ক্যারিয়ারের জন্য ‘ক্ষতিকর বস’কে চেনার ৮ উপায়

117
carrier_thinking_boss

সংগত কারনেই সম্প্রতি নিজের ক্যারিয়ারের বিষয়ে দারুনভাবে ভাবতে হচ্ছে! নিজের ভাবনা-চিন্তার ফলাফল কিন্তু অনেক সময় নিজের অবচেতন মনে আপনাকে সঠিক ঠিকানায় নিয়ে যাবেই। এই যেমন ক্যারিয়ারের ভাবনা থেকেই জনৈক বসের প্রতি অধ:স্তন কর্মীর খোলা চিঠি।

বস ইজ অলওয়েজ রাইট?

“এটা কেমন কথা(!)সামান্য এবং তুচ্ছ কারনে আপনি বস এভাবে অন্য একজন বাইরের মানুষের সামনে বয়সে প্রায় আপনার কাছাকাছি এই অধীন কর্মচারির ব্যক্তিগত ও মর্যাদা বিষয়ে ভাবলেন না! বস ইজ অলওয়েজ রাইট-এই প্রবাদ বাক্যটাকে আমি ভীষনভাবে মেনে চলার চেষ্টা করি। এই মেনে চলার বদান্যতায় আপনি বস যখন বাৎসরিক সাফল্যের বিচারে ব্যক্তিগত রুটি-রুজির জায়গায় সরাসরি আঘাত করেন! কিছুই বলিনি। নিজের ভাগ্যকেই দায়ী করি। ভাবী এবার হয়নি,হয়তো সামনে  হবে। সব বিচারের ভার একমাত্র বিধাতার হাতেই দেই। রাত-দিন নিজের সাধ্যের সেরাটুকু দিয়ে একজন কর্মী হিসেবে যখন বঞ্চিত হই-তখনও বিশ্বাস ও ভক্তি নিয়েই কোন অনুযোগ করিনি। কারন বস ইজ অলওয়েজ রাইট।

বস, কেন আপনার প্রস্তাব রাখতে পারলাম না !

ক্যারিয়ারের জন্য ভাবতেই হয়। ভাবনা থাকতে হয়। এই প্রতিষ্ঠানে পূর্বাপর কর্মী হিসেবে পরিবারের তিন প্রজন্ম কাজ করে গেছে। উত্তোরাধিকার হিসেবে নিজে কর্মরত আছি। কিন্তু বস বলেই আপনি যখন প্রস্তাব করেন, আবেদন করে পদবী পরিবর্তন করতে! তখন বলি, “আমি মোটরবাইক চালাতে পারি না। ডায়াবেটিকসের রোগী বলে এই বয়সে মোটর সাইকেলটা হয়তো চালানো শিখা হয়ে যাবে কিন্তু একটা দুর্ঘটনা যে ঘটবে না, একটা এ্যাক্সিডেন্ট যে ঘটবে না- এই গ্যারান্টি কে দেবে? তখন হয়তো সারা জীবনের বেদনা নিয়েই একটা হাত বা পা কেটে ফেলতে হবে-সেই ভাবনা থেকেই আপনার প্রস্তাব রাখতে পারিনি এবং কোন আবেদনই করিনি।

বাইরের লোক আমাকে নয় প্রতিষ্ঠানকে সম্মান জানায়

মাত্রতো আর কটা দিন! প্রতিষ্ঠান যদি এই বর্তমান পদটি না রাখে? প্রতিষ্ঠান যদি কর্মী হিসেবে চুক্তিটা নবায়ন না করে? তবুও কোন অনুযোগ থাকবে না। কাজের ভুল-ত্রুটির জন্য আপনি অবশ্যই বলতে পারেন। বস হিসেবে এটা আপনার অধিকার-দায়িত্ব-কর্তব্য। একজন বস হিসেবে কর্মীর সেরাটা বের করে আনাটা পিতা হিসেবে একজন বসের দায়িত্ব। যদিও নিজের সেরাটা সবসময় দিতে সচেষ্ট ছিলাম, আছি এবং থাকবো। কর্মী হিসেবে এটা বিচারের ভার বস-পিতা-বড় ভাই-বন্ধুর মতো মুল্যায়ন করতে না পারেন, বিশ্বাস টীম মেট সহকর্মীরাই করবে। সত্যটা বলার মানুষের সংখ্যা এখনো নি:শেষ হয়ে যায়নি। বিধাতার উপর অগাধ বিশ্বাস থেকেই কথাটা বলছি। কিন্তু বস, তুচ্ছ ও নিছকই সামান্য একটা বিষয়ে এমন রূঢ় ও অসৌজন্যমুলক আক্রমন সত্যি একজন মানুষ হিসেবে আমাকে চরমভাবে অপমানিত করেছে। ওখানে বাইরের মানুষ ছিলো, যারা প্রতিষ্ঠানের বস হিসেবে আপনাকে যতটুকু শ্রদ্ধা বা সম্মান করে ঠিক ততটুকুই দায়িত্বপালনকারী হিসেবে আমাকেও সম্মান জানায়। এই সম্মানটা আমার নয়- এটা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সম্মান। কাল যখন আমি এই দায়িত্বে থাকবো না, তখন এই মানুষগুলো আমাকে এই সম্মানটুকু অবশ্যই হয়তো করবে না। বস ইজ অল অয়েজ রাইট- বলেই বলছি, সেদিন আপনি বস যেই কথাগুলো বললেন, সেই কথাগুলো আপনার রুমে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললে কি এমন ক্ষতি হতো? শুরুটা ডাইনিং রুমে কিভাবে হলো ঠিক জানি না এবং শেষটা হলো ওযার্ক ষ্টেশনে! তাও আবার অফিসের বাইরের লোকের সামনে।  আমারতো মনে হয় এখানে সম্মানটা সর্বশেষ গেছে আপনার ও আমার এবং অবশ্যই আমাদের দু’জনেরই এবং কিছুটা প্রতিষ্ঠানের।

প্লিজ বস, ভুল কিছু বলে থাকলে ক্ষমা চাই! সরি।

আপনি বস যখন উত্তেজিত হয়ে কথাগুলো বলছিলেন,আপনি কাঁপছিলেন। এটা বস আপনার শরীরের জন্যও শুভ নয়। এই ঘটনা বস আপনার জন্য প্রথম নয়। এই বিষয়ে অনুযোগ আমি সবার সামনেই করেছিলাম। সেদিন আমার বুজার ভুল ছিলো, সহজ ও সত্যি কথা যায় না বলা সহজে। সেদিনের ভুলের জন্য তাই আজ  ক্ষমা চাই। গতকালের ঘটনায় সারারাত ঘুমাতে পারিনি। সারারত বিছানায় ছটফট করেছি। এই অপমান আমার উপর কেন! ভুল যদি কিছু করেই থাকি(!) প্লিজ বস, আমার ফ্যামিলি আছে। সন্তান আছে। পরিবারে মা আছে। প্লিজ, আমাকে ক্ষমা করে দিন।

ক্যারিয়ার বিষয়ে উপরোক্ত বক্তব্য একজন কর্মীর। যে কিনা বস ও নিজের নাম গোপন রাখতে চান। মুল আলোচনায় ফিরে আসি। জানুন ক্যারিয়ারের জন্য “ক্ষতিকর বস”কে চেনার ০৮ টি উপায়।     

ক্যারিয়ারের জন্য একজন পীড়াদায়ক বস শুধু আপনার কর্মক্ষেত্রকে বিষময় করেই তোলে না। বরং আপনার ব্যক্তিগত জীবনকেও প্রভাবিত করে। “টেম ইয়োর টেরিবল অফিস টেরেন্ট: হাউ টু ম্যানেজ চাইল্ডিস বস বিহ্যাভিয়র এবং থিরিভ ইন ইয়োর জব” বইয়ের লেখক লিন টেলরের প্রতিষ্ঠানের করা একটি জরিপে দেখা গেছে, কর্মীরা সপ্তাহে ১৯.২ ঘণ্টা ব্যয় করেন তাদের বস কী করেন কিংবা বললেন সেটা নিয়ে চিন্তা করে, যার মধ্যে ১৩ ঘণ্টা ব্যয় করেন কাজের সময় এবং ৬.২ ঘণ্টা ব্যয় করেন ব্যক্তিগত সময়ে।

লিন টেলর বলেন, একজন পীড়াদায়ক বস আপনার ক্যারিয়ার এবং ব্যক্তিগত জীবনকে বিষময় করে তুলবে। অপরপক্ষে একজন ভালো বস আপনার ক্যারিয়ারকে সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করবেন।

আপনার ক্যারিয়ারের জন্য ক্ষতিকর এমন বস চেনার জন্য কিছু চিহ্নর কথা তুলে ধরা হয়েছে এমএসএন-এর এক প্রতিবেদনে।

কিভাবে চিনবেন আপনার ক্যারিয়ারের জন্য পীড়াদায়ক বস!

এক। বসের যদি প্রিয়পাত্র থাকে

প্রতিষ্ঠানে আপনার বসের যদি প্রিয়পাত্র থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানের জন্য যত কাজই করেন তার কাছে মূল্যায়িত হবে না। তিনি এটাও বুঝতে পারবেন না যে, তিনি আপনার সঙ্গে অন্যায় করছেন। টেলর বলেন, আপনি কী কাজ করলেন অথবা কী অর্জন করলেন, সেটা কোনো ব্যাপারই হবে না এবং এটা ওইসব তোষামদকারী মানুষদের দ্বারা খর্ব হবে।

দুই। বস যদি অতিরিক্ত আশা দেখান

অতিরিক্ত আশা দেখানো বসরা অবিশ্বাসযোগ্য। আপনার বস যদি আপনার পদোন্নতি, দায়িত্ব বৃদ্ধি, বেতন বৃদ্ধির আশ্বাস দেন এবং কাজের ক্ষেত্রে নীরব থাকেন, তবে আপনার উচিত ই-মেইলের মাধ্যমে তার সঙ্গে আলোচনা করা। যদি ই-মেইলে কোনো উত্তর না আসে, তবে এখানে আপনার উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কারণ রয়েছে।

তিন। বস যদি আড়ালে কথা বলেন

যখন আপনার বস কর্মীদের সম্পর্কে কানাঘুষা করেন, তবে তা খুবই বিশ্রী এবং অপেশাদারী একটি কাজ। দেখবেন আপনার সঙ্গে যেমন অন্যের বিষয়ে বলে, তেমনই আপনাকে নিয়েও অন্যের কাছে কানাঘুষা করেন।

চার। বস যদি প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন

বস সকালে আপনাকে এক কথা বলবেন, দুপুরের খাবারের পর আবার আরেক গল্প দিবেন। এ ধরনের বসের সঙ্গে কাজ করা খুবই সমস্যাদায়ক। কারণ এটা আপনার টিমের উদ্যোগ ও কাজকে প্রভাবিত করে।

পাঁচ। ভুলের জন্য দোষারোপ কিন্তু সফলতায় কৃতজ্ঞতা জানান না

আপনার কোনো ভুল হলে বস যদি সঙ্গে সঙ্গেই আপনাকে সকলের সামনেই অপমান করেন, তবে আপনি বসকে পীড়াদায়ক মনে করতেই পারেন। কারণ ভালো বসরা জানেন যে, কর্মীর ভুলের বিষয়ে তার সঙ্গে একান্তভাবেই কথা বলা উচিত। এছাড়াও ভালো বসরা আপনার কাজের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাবেন।

ছয়। আপনার কাজ কখনোই যথেষ্ট নয়

আপনার বস যদি আপনাকে প্রচুর কাজ দেন এবং আপনি প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা করে সপ্তাহে ৭ দিন কাজ করলেও তিনি সন্তুষ্ট না হন, তবে আপনাকে বুঝতে হবে আপনি কখনোই তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন না। দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় কাজ তো দূরে থাক, আপনার ব্যক্তিগত জীবনেও এর প্রভাব পড়বে। এ অবস্থায় আপনি যদি কথা না বলেন তবে তিনি আপনাকে পুশ করতেই থাকবেন।

সাত। আপনার বস কখনোই ভুল নন

আপনার বস যদি ভুল স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে বুঝতে হবে তিনি আপনার জন্য কখনোই তার জায়গা থেকে সরবেন না। লিন টেলরের এক জরিপে অংশগ্রহণকারী ৯১ শতাংশ কর্মী বলেছেন, ম্যানেজার হিসেবে ভুল স্বীকার করা কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আট। বস যদি আপনাকে তার মতোই দেখতে চান

বেশিরভাগ মানুষই অন্যদেরকে তার মতো দেখতে পছন্দ করেন। কিন্তু ভালো বসরা জানেন, ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্বই টিমকে আরও উন্নত করতে পারে। যদি আপনার বস আপনার সকল কাজেই তার প্রতিচ্ছবি দেখতে চান, তবে আপনি তাদের একটি কিংবা দুটি পরামর্শ গ্রহণ করুন এবং বাকিগুলোর জন্য তাকে ধন্যবাদ দিন। নিজের জায়গাতেই থাকুন এবং আপনার বসের পরামর্শকে যে আপনি মূল্যায়ন করেছেন তাকে সেরকমটা দেখান।

ফোবানি/হামিদ

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন