এডভোকেট মমিন উল্লাহ্ : নির্লোভ এই মানুষটির পরিবারের জন্য একটি সরকারী বাসা স্থায়ী বরাদ্ধ চাই

92
মরহুম এডভোকেট মমিন উল্লাহ্, অত্যন্ত সহজ-সরল আর জনদরদী একজন নেতা হিসাবে  সাধারণ মানুষের বিপদ-আপদে সব সময ছুটে যেতেন তিনি। দলীয় কর্মীদের হয়ে আইনী লড়াইটাও লড়তেন বিনে পয়সায়। ছিল না কোন অর্থের লোভ, ছিলনা কোন উচ্চাকাঙ্খাও। অত্যন্ত সহজ-সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত এই মহান নেতা মরহুম এডভোকেট মমিন উল্লাহ্ আজ আর আমাদের মাঝে নেই। নোয়াখালীবাসী হারিয়েছে একজন নিবেদিত প্রাণ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিককে।
মরহুম এডভোকেট মমিন উল্লাহ্ ছিলেন একজন সাদা মনের মানুষ ছিলেন। বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে অত্যন্ত সুপরিচিত, আদর্শবান ও জনদরদী মানুষ ছিলেন। জন্ম ১৯৪২ সনে নোয়াখালী জেলার সদর থানাধীন নেয়াজপুর ইউনিযনের নেয়াজপুর গ্রামে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তিনি ১৯৬৯ সনে গণঅভূথ্যানে বৃহত্তর নোয়াখালী জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে মুজিববাহিনীর বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার ডিপুটি কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৮৬ সন থেকে ২০০৩ পযন্ত দীর্ঘ ১৮ বছর বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের নোয়াখালী জেলার সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সেন্ট্রাল ল’ কলেজ থেকে এলএল.বি পাশ করে ১৯৭৬ সনে তিনি ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে যোগদান করেন। ১৯৮৪ সনে নোয়াখালী আইনজীবী সমিতিতে সদস্যভূক্ত হয়ে নোয়াখালীতিই স্থায়ীভাবে আইনপেশা শুরু করেন। ২০০৭ সনে নোয়াখালী জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি তার জীবদ্দশায় বহু প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তিনি ভুলুয়া ডিগ্রী কলেজ, নেয়াজপুর হাই স্কুল, নেয়াজপুর হাইস্কুল সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয, ভুলুয়া কিন্ডার গার্ডেন, ভুলুয়া ফাইন্ডেশন, নেয়াজপুর জামে মসজিদ ও ফোরকানিয়া মাদ্রসা, কাসেম বাজার জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জেলা শহর মাইজদিতে প্রতিষ্ঠিত সার্জেন্ট জহুরুল হক ও শহীদ ওহিদুর রহমান ওদু স্মৃতি সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। চার কন্যা সন্তানের জনক এডভোকেট মমিন উল্লাহ্ দীর্ঘদিন অসুস্থ্য থেকে গত ১৫ এপ্রিল ২০১৭ ইং শনিবার সন্ধ্যা ৬.১৫ মিনিটের সময় ৭৮ বৎসর বয়সে ঢাকার একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। ঢাকা ও নোয়াখালীতে জানাযা নামাজ শেষে তাকে তাঁর নিজের জন্মস্থান নেয়াজপুরে তারই প্রতিষ্ঠিত ভুলুয়া ডিগ্রী কলেজ মাঠে কবরস্থ করা হয়।
একজন মাটির মানুষ এডভোকেট মমিন উল্লাহ্ আজ চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন নিজ গ্রামের মাটির বুকে। নিজ পরিবারের মাথা গুঁজবার জন্য একটি স্থায়ী বাসস্থানের বন্দোবস্ত হওয়ার পূর্বে নিজেই চিরস্থায়ী কবরবাসী হয়ে যাওয়াটা বড্ডবেশী বেমানান তাঁর ক্ষেত্রে। আজ ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের নিন্মস্তরের পাতি নেতাটাও যেকোন উপায়ে হোক একটা বাড়ীর মালিক বনে গেছেন! অথছ নোয়াখালীর প্রতিষ্ঠিত এই নির্লোভ নেতার নিজস্ব কোন বাসা বা বাড়ী নেই এই শহরে আজ অবধি। জীবনের দীর্ঘকাল কাটিয়ে গেছেন অন্যের বাসা ভাড়া করে তাতে পরিবার পরিজন নিয়ে।
নোয়াখালী’র মাইজদীতে প্রভাতী দীঘির দক্ষিণ পাড়ে যে কথিত মুক্তিযোদ্ধা কলোনী’র অবস্থান, সেখানে অনেকের সাথে তিনিও একটি প্লট বরাদ্ধ পেয়েছিলেন তিনি। অবশ্য কথিত ঐ মুক্তিযোদ্ধা কলোনীতে শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধারাই নয়, প্রশ্নবিদ্ধ আরো অনেকেই প্লট বরাদ্ধ পেয়ে কিংবা সুযোগসন্ধানীদের কাছ থেকে প্লট কিনে বাড়ী-ঘর তুলে বসবাস করতে আরম্ভ করে। জীবনের সকল সঞ্চয় একত্র করে মমিন উল্লাহ্ সাহেবও শখের একটি একতলা বাড়ী করেছিলেন সেখানে। অথছ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! বেশীদিন সেই বাড়ীতে দিন-রাত কাটানোর সৌভাগ্য হলোনা উনার। তৎকালীন এমপি আর জেলা প্রশাসনের কারসাজিতে অজ্ঞাত কোন কারণে একদিন ভেঁঙ্গে দেয়া হলো সেই মুক্তিযোদ্ধা কলোনীর বাসাগুলো। বাদ যায়নি তাঁর একতলা লালরঙের বাড়ীটিও। আবারো সেই ভাড়া বাসাই হলো উনার পরিবারের বাসস্থান! আজোও ভাঙ্গা সেই বাড়ীটি তার ক্ষতচিহ্ন নিয়ে দৃশ্যমান রয়েছে ঐস্থানে।
আপাতত আজ আর বেশী কিছু বলতে বা লিখতে চাইছিনা আর। শুধু একটা সরকারী বাসা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দাবী জানাচ্ছি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান এই বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম এডভোকেট মমিন উল্লাহ্ চাচার পরিবারের বসবাসের জন্য। এইদেশে অনেক চোর-ছ্যাঁচড়ারাও নানা উপায়ে রাষ্ট্র কর্তৃক পুরস্কৃত হয়েছেন, বাসা-বাড়ী কিংবা বিশালাকার সরকারী প্লট বরাদ্ধপ্রাপ্ত হয়েছেন। শুধুমাত্র ১ টাকায় বরাদ্ধপ্রাপ্ত রাজকীয় সরকারী বাসাগুলোর কথা বাদই দিলাম। আমরা রাজকীয় বাড়ী চাইনা। চাইনা বিশালাকার সরকারী ভূমিও। শুধুমাত্র সম্মানের সাথে বসবাস করবার উপযোগী একটি মাঝারী কি ছোট আকারের হলেও মাইজদী শহরে একটি সরকারী বাসা স্থায়ীভাবে উনার পরিবারের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হোক। প্লট বরাদ্ধ দিয়ে কোন লাভ নেই। কারণ, মমিন উল্লাহ্‌ সাহেবের পরিবারের এখন আর সেই সামর্থ নেই নতুন করে আবার একটি বাড়ী তৈরী করবার। তাই একটা বাসাই প্রয়োজন।
নোয়াখালীর সর্বস্তরের সুশীল সমাজ আর ক্ষমতাশীল আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, এই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানান। মন্ত্রী সাংসদ মহোদয়গণ কবর জিয়ারত আর ফুলের মালা প্রদান করেই উনাদের দায়িত্ব সেরেছেন! যে মানুষটি তার নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে আমাদের স্বাধীন দেশে বাসা-বাড়ী বানিয়ে থাকবার সুযোগ তৈরী করে দিয়েছিলেন, আজ তার নিজের পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়াটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব নয় কি?

ফোবানি/আহমেদ মাসুদ বিপ্লব

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন