এই বুঝি প্রেম!

90

পান্থজন জাহাঙ্গীরের গল্প।। এই বুঝি প্রেম ! 

– কোথায় পড়?

– আমবাগান টেকনিক্যাল স্কুলে।

– কিসে পড়?

– বিউটিশিয়ান ট্রেডে।

( এই বুঝি প্রেম ! গল্পের কথোপকথন এটি। প্রেম এমনই। গল্পের দু’টি চরিত্র বাহার ফেরিওয়ালা। বাহানা কিশোরী।পড়াশুনা করে ইউসেপ বাংলাদেশ পরিচালিত আমবাগান টেকনিক্যাল স্কুলে। এক নি:শ্বাসে পড়ে শেষ করুন। এই বুঝি প্রেম।)

পান্থজন জাহাঙ্গীর।গল্প লিখেন। কবিতা দিয়েই শুরু। ব্লগিং করেন। জন্ম: ১৫ অক্টোবর, ১৯৮২,বাঁশখালী। পড়াশুনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ফিলোসফিতে স্নাতকোত্তর। শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখি করেন। একজন মননশীল লেখক হিসেবে ইতিমধ্যে কুঁড়িয়েছেন প্রশংসা। ফোকাস বাংলা নিউজ এর চিলেকৌঠায় ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে ক’টি গল্প ও কবিতা। পাশাপাশি স্বনামধন্য সংবাদপত্র ও লিটলম্যাগে প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা, ছোটগল্প। বর্তমানে সক্রিয়  আছেন অনলাইন, নিউজ পেপার এবং ব্লগে। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প ” স্বপ্নগুলির মৃত্যু।”( দৈনিক পূর্বকোণ), প্রথম প্রকাশিত কবিতা “ফিরে থাকা”(লিটল ম্যাগ, মালঞ্চ), প্রথম প্রকাশিত অনুবাদ গল্প “রাজা” ( দৈনিক প্রথম আলো) ও প্রথম গ্রন্থিত কবিতার বই ( সম্মেলিত) : শূন্যের কবিতা( প্রকাশনায়: বাঙলায়ন, ঢাকা) — সম্পাদক।

এই বুঝি প্রেম!

এই শহরের প্রত্যেকটা অলি-গলি বাহারের চেনা। শহরের এই অলি-গলি চিনতে চিনতে কখন জে মেয়েটিকে  চিনে ফেলল বাহারের স্মরনে আসছেনা। এই আলতা, স্নো, ফিতা,চুড়ি,জরি-চুমকি ইত্যাদির বিকি-কিনি,দর কষা-কষির সাথে চোখ দেখাদেখি,মুখ দেখাদেখি আর কি। রেশমী চুড়িতে ভরা নরম একজোড়া হাত যেন মাচানে দোল খাওয়া লতাপুঁয়ের ডগা।বাহার এক হাতে হ্যান্ড শোকেজ ও অন্য হাতে চুড়ির পেটেরা নিয়ে এমন নেক নজরে ঐ যুগল হাতে দৃষ্টি ফেলত কখন জে তার জোড়া চোখ নিজেরই সদাই করা আলতার রঙে রঙিন হয়ে ওঠা তা চিকচিকে সাদা জল চোখের কোণাই জমা না হওয়ার আগ পর্ঝন্ত বুঝতে পারতো না। মেয়েটির ধবধবে শাদা হাতযুগল আর পানা পানা চোখ বাহারকে চুম্বকের মতো টানতো। তার মতে মেয়েটিকে এক নজর দেখার জন্য এই তার চুড়ি ফেরি করাই সার্থক। তাই প্রতিদিন একবার করে হাঁক চেড়ে এই দিকে যাওয়া তার পেশাই নেশা হয়ে দাঁড়িএেছে। তাই দীর্ঘ দিনের পুরানো আলতার বোতল আর বিক্রির অয়োগ্য কাচে যর ও সস্তা প্লাস্টিকের চুড়িগুলো কাস্টমারের ভৎসনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এগুলো ঝেড়ে-জুড়ে পরিস্কার করে নতুন বাহারি ফ্যাশনের মাল ভরে সে আজ সকাল সকাল লেইস ফিতা লেইস….. বলে হাক দিয়ে চিরচেনা সেগুন বাগানের সেই প্রিয় গলির ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। মুর্হূতেই বান্ধবীদের নিয়ে তার সেই শাদা পরী বের হল। বাহারকে দেখে প্রথমেই একটা হাসির রোল পড়ে গেল। নিজের বেশ-ভূষা না ব্যবসাই ক্ষুদ্র পুঁজির পরিবর্তন দেখে এই হাসি? না অন্য কিছু? তা বাহার বুঝতে পারলনা। মেয়েগুলো ভালোই টিজ করা শিখছে। কিছুক্ষণ পর আবার লাস্যপনা! বাহারের নিজের কাছে ভালো লাগলেও তার কিন্তু মোটেও ভালো লাগছেনা। কারণ,বাহারকে যে তার ভালো লাগতে শুরু করছে তা তার সখিদের কাছেও আর অজানা রইলনা। এতক্ষন যা হইছে তা খানিকটা দুর হতে এবার জেমাত্র কাধের ব্যাগ আর হাতের সুকেজটা মাটিতে রাখল ঠিক তখনই আবার টিজ ‘যাও তোমার প্রেমিক আইছে।’ এবার তার ভালো লাগাকে বাস্তবেই তারা শুধু সমর্থনই দেইনি  না বরং কাছাকাছি আসার সুযোগও করে দিল ।  বাহার চোখে চোখ রাখল। তারপর মুখ খুলল।

-কি নাম?

-বাহানা

-বা! আমার নামের আদ্য অক্ষর দিয়েই!

-না,আসল নাম কিন্তু বাহানা ছিলনা।

-কি ছিল?

-রেহানা। ডাকা-ডাকিতে বিকৃত হয়ে গেছে।

-কোথাই পড়?

-আমবাগান টেকনিক্যাল স্কুলে।

-কোন ট্রেডে?

-বিউটিসিয়ান ট্রেড।

-বিউটিসিয়ান ট্রেডে বুঝি সুন্দরীরাই পড়ে?

-এমন কোন কথা নেই।

-মা-বাবা আছে?

-নেই।

-বাসায় কার সাথে থাক?

– নানী আর মামার সাথে।

-প্রিয় শখ?

-চুড়ি সংগ্রহ করা।

-চমৎকার।

-কি হল? চুপ কেন?

-আর কিছু বলবে?

-না।

-তাহলে এত কিছু কেন বললে?

-কিছু একটা বলার জন্য।

-কিছু একটা কি?

-না এই কিছু একটা আর কি

-সেই কিছু একটা কি?

-আমার চোখের দিকে তাকাও

-কি?

-দেখ না ভাল করে।

-দেখছি তো।

-কি দেখতে পাচ্ছ?

-নিজেকে।

-আরো কাছে আস।

-এবার কি দেখতে পাচ্ছ?

-না রে কিছুই না। তোমাকে ছাড়া তো আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।

-হ্যাঁ আমিও। আমিও তোমাকে ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। আমি অন্ধ। এই আমি অন্ধ হয়ে গেছি। তুমি ছাড়া আমার জগত অন্ধ। তোমার রুপের ঝলকে পুড়ে ছাই হয়েছে হৃদয়। হারিয়েছি  জ্যোতি তোমার চোখের অতলে। আমার তৃষ্ণার্ত হৃদয় চাতকের মতো তোমাকে এতদিন ডাকতে ডাকতে এতই ক্লান্ত যেন তুমি আমার মরুর বুকে উড়ে যাওয় কোন  সামুদ্রিক গানচিলের  পালকঝরা একফোঁটা নোনাজল। মরিচিকায় আশার আলো। যার স্পর্শে আজ আমি গিরিবাজ কবুতরের মতো সরব ডিগবাজিতে ঘোষণা করছি তোমার নৈঃশব্দে আমি বধির, তোমার অনস্তিত্বে আমি বাকহীন, শ্রীহীন। এই  অন্ধ, বধির, শ্রী হীনের অস্তিত্বের জন্য তোমাকেই বড় প্রয়োজন। কারণ একটাই। তোমাকে ভালবাসি। এই ভালবাসাই আমি এতকাল যাবত ফেরি করছি। শুধু তোমার জন্য। আমি তোমার ভালবাসারই ফেরিঅলা। বলতে বলতেই রহমতের গলা ধরে ওঠল। এটাই বলতে ছেয়েছি বাহানা।

পড়ুন পান্থজন জাহাঙ্গীর রচিত গল্প লালু ও কাঠবিড়ালী

পড়ুন পান্থজন জাহাঙ্গীরের গল্প শহরবানু

পড়ুন পান্থজন জাহাঙ্গীরের গল্প ত্রিখন্ডিত

হঠাৎ বাহানার ঘোর কাটল। ছাড়! ছাড়। হাত ছাড়! ধুত্তেরি লোকজন কি বলবে! বাহানা হাতদুটো ছাড়িয়ে নিল। তারপর কানের দুল জোড়া রেখে চলে গেল।

-কানের দুল নিয়ে যাও…।

বাহানা মনে মনে বলল,কানের দুল নিয়ে কি হবে আর। যার জন্য এই কানের দুল সেই তোমাকেই তো পেয়ে গেলাম। তুমিই আমার কানের দুল। গলার হার। আমার তনুর বসন ও ভূষণ । রহমতের স্পর্র্শে বাহানার আকাশের জমাট মেঘখন্ডের আড়ালে  যেন হটাৎ বিদ্যুৎ চমকে গেল । বাহানা একটু সিক্ততা অনুভব করল। এই বুঝি প্রথম ভালবাসা, প্রেম ! এই বুঝি রোমাঞ্চ!

লেখকের সাথে যোগাযোগ dhukki@gmail.com 

 

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন