মানব সেবায় উন্মেষ – সবুজ পাহাড়ে প্রথম আস্থার স্থল

348

সর্বত্র সর্বদা মানবসেবায়” এই মূলমন্ত্রে এগিয়ে চলেছে উন্মেষ (স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন)। রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েই মানব সেবায় উন্মেষ এক নতুন দিগন্ত চালু করেছিল পাঁচ বছর পূর্বে। বিগত পাঁচ বছরে উন্মেষের অর্জনের পরিমাণটা সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে। বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলার পাশাপাশি বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলেও উন্মেষ আজ এক পরম আস্থার নাম। অস্বচ্ছল পরিবারের কোন অসুস্থ রোগীর চিকিৎসা সহায়তা কিংবা রক্তের অভাবে নিশ্চিত কোন মৃত্যূপথযাত্রীর অকাল মৃত্যূকে ঠেকিয়ে দিতে উন্মেষ বদ্ধপরিকর তার জন্মলগ্ন থেকেই। গত পাঁচ বছরে উন্মেষের আন্তরিক সহযোগিতায় দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছেন অনেকেই। ফিরিয়ে আনবার আয়োজন চলছে আরো অনেকেরই। দূরারোগ্য ক্যান্সারকে জয় করে ফিরে এসেছে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র নিশান চাকমা, হৃৎপিন্ডের ফুটো বন্ধ করা গেছে পারমী চাকমার, শ্রবণ প্রতিবন্ধী ছোট্টশিশু উজো চাকমার কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে, কিডনী রোগী স্বপন চাকমার ডায়ালাইসিস চলছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া রোগী সুমনা চাকমা, গাড়ি এক্সিডেন্টে মারাত্বক আহত রোগী থুইচিং মারমা, জরায়ু টিউমারের রোগী নমিতা চাকমাদের চিকিৎসার তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে উন্মেষ তাদের ফিরিয়ে দিয়েছে এক নতুন জীবন। আজ উন্মেষের সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবক সংখ্যা প্রায় চার শতাধিক। মানব সেবায় উন্মেষ এ পর্যন্ত সতেরশর অধিক রোগীকে বিনামূল্য রক্তদান করে এবং বিগত পাঁচ বছরে ৭০ বারের কাছাকাছি বিভিন্ন মেলা-উৎসব-ধর্মীয় অনুষ্ঠান, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং গ্রামগঞ্জে রক্তগ্রুপিং ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেছে। আমার সাথে উন্মেষের পরিচয় আমার প্রায় তিন সহস্রাধিক আদিবাসী বন্ধুর মত ভার্চুয়ালিই। উন্মেষের বর্তমান নির্বাহী পর্ষদের উল্রেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য-সদস্যার সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্রধরে আজ উন্মেষ আমারও একটি পছন্দের সংগঠন। সেই উন্মেষের ৫ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রকাশিতব্য ম্যাগাজিনের জন্য একটি লেখা চেয়েছিলেন সংগঠনটির সম্মানিত প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি দীপেন চাকমা। কি লিখবো, কি লিখা যায়- ভাবতে ভাবতেই শেষ পর্যন্ত বন্ধু দীপেনকে মধ্যমণি সাজিয়েই লিখে ফেললাম এক কল্পকাহিনী। যদি কখনো পার্বত্য চট্টগ্রাম গিয়ে কোন দূর্ঘটনার শিকার হয়ে পড়ি তবে নিশ্চিত এই কল্পকাহিনীটাই হয়ে যাবে তখন সত্য।

উন্মেষের সহযোগিতায় শ্রবণ প্রতিবন্ধী উজো চাকমা ফিরে পেয়েছে তার শ্রবণশক্তি।       অপারেশনের পূর্বে ও পরে উজো চাকমা।            ছবি কৃতজ্ঞতা: দীপেন চাকমা

 

বাংলাদেশের পার্বত্য তিনটি জেলা বাদ দিয়ে সমতলের বাদবাকী ৬১টি জেলার যে কোন একটির বাসিন্দা বলে ভাবুন নিজেকে। ছুটির আনন্দ উপভোগের লক্ষ্যে ধরে নিন এবার আপনি বেছে নিয়েছেন তিন পার্বত্য জেলার একটি রাঙামাটিকে, কিংবা ছুটির মেয়াদ বিবেচনায় তিনটি জেলাই বেছে নিলেন বিনোদন লাভের আশায়। একাকী অথবা পরিবারের বাকী সদস্যদের সাথে নিয়ে বেড়াতে এলেনও যথারীতি। শুরুতেই বিশ্রাম আর রাত্রিযাপনের জন্য হোটেল-মোটেল-গেষ্টহাউস বাছাইয়ের ঝামেলা সেরে নিয়ে খানিক বিশ্রামের পাশাপাশি আহার পর্বও শেষ। এবার আগে থেকেই সিডিউল সাজিয়ে রাখা ভ্রমণস্থানগুলো এক এক করে পরিদর্শনের পালা।

হোটেল ছেড়ে বের হবার পূর্বে এক মহুর্তের জন্যও আপনার ভাবনায় আসেনি আনন্দময় এবারের এই ভ্রমণে কতখানি বিষাদ আর দূর্যোগ সামনে অপেক্ষা করে আছে আপনার জন্য! হোটেলের অপর পাশ থেকেই পার্বত্য জেলায় চাঁদের গাড়ী বলে পরিচিত জীপগাড়ীতে চড়তে হবে এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় পাহাড়ী ঝর্ণার অবস্থানস্থলে পৌঁছাবার জন্য। হোটেলের ফটক ছেড়ে রাস্তায় নামলেন রাস্তা পার হবেন বলে। ডান-বাম দেখে পা বাড়ালেন। দুইপাশে বলতে গেলে ফাঁকাই ছিল। আপনি দুই কদম এগুলেনও, কিন্তু রাস্তার অপর পৌঁছানো আর হয়ে উঠলোনা আপনার। হঠ্যাৎ বেপরোয়ারা গতির এক মোটরবাইক কিছু বুঝে উঠবার আগেই প্রচন্ড বেগে আঘাত করলো আপনাকে। ছিটকে পড়লেন বেশ খানিকটা দূরে, জ্ঞান হারালেন মুহুর্তেই।

বেশ কিছু সময় পর নিজেকে আবিস্কার করলেন অচেনা কোন এক হাসপাতালের বেডে। নাড়াচাড়া করতে গিয়ে টের পেলেন সমস্ত শরীরজুড়ে প্রচন্ড ব্যাথা। মুখ মন্ডলের বলতে গেলে পুরোটাই ব্যান্ডেজে ঢাকা পড়ে গেছে। দুই হাতের একটিতে স্যালাইন আর অন্যটিতে রক্ত সঞ্চালনের সরঞ্জাম লাগানো। রক্তের ব্যাগটার দিকে তাকালেন এবার, অপলক তাকিয়েই রইলেন। জ্ঞান ফিরতে দেখে পাশেই অপেক্ষারত নার্স আরো কাছে এগিয়ে এলেন। আপনি কিছু বলবার আগেই জানালেন ইতিমধ্যে আপনার মুখ মন্ডলে মোটামুটি বেশ জটিল মানের একটি অপারেশন হয়ে গিয়েছে। মোটরবাইকে প্রচন্ড আঘাতে আপনার নাক-মুখ-চোঁয়ালের প্রায় সম্পূর্ণটাই থেঁতলে গিয়েছিল। রাস্তা থেকে লোকজন তুলে হাসপাতালে আনবার পরপরই জরুরী ভিত্তিতে অপারেশন থিয়েটারে নিতে হয়েছিল আপনাকে। শরীর থেকে প্রচুর রক্ত যাওয়ার কারণে অপারেশনকালীন সময়েই একব্যাগ রক্ত জরুরীভাবে দিতে হয়েছে। এখন দ্বিতীয় ব্যাগের রক্ত সঞ্চালন করানো হচ্ছে আপনার শরীরে।

দূর্ঘটনা, হাসপাতাল, অপারেশন কথাগুলো শুনে যতটুকু অবাক হলেন তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশী অবাক হয়েছেন দ্বিতীয় রক্তের ব্যাগের কথা শুনে। খুব ভাল করেই জানেন আপনার রক্তের গ্রুপটি সবচেয়ে রেয়ার একটি গ্রুপ। সচরাচর এই গ্রুপের এক ব্যাগ রক্ত খুঁজে পেতেই প্রচন্ড রকমের কাঠখড় পোড়াতে হয়। আশেপাশে দুই চার জেলা চষে বেড়িয়েও এক ব্যাগ রক্ত মিলানো যেখানে দায় হয়ে পড়ে সেখানে স্বল্প সময়ের ব্যাবধানে দুই ব্যাগ রক্তের সন্ধান আসলেই ভীষন আশ্চর্যের বলে মনে হলো আপনার কাছে। কথা বলতেও খুব কষ্ট হচ্ছিল। তারপরও ব্যাথা সহ্য করে নার্সকে রক্তের উৎসটার কথা জানতে চাইবার লোভ সামলাতে না পেরে নার্সের কাছে উৎস জানতে চাইলেন। নার্স বললেন, ভাগ্যিস “উন্মেষ” ছিল, নতুবা আজ হয়ত আপনাকে বাঁচানোটাই ভীষন কঠিন হয়ে পড়ত। রক্ত আর উন্মেষ এই দুইয়ের যোগসূত্র বুঝতে না পেরে বোকার মত নার্সের দিকেই তাকিয়ে রইলেন অনেকটা সময়। আর তখন হ্যাংলা লিকলিকে গড়নের এক যুবক এসে দাঁড়ালেন আপনার বেডের পাশে, দেখে জাতিতে চাকমা বলেই মনে হলো। হাসিমুখ করে আপনার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, ‘এখন কেমন আছেন?’

অনেক চেষ্টা করেও চাকমা যুবকটিকে কোনভাবেই পূর্ব পরিচিতদের কাতারে দাঁড়া করাতে পারলেন না। নার্স হয়তো লক্ষ্য করেছিলেন বিষয়টা। নিজ থেকেই বললেন,

‘উনি দীপেন চাকমা, উন্মেষ এর জেনারেল সেক্রেটারী। তিন পার্বত্য জেলাসহ চট্টগ্রাম অঞ্চলে তিনি রক্তযোদ্ধা নামেই অধিক পরিচিত। দীপেন দা’ই আপনার জন্য রক্তের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন ঐ মুহুর্তে। না হলে কি যে আজ হতো সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন।’

অপলক দৃষ্টিতে হ্যাংলা লিকলিকে দীপেন চাকমার দিকে তাকালেন আপনি, চোখে স্পষ্ট চিরকৃতজ্ঞতার ছাপ ফুটে উঠলো আপনার। উঠে বসতে চাইলে দীপেন বাবুই নিষেধ করলেন হাতের ইশারায়। তারপর একটা চেয়ার টেনে নিয়ে আপনার পাশে বসে আপনার যে হাতটায় রক্ত সঞ্চালনের সরঞ্জাম লাগানো ছিল সে হাতটার তালুটা ধরলেন। মুখে জানালেন, ‘চন্তা করবেন না, সুস্থ হয়ে উঠতে আপনার যতব্যাগ রক্তই লাগুক না কেন উন্মেষ তার ব্যবস্থা করে দিবে রক্তের জন্য কোন প্রকার অর্থব্যয় ছাড়াই।’ আপনার কাছে খানিকক্ষণের জন্য মনে হলো দীপেন চাকমা নয়, মানবরূপে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার কোন বিশেষ দূত বুঝি আপনার পাশে বসে রয়েছেন।

বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই যে উল্লেখিত কাহিনীটি একটি কল্পনাপ্রসূত কাহিনীমাত্র। কিন্তু বাস্তব হচ্ছে দেশের পার্বত্য তিন জেলাসহ চট্টগ্রাম অঞ্চলে এই জাতীয়সহ অসংখ্য ঘটনায় সংগৃহীত রক্তের অন্যতম প্রধান উৎস “উন্মেষ” নামের স্বেচ্ছাসেবী এই প্রতিষ্ঠানটি। পার্বত্য জেলার একঝাঁক আদিবাসী তরুণ আজ অগণিত মানুষের আস্থার প্রতীক। অন্য কিছু নয়, চিকিৎসা সহায়তা আর রক্ত প্রত্যাশী মুমুর্ষ রোগীর শেষ ভরসার কেন্দ্র উন্মেষ। সন্ধানী’র মত জাতীয় সংগঠনের পাশাপাশি খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলায় মুমুর্ষ রোগীর প্রাণ রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ রক্ত সংস্থানের বিশ্বস্ত উৎস উন্মেষ। উন্মেষ আজ একটি আন্দোলনের নাম, যে আন্দোলনের লক্ষ্য কোন ক্ষমতার লোভ বা কোন বিশেষ প্রাপ্তির প্রত্যাশা নয়- একটাই লক্ষ্য একটি প্রাণ বাঁচানো, একটি নতুন জীবনের শুভ সুচনা। সেই লক্ষ্যে দিনদিন এগিয়ে চলেছে উন্মেষের কর্মীবাহিনী।

পাহাড়ী কি বাঙালী, মুসলিম কি বৌদ্ধ, উচ্চবিত্ত কি নিন্মবিত্ত- উন্মেষের কাছে তা বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য আপনি, আপনার প্রাণ বাঁচানো। উন্মেষ বিশ্বাস করে সবার উপরে মানুষ সত্য, জাতির ভেদাভেদ নয়। বর্ণিত কাহিনীর মত এমন দূর্ঘটনা যে কারো জীবনেই ঘটতে পারে, ঘটেছেও হয়তোবা। বেড়াতে এসে কিংবা কর্মের প্রয়োজনে আগন্তক যে কেউ এমন দূর্ঘটনার শিকার হতেই পারেন। দূর্ঘটনা কবলিত কিংবা রক্ত প্রত্যাশী কারো নিকটাত্মীয়, পূর্ব পরিচিত কেউ এই অঞ্চলে নাও থাকতে পারেন যিনি রক্তদান বা রক্ত সংগ্রহের ব্যাপারে সহায়তা করতে পারতেন। এমন পরিস্থিতিতে সবার আগে যাকে পাশে পাওয়া যাবে তার নাম উন্মেষ। আপনি ঐ অঞ্চলের স্থায়ী বা অস্থায়ী যে ধরণের বাসিন্দাই হোন না কেন যদি কোনভাবে আপনার অসহায়ত্ব বা প্রয়োজনের তথ্য উন্মেষ বা এর কোন স্বেচ্ছাসেবী বরাবরে একবার পৌঁছে দিতে পারেন তবে রক্ত সম্পর্কীয় আপনার সমস্যার সমাধান হয়েই গেছে ভাবতে পারেন। উন্মেষ এবং এর নিয়মিত রক্তদাতা স্বেচ্ছাসেবীরা আপনার প্রয়োজনীয় রক্তের যোগান দিতে সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ।

নিরবিচ্ছিন্ন রক্তের প্রয়োজন মিটাতে সবার আগে প্রয়োজন প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতার সংস্থান করা। এই লক্ষ্যে উন্মেষ প্রতিনিয়ত রক্ত সরবরাহের পাশাপাশি নতুন নতুন রক্তদাতা নিবন্ধনে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বিনামূল্যে ব্লাডগ্রুপিং, রক্তদানে উৎসাহ প্রদানের জন্য নানা কর্মসূচীর আয়োজন করে থাকে উন্মেষ। উল্লেখিত অঞ্চলগুলোর প্রতিটি এলাকায় রয়েছে উন্মেষের পৃথক পৃথক সক্রিয় ইউনিট। রক্তের অভাবে মূল্যবান প্রাণ ঝরে যাওয়া ঠেকাতে উন্মেষ আর তার বিশাল স্বেচ্ছাসেবীগণ বদ্ধ পরিকর।

মানব সেবায় উন্মেষ এগিয়ে যাক। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ুক উন্মেষের বিজয় কেতন। উন্মেষের প্রতিটি স্বেচ্ছাসেবক এক একজন রক্তযোদ্ধা। স্বাধীনতা সংগ্রামে যেমন জাতির আস্থার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুই ছিল এদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা, ঠিক তেমনি উন্মেষের এক একজন রক্তযোদ্ধা আজ রক্ত প্রত্যাশীদের আস্থার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। উন্মেষ দীর্ঘজীবি হোক, এই প্রত্যাশা রইলো।

আহমেদ মাসুদ বিপ্লব, ঢাকা ব্যুরো প্রধান, ফোকাস বাংলা নিউজ।

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন