ত্রের গোলা-গুলিতে অসংখ্য বাড়িঘর বিধ্বস্ত করে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বাসভবন ও ছাত্রদের আবাসিক হলগুলোতে হামলা চালায়। মাত্র দুই দিনে দেশের বিভিন্ন শহরে ৫০ হাজারেরও অধিক নারী, পুরুষ ও শিশু প্রাণ হারায়। ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর ক্রমেই দেশব্যাপী সংগঠিত মুক্তিযোদ্ধা ও গেরিলাবাহিনী একযোগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর পাল্টা আঘাত হানতে আরম্ভ করে।

জাতিসংঘের বর্ণনায়, গণহত্যা মানেই এমন এক হত্যাযজ্ঞ যার লক্ষ্য একটি জাতি বা জাতিসত্তা কিংবা কোনো বিশেষ বর্ণের বা ধর্মবিশ্বাসের মানুষদের নাম নিশানা নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। বাংলাদেশের মাটিতে একাত্তরে এটাই করতে চেয়েছিলো পাকিস্তানী হানাদাররা। গণহত্যা যারা ঘটায় তারা মানব জীবনের প্রতি কখনোই শ্রদ্ধাশীল থাকেন না। তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি থাকে একনায়কত্ব ও স্বৈরাচারি মনোভাব। তারা মনে করে যে তাদের সংস্কৃতি আর মনোভাবটাই সর্বশ্রেষ্ঠ। যারা গণহত্যা পরিচালনা করে তাদের কাছে মানবতা মনুষ্যত্ব কোন মানে রাখেই না। আর এই বিষয়টি একেবারে হুবহু লক্ষ্য করা গিয়েছিল একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশে গণহত্যাকারী পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার আর স্বাধীনতা বিরোধীদের মাঝে।

১৯৭১ সালের গণহত্যা মানুষের ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায়। এ ধরনের গণহত্যার একটা অন্যতম কারণ হলো যে সকল সেনানায়ক দ্বারা পাকিস্তান শাসিত হচ্ছিল, তাদের কোনো মূল্যবোধে বিশ্বাস ছিল না। তারা কেবল তাদের স্বার্থ হাসিল নিয়েই উন্মত্ত ছিল এবং তা হাসিলের জন্য গণহত্যা করতেও পিছপা হয়নি। এ গণহত্যার ফলে আমরা যেমন আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারিয়েছি, তেমনি হারিয়েছি অসংখ্য সাধারণ নিরপরাধ মানুষকে। বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ইচ্ছা ছাড়া এই গণহত্যার আর অন্যকোন কারণ ছিল না। গণহত্যা যারা ঘটিয়েছিল অবশ্যই তাদের বিচার হতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত রাজনীতির কূটচক্রে পাকিস্তানি যেসব সেনা কর্মকর্তা এর সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচার আমরা করতে পারিনি। এটা আমাদের একটা বড় ব্যর্থতা। পাকিস্তানি মূল আসামিদের বিচার করা যেহেতু যায়নি তার কারণেই তাদের এদেশীয় দোসরদের বিচার করতে আমাদের বিলম্ব হয়েছিল। হয়তো এই রাজাকার-আলবদরদের বিচার আরও দ্রুত সম্ভব হতো যদি আরও আগেই পাকিস্তানি সমর নায়কদের বিচার করা সম্ভব হতো। বিশ্ব কূটনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

অবশেষে দীর্ঘ পথ পরিক্রমা শেষে চলতি মাসের ১১ তারিখ বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে ফেনী-১ আসনের মাননীয়া সাংসদ শিরিন আকতার ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যাকে স্মরণ করে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করার এবং আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবসের স্বীকৃতি আদায়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করার  প্রস্তাবটি সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ১৪৭ ধারায় উত্থাপন করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গণহত্যাসংক্রান্ত বিশেষ ভিডিও চিত্র ও স্থিরচিত্র প্রদর্শন করেন। বিরোধীদলীয় নেতাসহ ৫৬ জন সাংসদ ও মন্ত্রী এই প্রস্তাবের সমর্থনে ৭ ঘণ্টা যাবৎ আলোচনায় অংশ নেন। সর্বসম্মতিক্রমে ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাবটি পাস হয়। ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস পালনের সিদ্ধান্তটি ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

ফোবানি/আহমেদ মাসুদ বিপ্লব

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন