অধ্যাপক মোহাম্মদ হাশেম : নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান ও জীবন্ত এক কিংবদন্তী

281

আমরা আমাদের জীবনে অনেক কিংবদন্তীর নাম ও তাদের কাজকর্ম সম্পর্কে শুনেছি। কিন্তু একজন জীবিত কিংবদন্তীকে কাছে থেকে দেখবার সুযোগ খুব বেশী হয়নি, দেখা যায়নি বললেই পারতাম যদি না চাচা অধ্যাপক মোহাম্মদ হাশেম সাহেবকে না পেতাম। নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের অংগনে এক জীবিত কিংবদন্তী আর মুকুটবিহীন সম্রাট অধ্যাপক মোহাম্মদ হাশেম। অত্যন্ত সহজ সরল এই মানুষটি একাধারে একজন গীতিকার, সুরকার আর সংগীত শিল্পী। এই তিনটি গুণ একসাথে একজন শিল্পীর মাঝে খুব কমই চোখে পড়ে থাকে। তিনি একই সাথে বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন তালিকাভুক্ত শিল্পী।

“আঙ্গো বাড়ি নোয়াখালী রয়াল ডিস্ট্রিক্ট ভাই” কিংবা “রিকশাওয়ালা কুছকাই চালা ইষ্টিশন যাইয়ুম” অথবা স্বাধীনতার সংগ্রাম চলাকালীন মুক্তিযোদ্বাদের অনুপ্রেরনায় দিতে শিল্পী হাসেম লিখেছেন “আবারও দিন আইবো বাঙ্গালী গান গাইবো, চান্নি হর কিয়ের ডর, চোখগা মেলি চা”। নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের রচয়িতা সুরকার আর শিল্পী অধ্যাপক মোহাম্মদ হাশেম। আজকের নতুন প্রজন্ম হয়তোবা জানেনই না এমন একজন গুণী পুরুষ তাদের নোয়াখালীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে পুরো দেশের পাশাপাশি সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করে এসেছেন যুগ যুগ ধরে। আল্লায় দিছে বল্লার বাসা নোয়াখালীর মাডি তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় আরো একটি আঞ্চলিক গান। শুধু নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষাতেই নয়, পাশাপাশি অগণিত আধূনিক ও পল্লীগীতির রচয়িতা অধ্যাপক মোহাম্মদ হাশেম।

সংগীত অংগণের এই প্রাণ পুরুষ অধ্যাপক মোহাম্মদ হাশেম এর জন্ম হয়েছিল ১৯৪৭ সালে ১০ জানুয়ারী নোয়াখালীর চরমটুয়ার শ্রীকৃষ্ণপুর গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র অধ্যাপক মোহাম্মদ হাশেম শিক্ষা জীবনেই তিনি তাঁর প্রতিভার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে আরম্ভ করেছিলেন। লোকসঙ্গীতের একক সম্রাট শিল্পী আবদুল আলীম তাঁর সঙ্গীতগুরু। তাঁর বিখ্যাত আঙ্গো বাড়ি নোয়াখালী রয়াল ডিস্ট্রিক্ট ভাই গানটি সম্ভবত ১৯৭৪ সাল কিংবা তার পূর্বেই রচনা করেন তিনি। আর এই গানটিই তাকে বানিয়ে ফেলে নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের একক সম্রাট। আজও নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান বলতে সবাই শিল্পীর হাশেমের গানকেই বুজে থাকি। মূলতঃ তাঁর হাত ধরেই অবহেলিত এই অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা, আনন্দ-বেদনা আর মেঘনা বিধৌত অঞ্চলের মানুষগুলোর সংগ্রামী জীবনের চিত্র গানরূপে প্রকাশ পেয়েছিল।

শিল্পী অধ্যাপক মোহাম্মদ হাশেম ঢাকা সংগীত মহাবিদ্যালয়ের একাধারে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ছিলেন। সঙ্গীতে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনশেষে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল এখানেই। পরবর্তীতে নোয়াখালীর কবিরহাট কলেজে বাংলা বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই মহাপুরুষটিকে চিনবার সৌভাগ্য অর্জন করি তখনই। আমার বাবা মরহুম অধ্যক্ষ ছালেহ আহমেদ তখন কবিরহাট কলেজেই রাষ্টবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। আমরা কলেজ সংলগ্ন একটি কোয়ার্টারে থাকতাম। তখন থেকেই শিল্পীর পরিবারের সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক। শিল্পীর সহধর্মীনি ঢাকার অরিজিনাল বাসিন্দা হওয়ায় উনার ঢাকাইয়া ভাষার কথাবার্তা আমাকে খুব অবাক করতো। বয়স খুব একটা বেশী ছিলনা, চার কি পাঁচ বছরের ঐ বয়সে চাচীর মুখের কথাগুলো শুনে হাসতাম না বুজেই। সেই থেকে এই শিল্পী পরিবারের সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্কটা অনেক গভীর হয়ে গিয়েছিল। কালের বিবর্তনে সময়ের ব্যস্ততায় আজ হয়তো ততোখানি যোগাযোগ আর নেই, নেই স্বশরীরে যাওয়া আসাও। তারপরও শিল্পীঅধ্যাপক মোহাম্মদ হাশেম আজো রয়ে গেছেন হৃদয়ের সেই মনিকোঠায় যেখানে আছেন আমার বাবাও।

শিল্পীর পরিবারের সাথে সময়ের ব্যবধানে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক যেন সেই হারানো সম্পর্কটাকে আবার পুনরায় জুড়ে দেয়ার প্রত্যয়ে আমার জীবনে আবির্ভূত হয়। বছর তিনেক আগে প্রথম শিল্পী হাশেমের বড় মেয়ে শাহনাজ হাশেম কাজল আপার বর ও কবি মামুন রশীদ ভাই আমার বন্ধু তালিকায় যুক্ত হন। পরে একে একে কাজল আপা, মুক্তি একসময় যে কিনা আমার ক্লাশমেট ছিল এবং ছোটমেয়ে সামিরা যুক্ত হয়েছিল বন্ধুতালিকায়। তাই আজ রিয়েল লাইফে দুরত্ব থাকলেও ভার্চুয়াল জগতে ঠিকই আমরা একে অপরের ভীষন কাছাকাছি থাকবার সুযোগ পেয়েছি।

“আহারে ও কুলসুম কোতথুন আইলো ডুবাইওয়ালা কইরলো রে জুলুম”– আরো একটি জনপ্রিয় আঞ্চলিক গান নোয়াখালী অঞ্চলের। খালাতো বোনের সাথে দীর্ঘসময়ের প্রেম আর ভালবাসার বিচ্ছেদ ঘটে কোন এক ডুবাই প্রবাসীর কারণে। আর তার কথাই উঠে আসে এই গানটির মাধ্যমে। শুনতে শুনতে কল্পনার জগতে হারিয়ে যাবেন অনেকেই বিশেষ করে যাদের বাস্তবজীবনে এমন কোন অভিজ্ঞতা রয়েছে। শুধু এই গানটি একা নয়, শিল্পী মোহাম্মদ হাশেমের এমন অসংখ্য গান আপনাকে নিয়ে যাবে কল্পনার অতল গভীরে। ২০০৫ সালের একুশের বই মেলায় এই মহান শিল্পীর প্রথম সংকলন নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান নামে প্রকাশিত হয়। ২০১৫ সালে তাঁর বাছাই করা আড়াইশত গানের সংগ্রহ নিয়ে উৎস প্রকাশন প্রকাশ করে নির্বাচিত নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান নামের বইটি।

শিল্পী মোহাম্মদ হাশেম আর নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান আজ যেন এক সমার্থক শব্দ, এক সুঁতোতেই গাঁথা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ক্ষেত্রে শিল্পী শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব আর শেফালী ঘোষ এই দুইজনকে কিংবদন্তী মানা হয়ে থাকলেও উনারা শিল্পী মোহাম্মদ হাশেমের আদলে একাই গীতিকার, সুরকার আর কণ্ঠশিল্পী এই তিন গুণের অধিকারী হতে পারেননি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে শিল্পী অধ্যাপক মোহাম্মদ হাশেম নিঃসন্দেহে একাই অনেক উর্ধ্বে থেকে আলোকিত করে যাচ্ছেন নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গীতাঙ্গনকে। শিল্পীর অনুপস্থিতিতেও যেন এর ধারাবাহিকতায় কোন কমতি না পড়ে সেলক্ষ্যে ইতিমধ্যেই শিল্পীর পরিবার থেকেই জন্ম নিয়ে ফেলেছেন তার বিকল্প হিসেবে ঐতিহ্য ধরে রাখবার উপযোগী শিল্পীর সন্তানেরা। শিল্পীর গুণী এই সন্তানরাও ইতিমধ্যেই সে স্বাক্ষর রাখতে শুরু করে দিয়েছেন দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। আমরা প্রার্থণা করি শিল্পী মোহাম্মদ হাশেমের এই কীর্তি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকুক যুগ যুগ ধরে নয়, বরং অনন্তকাল অবধি।

 

ফোবানি/আহমেদ মাসুদ বিপ্লব

ফেসবুক থেকে মন্তব্য করুন